জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল-১২ তে কর্মরত ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে উঠেছে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিম্ন বিভাগীয় সহকারী পদে কর্মজীবন শুরু করে মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি। ২০১৯ সালে এনবিআরে যোগ দেওয়া এই কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, মারাত্মক তথ্য জালিয়াতি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নিজের পদমর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ছোট ভাইকেও সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার আলী আকবর ও রিনা আক্তার দম্পতির সন্তান ফুয়াদ হাসান আকন্দ চাকরির শুরু থেকেই দ্রুত ও অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের নেশায় মেতে ওঠেন। তৃতীয় শ্রেণির পদে কর্মরত থাকলেও কৌশলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছাকাছি থেকে তিনি এনবিআরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগ বাণিজ্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। কর অঞ্চল-১২-এর কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই চাকরিপ্রার্থীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নেওয়া হতো কোটি কোটি টাকা। সাধারণ এক নাজিরের অল্প সময়ের মধ্যে এভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠা নিয়ে খোদ এনবিআরের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ফুয়াদের অপরাধের পরিধি কেবল ঘুষ গ্রহণ বা অর্থ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ভাই শামীম আশরাফকে এনবিআরে চাকরি দিতে তিনি অভিনব তথ্য জালিয়াতির পথ বেছে নেন। ময়মনসিংহের ত্রিশালের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও শামীমকে ঢাকা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে দেখিয়ে যাত্রাবাড়ীর একটি ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে এবং নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে শামীম আশরাফকে উচ্চমান সহকারী পদে নিয়োগ পাইয়ে দেন ফুয়াদ। অথচ সরকারি কেন্দ্রীয় সার্ভারের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যে দেখা যায়, শামীমের ঠিকানা কখনোই ঢাকা জেলায় হালনাগাদ করা হয়নি। বর্তমানে তিনি কর সার্কেল-২৬৩ (সাভার)-এ কর্মরত আছেন। এর আগেও অন্য একটি কর অঞ্চলে একইভাবে ভাইকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে সে সময় যাচাই-বাছাই ও যোগ্যতার অভাবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিস্তৃতি ঘটায়ে গত সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নিয়োগ পরীক্ষাতেও ফুয়াদ সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। নির্ভরযোগ্য অনুসন্ধানী সূত্রের মতে, ওই একটি নিয়োগেই অন্তত ১১ জন প্রার্থীকে অবৈধ লেনদেন ও জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দেন তিনি, যার বিনিময়ে প্রতিটি প্রার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা।
গত সাত বছরের নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ গোপন রাখতে ফুয়াদ রাজধানী ঢাকায় ক্রয় করেছেন একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও জমি। এর পাশাপাশি অবৈধ অর্থের উৎস আড়াল করতে তিনি নিজ জেলা ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিবারের সদস্যদের নামেও গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাবর সম্পত্তি। অনুসন্ধানী সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর এসব সম্পত্তির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরবর্তীতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো বিস্তারিত উল্লেখ করে তাঁর মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া বা লিখিত জবাব পাওয়া যায়নি।
একজন নিম্নপদের কর্মচারীর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ বাণিজ্য এবং সরকারি সার্ভারের তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনবিআরের সহকর্মীরা। সুশাসন নিশ্চিত করা ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ওঠানো সকল অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তসহ দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন ও দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























