ঢাকা ০৩:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প আ.লীগ নেতাদের হাতে চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র তৈরির বিজ্ঞাপন, লালমাইয়ে যুবক আটক বড়লেখায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে র‍্যালি ও আলোচনা সভা শিবগঞ্জে ইউএনও মাজহারুল ইসলাম ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত নাহিদ উজ্জামানকে সংবর্ধনা রংপুর মেডিকেলে আগুন, বিদ্যুৎহীনতায় ব্যাহত চিকিৎসাসেবা লালপুরে ৯০ পিস ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ স্বামী-স্ত্রী আটক দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে প্রতিমন্ত্রীর সফর হজযাত্রীদের কোরবানির অর্থ নিয়ে অনিয়ম, এজেন্সিকে জরিমানা কেইনই ব্যালন ডি’অরের যোগ্য, বলছেন বায়ার্ন কোচ
কাজ পাইয়ে দিলেন ডিএসসিসি প্রশাসক

প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প আ.লীগ নেতাদের হাতে

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই রাজধানী ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও ৫০টি পয়েন্টে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে যানজট নিরসন করা। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে দরপত্র প্রক্রিয়া, শর্ত শিথিলকরণ এবং বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের ৩৮টি ট্রাফিক সিগন্যালের মধ্যে ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের ২৮টি পয়েন্টের কাজ গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। অন্যদিকে কাগজপত্রে বাকি ১০টি সিগন্যালের কাজ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড পেলেও নেপথ্যে সহ-ঠিকাদার বা সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে মূল কাজ বাস্তবায়ন করছে বিআইটি টেকনোলজি ও কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং।

গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সাব-কনট্রাক্টর বিতর্ক
২০১৩ সালে তৎকালীন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রদল নেতাসহ মোট সাতজন গুম হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গঠিত গুম কমিশনের কাছে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা কিসমৎ হায়াৎ। বিতর্কিত এই কর্মকর্তা বর্তমানে ‘কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মালিক। এ ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সিটি করপোরেশনের বড় উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত করা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএনসিসি সূত্র ও ই-জিপির (e-GP) তথ্য অনুযায়ী, ডিএনসিসি এলাকার যানজট নিরসনে ১০টি ইন্টারসেকশনের ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের জন্য ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল থেকে প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছরের ৪ ডিসেম্বর। প্রথম দফায় চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও উপযুক্ত ঠিকাদার না পাওয়ার অজুহাতে দরপত্র বাতিল করা হয়।

শর্ত শিথিল ও পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
দ্বিতীয় দফায় দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ৩ মে দুপুর ১টা। তবে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দরপত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত বদল করে। যোগ্য ঠিকাদার না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে ঠিকাদারের কাজের ন্যূনতম অভিজ্ঞতার মান বা এসএলটি (SLT) ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে একধাক্কায় কমিয়ে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়। প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য প্রমাণ করতেই মানদণ্ডের এই বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

দ্বিতীয় দফার বর্ধিত সময়ে যৌথভাবে আবেদন করে কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং, বিআইটি টেকনোলজি ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স। অন্যদিকে এককভাবে আবেদন করে ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড। ডকইয়ার্ড অভিজ্ঞতার বিচারে এগিয়ে থাকলেও মালামালের তালিকায় একটি সাধারণ ‘রোড কাটার মেশিন’ উল্লেখ না থাকায় কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি তাদের দরপত্র বাতিল করে।

অথবা পাবলিক প্রসিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী, দরপত্রে সামান্য বা অপ্রধান কোনো বিচ্যুতি থাকলে তা বাতিল না করে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে—যদি না তা মূল কারিগরি বৈশিষ্ট্য বা বাণিজ্যিক শর্তে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। তবে একটি রোড কাটার মেশিনের অনুপস্থিতিকে ‘গুরুতর বিচ্যুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়।

তৃতীয় দফার দরপত্র ও যৌথ সিন্ডিকেট
পরবর্তী সময়ে তৃতীয় দফায় আবিদ মনসুর কনস্ট্রাকশন, কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স যৌথভাবে এবং ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস আলাদাভাবে দরপত্র জমা দেয়। এবার বিআইটি টেকনোলজি সরাসরি অংশ না নিলেও নেপথ্যে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত ছিল।

ডিএনসিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের ঘনিষ্ঠতা ছিল কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিআইটি টেকনোলজির সুবিধাভোগীদের সঙ্গে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা ও ডকইয়ার্ডের কারিগরি যোগ্যতার কারণে শেষ পর্যন্ত চুক্তি ডকইয়ার্ডেরই নামেই হয়। তবে নেপথ্য সমঝোতা অনুযায়ী ডকইয়ার্ডকে মূল ঠিকাদার দেখিয়ে ভেতরে সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে বিআইটি টেকনোলজিকে যুক্ত করা হয়। গত ৫ জুলাই দরপত্র উন্মুক্তের পর ১৯ আগস্ট কাজের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ৮ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বিআইটি টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হাসান (সুমন) নথিপত্রে স্বাধীন সত্তা হিসেবে থাকলেও বাস্তবে তিনি কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ পরিচালনা করছেন। পূর্বের মেয়াদে মেয়র আতিকুল ইসলামের সময়ে দরপত্র ছাড়াই ‘বিআইটি টেকনোলজি’ থেকে সরাসরি প্রায় ৫০ লাখ টাকায় এআই ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা কেনা এবং মশক কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত দামে ফোরজি বডি ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া নিয়েও সংস্থাটির ভেতরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

পাঁচ প্যাকেজে বিভক্ত করে ২৮টি সিগন্যালের কাজ বণ্টন
অন্য ২৮টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনের ক্ষেত্রে বড় দরপত্রের কঠিন শর্ত এড়িয়ে যেতে সেটিকে পাঁচটি ছোট প্যাকেজে ভাগ করে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল। গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত এই প্রক্রিয়ায় ঘুরেফিরে বিগত সরকারের আমলেই রাজত্ব করা সিন্ডিকেটই কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নেয়।

প্যাকেজগুলোর মাধ্যমে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ পারভেজের ‘মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় ৬টি পয়েন্টের কাজ পায়। যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় ৪টি পয়েন্টের কাজ পায়। এছাড়া মাইশা ও ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার যৌথভাবে ৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় ৫টি, আসিফ ও এম এস ইফাদ এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ৫টি এবং মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজানের ছোট ভাই এইচ এম হেলালের ‘এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং’ আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে যৌথভাবে ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় ৮টি ইন্টারসেকশনের কাজ বাগিয়ে নেয়।

বিগত সরকারের সময়ে ডিএনসিসির অবকাঠামোগত কাজের সিংহভাগ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই ছিল। সরকারের পরিবর্তন হলেও সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক সহায়তা ও রহস্যজনক নমনীয়তায় তারা এখনও রাজত্ব বজায় রেখেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
প্রকল্পে নানা অনিয়ম, শর্ত পরিবর্তন ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সিটি করপোরেশনের সার্বিক দরপত্র কার্যক্রম ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এখানে যাদের এসএলটি ও টিডিএস মানদণ্ড অনুকূলে থাকে, নিয়ম মেনেই তারা কাজ পায়। এতে কোনোরকম ম্যানিপুলেশন বা অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ নেই। পাশাপাশি, সাব-কনট্রাক্টর বা যুক্ত থাকা ব্যক্তির পূর্বের রাজনৈতিক বা অন্যান্য ব্যাকগ্রাউন্ড সংক্রান্ত বিষয়ে সংস্থা অবগত ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প আ.লীগ নেতাদের হাতে

কাজ পাইয়ে দিলেন ডিএসসিসি প্রশাসক

প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহের ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প আ.লীগ নেতাদের হাতে

আপডেট সময় ০৩:৪৯:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই রাজধানী ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও ৫০টি পয়েন্টে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে যানজট নিরসন করা। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে দরপত্র প্রক্রিয়া, শর্ত শিথিলকরণ এবং বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের ৩৮টি ট্রাফিক সিগন্যালের মধ্যে ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের ২৮টি পয়েন্টের কাজ গেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। অন্যদিকে কাগজপত্রে বাকি ১০টি সিগন্যালের কাজ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড পেলেও নেপথ্যে সহ-ঠিকাদার বা সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে মূল কাজ বাস্তবায়ন করছে বিআইটি টেকনোলজি ও কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং।

গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সাব-কনট্রাক্টর বিতর্ক
২০১৩ সালে তৎকালীন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রদল নেতাসহ মোট সাতজন গুম হন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গঠিত গুম কমিশনের কাছে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন র‍্যাবের সাবেক কর্মকর্তা কিসমৎ হায়াৎ। বিতর্কিত এই কর্মকর্তা বর্তমানে ‘কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মালিক। এ ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সিটি করপোরেশনের বড় উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত করা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএনসিসি সূত্র ও ই-জিপির (e-GP) তথ্য অনুযায়ী, ডিএনসিসি এলাকার যানজট নিরসনে ১০টি ইন্টারসেকশনের ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের জন্য ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল থেকে প্রথম দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছরের ৪ ডিসেম্বর। প্রথম দফায় চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও উপযুক্ত ঠিকাদার না পাওয়ার অজুহাতে দরপত্র বাতিল করা হয়।

শর্ত শিথিল ও পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
দ্বিতীয় দফায় দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ৩ মে দুপুর ১টা। তবে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দরপত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত বদল করে। যোগ্য ঠিকাদার না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে ঠিকাদারের কাজের ন্যূনতম অভিজ্ঞতার মান বা এসএলটি (SLT) ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে একধাক্কায় কমিয়ে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে দরপত্র জমা দেওয়ার সময় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়। প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য প্রমাণ করতেই মানদণ্ডের এই বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

দ্বিতীয় দফার বর্ধিত সময়ে যৌথভাবে আবেদন করে কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং, বিআইটি টেকনোলজি ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স। অন্যদিকে এককভাবে আবেদন করে ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড। ডকইয়ার্ড অভিজ্ঞতার বিচারে এগিয়ে থাকলেও মালামালের তালিকায় একটি সাধারণ ‘রোড কাটার মেশিন’ উল্লেখ না থাকায় কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি তাদের দরপত্র বাতিল করে।

অথবা পাবলিক প্রসিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী, দরপত্রে সামান্য বা অপ্রধান কোনো বিচ্যুতি থাকলে তা বাতিল না করে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে—যদি না তা মূল কারিগরি বৈশিষ্ট্য বা বাণিজ্যিক শর্তে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। তবে একটি রোড কাটার মেশিনের অনুপস্থিতিকে ‘গুরুতর বিচ্যুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয়।

তৃতীয় দফার দরপত্র ও যৌথ সিন্ডিকেট
পরবর্তী সময়ে তৃতীয় দফায় আবিদ মনসুর কনস্ট্রাকশন, কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও এম এস মাহাবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স যৌথভাবে এবং ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস আলাদাভাবে দরপত্র জমা দেয়। এবার বিআইটি টেকনোলজি সরাসরি অংশ না নিলেও নেপথ্যে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত ছিল।

ডিএনসিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের ঘনিষ্ঠতা ছিল কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিআইটি টেকনোলজির সুবিধাভোগীদের সঙ্গে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা ও ডকইয়ার্ডের কারিগরি যোগ্যতার কারণে শেষ পর্যন্ত চুক্তি ডকইয়ার্ডেরই নামেই হয়। তবে নেপথ্য সমঝোতা অনুযায়ী ডকইয়ার্ডকে মূল ঠিকাদার দেখিয়ে ভেতরে সাব-কনট্রাক্টর হিসেবে বিআইটি টেকনোলজিকে যুক্ত করা হয়। গত ৫ জুলাই দরপত্র উন্মুক্তের পর ১৯ আগস্ট কাজের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ৮ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বিআইটি টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হাসান (সুমন) নথিপত্রে স্বাধীন সত্তা হিসেবে থাকলেও বাস্তবে তিনি কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ পরিচালনা করছেন। পূর্বের মেয়াদে মেয়র আতিকুল ইসলামের সময়ে দরপত্র ছাড়াই ‘বিআইটি টেকনোলজি’ থেকে সরাসরি প্রায় ৫০ লাখ টাকায় এআই ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা কেনা এবং মশক কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত দামে ফোরজি বডি ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া নিয়েও সংস্থাটির ভেতরে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

পাঁচ প্যাকেজে বিভক্ত করে ২৮টি সিগন্যালের কাজ বণ্টন
অন্য ২৮টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনের ক্ষেত্রে বড় দরপত্রের কঠিন শর্ত এড়িয়ে যেতে সেটিকে পাঁচটি ছোট প্যাকেজে ভাগ করে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল। গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত এই প্রক্রিয়ায় ঘুরেফিরে বিগত সরকারের আমলেই রাজত্ব করা সিন্ডিকেটই কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নেয়।

প্যাকেজগুলোর মাধ্যমে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ পারভেজের ‘মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকায় ৬টি পয়েন্টের কাজ পায়। যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের ‘আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় ৪টি পয়েন্টের কাজ পায়। এছাড়া মাইশা ও ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার যৌথভাবে ৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় ৫টি, আসিফ ও এম এস ইফাদ এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ৫টি এবং মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজানের ছোট ভাই এইচ এম হেলালের ‘এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং’ আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে যৌথভাবে ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় ৮টি ইন্টারসেকশনের কাজ বাগিয়ে নেয়।

বিগত সরকারের সময়ে ডিএনসিসির অবকাঠামোগত কাজের সিংহভাগ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই ছিল। সরকারের পরিবর্তন হলেও সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক সহায়তা ও রহস্যজনক নমনীয়তায় তারা এখনও রাজত্ব বজায় রেখেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
প্রকল্পে নানা অনিয়ম, শর্ত পরিবর্তন ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সিটি করপোরেশনের সার্বিক দরপত্র কার্যক্রম ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এখানে যাদের এসএলটি ও টিডিএস মানদণ্ড অনুকূলে থাকে, নিয়ম মেনেই তারা কাজ পায়। এতে কোনোরকম ম্যানিপুলেশন বা অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ নেই। পাশাপাশি, সাব-কনট্রাক্টর বা যুক্ত থাকা ব্যক্তির পূর্বের রাজনৈতিক বা অন্যান্য ব্যাকগ্রাউন্ড সংক্রান্ত বিষয়ে সংস্থা অবগত ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।