মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির না করে মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়ার ঘটনায় সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলামকে আদালতে স্বশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র, অভিযান-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি), উদ্ধার করা আলামত, আসামিদের সোপর্দকরণ ও ফরওয়ার্ডিং স্মারকসহ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার আমলি আদালত-৬ (সদর দক্ষিণ)-এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুমিনুল হক গত ১ অক্টোবর এ আদেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর সকাল ১০টায় সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসিকে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রসহ আদালতে স্বশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে।
আদালতের আদেশ সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ থানার ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম আদালতের জিআরওর মাধ্যমে জানান, মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের আদালতে পাঠানো হচ্ছে। তবে আদালতের কর্মঘণ্টা শেষ হয়ে গেলেও আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়নি।
পরে আদালতের জিআরও থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় আইনি প্রশ্ন তুলে আদালত ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৬১ ও ১৬৭ ধারার বিধান উল্লেখ করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হলে এজাহারসহ তাঁকে নিকটস্থ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই বিষয়ে পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল, ১৯৪৩-এর প্রবিধান ৩২৪-এও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, সদর দক্ষিণ থানার ওসি আটক আসামিদের আইনানুগ এখতিয়ারসম্পন্ন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির না করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। আদালত এ ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের লঙ্ঘন এবং আটক ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন।
মোবাইল কোর্টের এখতিয়ার নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলেছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, ২০০৯-এর ৬ ও ৭ ধারার বিধান উল্লেখ করে আদালত বলেন, তফসিলভুক্ত কোনো অপরাধ সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ সম্মুখে বা উপস্থিতিতে সংঘটিত কিংবা উদ্ঘাটিত হলেই কেবল তিনি ঘটনাস্থলে অপরাধ আমলে নিয়ে বিচার করতে পারেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার করা আসামিকে পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচার করা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আদেশে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর অধীনে পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে সোপর্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
ঘটনার সার্বিক পর্যালোচনায় আদালত মনে করেন, সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান প্রতিপালনে গাফিলতি করেছেন। এ ধরনের গাফিলতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়।
এ কারণে আইন অমান্য করার জন্য কেন ওসির বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, “আমি একটি মিটিংয়ে রয়েছি, এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।”
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, “আদালতের আদেশনামাটি আমি পাইনি। তাই আদেশনামা না দেখে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে পারছি না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।”
আব্দুর রহমান সাঈফ, কুমিল্লা 



















