ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কাছ থেকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছেন। রিপাবলিকানদের এমন পরাজয়ের কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূতাবাসের সামনে আমেরিকাবিরোধী বার্ষিক সমাবেশে জড়ো হয়ে উল্লাস করেছেন হাজারো ইরানি।
রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশ ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ইরানের জাতীয় পতাকা নাড়ান এবং ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের তীব্র নিন্দা জানিয়ে লেখা বিভিন্ন ব্যানার প্রদর্শন করেন।
সেখানে একটি বড় ব্যানারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শিকলে বাঁধা এক ‘রক্তমাখা বুলডগ’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। শিকলের অন্য প্রান্ত ধরে রেখেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মতো দেখতে শয়তানের অবয়বের একটি চরিত্র।
অন্যান্য ব্যানারে ইরানের নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি।
সমাবেশস্থলে টাঙানো একটি বিশাল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘মূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ করেছে ইরানের জনগণ।’ এর ঠিক পাশেই পুরো বিশ্বের মানচিত্রজুড়ে সারি সারি কালো তেলের ড্রাম সাজিয়ে রাখা হয়। এর মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়।
১৯৭৯ সালে মার্কিন দূতাবাস দখল ও পরবর্তী জিম্মি করার ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে আয়োজিত এ সমাবেশে অংশ নিয়ে ৪০ বছর বয়সী মাহমুদখানি বলেন, “আমেরিকা বহু বছর ধরে আমাদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানের কোনো ক্ষতিই তারা করতে পারেনি।”
এই বিক্ষোভ সমাবেশ এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যার ঠিক আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেয়েছেন ট্রাম্প। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, বারবার শুল্ক পরিবর্তন এবং ইরান সংঘাত নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষের কারণে মার্কিন এই নির্বাচনকে কার্যত ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের ওপর একধরনের গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
মাহমুদখানি বলেন, “তেলের দাম এত বেড়ে যাওয়ায় আমরা নিশ্চয়ই খুশি নই। তবে এতে অন্তত একটুখানি তৃপ্তি পাচ্ছি যে, আমরা এখন আর একা এই কষ্ট সইছি না। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে কেবল আমরাই তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে এসেছি।”
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে তেহরান নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করায় এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের প্রধান প্রধান বন্দরে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে।
মজিদ হেইদারি নামে ৬২ বছর বয়সী তেহরানের এক কাপড় প্রস্তুতকারক বলেন, জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়াই আমেরিকানদের ভোটাধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, “ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একজোট হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তখন আমাদেরও এই বিশেষ হাতিয়ার (হরমুজ বন্ধের সিদ্ধান্ত) ব্যবহার করতেই হবে। তাদের নিজ দেশের জনগণকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ওই সরকারগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না।”
তা সত্ত্বেও, আমেরিকার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সাধারণ ইরানিদের বাস্তব জীবনে আদৌ কোনো বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
৪২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদও প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আমি সত্যিই মনে করি, সেখানে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমাদের জন্য তার কোনো পার্থক্য নেই। গত ৫০ বছর ধরে ইরানি জনগণের প্রতি মার্কিন সরকারের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব দুর্ভাগ্যজনকভাবে একই রয়ে গেছে।”
যুদ্ধের বিপক্ষে জনমত
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তেহরানের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জনগণের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “বিবেক থেকেই হোক কিংবা জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত খরচের কারণেই হোক, আমেরিকান জনগণ স্পষ্টভাবে ‘যুদ্ধকে না’ বলে দিয়েছে। আমরা তাদের এই বার্তাকে পূর্ণ সমর্থন জানাই।”
তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক সংলাপে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি।
১৯৭৯ সালের নভেম্বরে মার্কিন সমর্থিত শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের কয়েক মাস পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে প্রথম হামলা চালানো হয়। প্রতিবছর এই বার্ষিক সমাবেশের আয়োজন করা হয় সেই ঘটনাকে স্মরণ করে।
সে সময় দূতাবাস ঘেরাওকারী ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসারের চিকিৎসা নেওয়া শাহকে ইরানের বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁরা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে টানা ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রেখেছিলেন। এই ঘটনার পর ১৯৮০ সালে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন হয়ে যায়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ এরপর থেকে প্রতিবছর এই দিনটিকে পশ্চিমা অহংকার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যাপক আয়োজনে পালন করে আসছে। বুধবারের বিক্ষোভে প্রদর্শিত রক্তভেজা রাজমুকুটের একটি ব্যানারে লেখা ছিল, “ফাঁকা মাথার ওপর অহংকারের মুকুট।”
তেহরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫ বছর বয়সী প্রধান শিক্ষিকা বাঘেরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমেরিকা যেকোনো অবস্থাতেই আমাদের চরম শত্রু। সেখানকার হোয়াইট হাউসে কে ক্ষমতায় বসল বা না বসল, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
























