ময়মনসিংহের ত্রিশাল সরকারি নজরুল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির অর্থ বিতরণে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে উপবৃত্তির অর্থ বিতরণের কথা থাকলেও এখনো তা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য না পাওয়ায় তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপবৃত্তির অর্থ তাঁদের কাছে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; বরং পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার ফরম পূরণ, কলেজের বিভিন্ন খরচ, বই-খাতা কেনা এবং যাতায়াতের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে উপবৃত্তির অর্থ না পাওয়ায় তাঁদের শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উপবৃত্তি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, আর কত দিন অপেক্ষা?
ত্রিশাল সরকারি নজরুল কলেজের ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, উপবৃত্তির অর্থ বিতরণ নিয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও তাঁরা কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাচ্ছেন না। বিশেষ করে ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ হওয়া এবং ফল প্রকাশের পরও উপবৃত্তির অর্থ না পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, “আমরা কি আমাদের প্রাপ্য উপবৃত্তির টাকা পাব না? ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে উপবৃত্তির টাকা আর কত দিন পর দেওয়া হবে? আমাদের পড়াশোনার খরচের প্রয়োজনীয়তা কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে না?”
তাঁদের ভাষ্য, উপবৃত্তি বিতরণে বিলম্বের কারণ এবং অর্থ প্রদানের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য জানানো হলে তাঁরা নিজেদের আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
ফরম পূরণ ও শিক্ষাব্যয় নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
ডিগ্রি পর্যায়ে অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থী পরিবার থেকে সীমিত আর্থিক সহায়তা পান। তাঁদের কেউ কেউ টিউশনি বা অন্যান্য ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। এমন শিক্ষার্থীদের কাছে সরকারি উপবৃত্তির অর্থ সময়মতো পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, উপবৃত্তির অর্থ যথাসময়ে হাতে না এলে পরীক্ষার ফরম পূরণসহ শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পক্ষে একসঙ্গে একাধিক শিক্ষাব্যয় বহন করা কঠিন, সেসব পরিবারের শিক্ষার্থীরা বেশি চাপে রয়েছেন।
তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা আর্থিক সহায়তা বিতরণে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বস্তি, পড়াশোনার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা, তবু নেই স্পষ্ট জবাব
শিক্ষার্থীদের দাবি, ডিগ্রি পর্যায়ের উপবৃত্তি বিতরণে বিলম্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীরা তাঁদের সমস্যা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের অভিযোগ, এখনো তাঁরা উপবৃত্তির অর্থ বিতরণ সম্পর্কে প্রত্যাশিত স্পষ্ট তথ্য পাচ্ছেন না।
একজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও আমাদের উপবৃত্তির বিষয়ে কোনো পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। আমরা জানতে চাই, আমাদের উপবৃত্তির টাকা কবে দেওয়া হবে এবং কেন এত দিন ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।”
তবে উপবৃত্তি বিতরণে বিলম্বের প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অর্থ ছাড়ের বর্তমান অবস্থা কিংবা বিতরণের নির্ধারিত সময় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষার্থীদের দাবি
শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির অর্থ বিতরণে বিলম্বের কারণ প্রকাশ, অর্থ ছাড় ও বিতরণের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রদান এবং দ্রুত অর্থ পরিশোধের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যাশা, উপবৃত্তি বিতরণসংক্রান্ত কোনো প্রশাসনিক জটিলতা বা প্রক্রিয়াগত সমস্যা থাকলে তা দ্রুত সমাধান করে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা হবে। যাঁরা উপবৃত্তি পাওয়ার যোগ্য এবং যাঁদের তথ্য ও আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে, তাঁদের অর্থ বিতরণে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের মতে, একটি শিক্ষাবান্ধব ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তা শুধু ঘোষণা বা বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং তা যথাসময়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এই অর্থ উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা
ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বিতরণে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের অন্যতম প্রত্যাশা। জুলাই ২০২৫-এ নির্ধারিত বিতরণ-সময়ের কথা উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা জানতে চাইছেন, তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পেতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চান না; বরং পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে এবং প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা যথাসময়ে পেতে চান। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উপবৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁদের দাবি—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
শিক্ষার্থীদের এই দাবি কেবল অর্থ পাওয়ার দাবি নয়; এটি তাঁদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, আর্থিক চাপ কমানো এবং উচ্চশিক্ষার পথে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দূর করার প্রত্যাশাও। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ ও স্পষ্ট বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন ত্রিশাল সরকারি নজরুল কলেজসহ দেশের ডিগ্রি পর্যায়ের উপবৃত্তিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা।
মো. রাসেল ফকির-ময়মনসিংহ ব্যুরো প্রধান 




















