চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বন্দর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মাসোয়ারাবাজি, বদলি বাণিজ্য এবং পদায়নে ঘুষ গ্রহণের একগুচ্ছ গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর অধীনস্থ চারটি থানা—বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গা ও কর্ণফুলী—এবং আওতাধীন বিভিন্ন ফাঁড়ির ইনচার্জদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) তৈরি, থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা (সেকেন্ড অফিসার) এবং ফাঁড়ির ইনচার্জ পদায়নে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অনৈতিক এক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
গোয়েন্দা সূত্র ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্যমতে, ডিসি আমিরুল তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন চার থানার অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) কাছ থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা এবং বিভিন্ন ফাঁড়ির ইনচার্জদের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করছেন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের উপপরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপপরিদর্শকদের (এএসআই) তৈরি করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুমোদনের বিনিময়েও তিনি এক লাখ টাকা করে দাবি ও গ্রহণ করেন। এ ধরনের বেআইনি আর্থিক লেনদেনের ফলে বন্দর বিভাগের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
সাধারণত থানার ওসিরা অভ্যন্তরীণ পদায়নের ক্ষেত্রগুলো তত্ত্বাবধান করলেও, বন্দর বিভাগে দ্বিতীয় কর্মকর্তা নিয়োগের পুরো নিয়ন্ত্রণ ডিসি নিজেই হস্তগত করেছেন বলে জানা যায়। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, বন্দর জোনে দুই লাখ টাকার নিচে কোনো কর্মকর্তা দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পাননি। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি আদালত থেকে পতেঙ্গা থানায় বদলি হওয়া এসআই নুরুল ইসলামকে সমপরিমাণ অর্থের বিনিময়েই উক্ত থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সবচেয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন ফাঁড়ির ইনচার্জ পদায়নকে কেন্দ্র করে। কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে এসআই রুমেলের নিয়োগকে ঘিরে সাত লাখ টাকার লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হলে পরবর্তীতে সেখানে এসআই সামিউলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে বন্দর ফাঁড়িতে এসআই নোমান, শাহমীর ফাঁড়িতে এসআই রেজাউল এবং ডাঙারচর নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে এসআই নাজিবুর রহমানের পদায়নের ক্ষেত্রেও পাঁচ লাখ টাকা করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
পতেঙ্গা থানার কয়লাডিপো ফাঁড়ির ইনচার্জ নিয়োগে অর্থ লেনদেনের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এই ফাঁড়িতে ধারাবাহিকভাবে এসআই মহসিনের কাছে সাত লাখ টাকা, এসআই বেলায়েতের কাছে আট লাখ টাকা এবং সম্প্রতি এসআই নাজিমুর রহমানের কাছে দশ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। হালিশহর পুলিশ ফাঁড়িতে এসআই আবদুল গফুরের নিয়োগের পেছনেও পাঁচ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে, যা এই বিভাগে ফাঁড়িভিত্তিক পদায়ন বাণিজ্যের গভীরতা প্রকাশ করে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো ফাঁড়ির ইনচার্জদের অন্তত এক বছর দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও, আর্থিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে অনেককে মাত্র ছয় মাস পরেই অহেতুক বদলি করা হতো বলে ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। বদলির এই অনিয়মিত চক্রের পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও আর্থিক লেনদেনের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা। এছাড়া বন্দর বিভাগের কয়েকটি সংবেদনশীল এলাকায় মাদককারবারে জড়িত কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যকে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সরাসরি সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
শুধু প্রশাসনিক দুর্নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকালে নীলফামারী জেলায় দায়িত্ব পালনকালে আন্দোলনকারীদের ওপর ডিসি আমিরুলের সরাসরি হামলার দৃশ্য একাধিক ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়ে। তৎকালীন সময়ে জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর ভূমিকার সংবাদ বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। একজন দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী আচরণ, মাদক প্রশ্রয় ও বেপরোয়া দুর্নীতি দমনসহ সার্বিক বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্ত করে দ্রুত কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















