রাজধানীর খিলক্ষেতের ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি (পিওএইচএস)-১। এই আবাসিক এলাকার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের একটি তিনতলা বাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক বিতর্কিত আস্তানা। পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ধরে ডিজে পার্টির নামে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ চললেও পুলিশি আশ্রয়ের কারণে কেউ ভয়ে মুখ খুলত না। অবশেষে গত সোমবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সেখানে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করেছে।এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া নিয়ে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা এসব পার্টির আয়োজন করত। ডিবির তদন্তে জানা যায়, বাড়িটিতে প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টি হতো, যা শুরু হয়েছিল ২০২৫ সাল থেকে। অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে আসা এসব পার্টির মূল কাস্টমার ছিল সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানরা।
ঘটনার রাতে একটি ভুয়া জন্মদিনের অনুষ্ঠানের নাম করে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়। অনলাইনে প্রচার করা হয়েছিল—বাড়িটি একজন ডিআইজির মালিকানাধীন এবং সেখানে পুলিশি কোনো রেইডের আশঙ্কা নেই। গভীর রাতে মাদকসেবন, উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে অর্ধনগ্ন নৃত্য এবং শিশার ধোঁয়ায় পুরো বাড়িটি আচ্ছন্ন থাকত। এখান থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৭০ শতাংশ যেত বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এমনকি বাড়িটির সিসিটিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণও নিজের হাতে রেখেছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবিরের নেতৃত্বে ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ২৬ জন তরুণীসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় গাঁজা, ইয়াবা, তিন বোতল বিদেশি মদ, মাদক সেবনের বিভিন্ন সামগ্রী এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী।
আটকদের ডিএমপির সামারি কোর্টের মাধ্যমে দ্রুত শাস্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছেলেদের এক মাসের কারাদণ্ড, এক হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মেয়েদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড, ৫০০ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। আটককৃতদের তালিকায় রয়েছে পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়ে, উচ্চপদস্থ আমলার দুই মেয়ে, সাবেক সেনা অফিসারের ছেলে, কর্মরত সেনা অফিসারের মেয়ে, ব্যাংকার এবং ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের সন্তান।সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, আলোচিত এই ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ বাড়ির মাত্র ৫০ গজের মধ্যেই রয়েছে খিলক্ষেত থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ি। গত মে মাসে ফাঁড়িটির নতুন ভবন উদ্বোধন করা হয় এবং বাড়িটির সামনে দিয়ে সারাক্ষণ পুলিশের গাড়ি ও সদস্যদের যাতায়াত ছিল। তবে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শরিফুল ইসলামের দাবি, ফাঁড়িটি পুরোপুরি চালু না হওয়া এবং ওই এলাকায় সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের বসবাস থাকায় তারা এ বিষয়ে কোনো তথ্য বা পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেতেন না। এছাড়া হাউজিংয়ের নিজস্ব চেকপোস্টের নিরাপত্তাকর্মীরাও বিষয়টি জানলেও প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলেননি।
ঘটনার পর পরই অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের খুঁজে বের করতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে ডিবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























