লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল রায় তৈরি, সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ে তা দাখিল, ভুয়া সমন তৈরি এবং মামলার নথি গায়েবসহ গুরুতর পাঁচ অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ গত ১৫ অক্টোবর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে আইন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মামলার চলাকালে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রমাণিত পাঁচ গুরুতর অপরাধ
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ৫৭ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট আদালতের মূল নথি, আদেশ, দিনলিপি, দৈনিক কার্যতালিকা, প্রসেস ইস্যু রেজিস্ট্রার এবং সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে বিচারক আরিফুলের বিরুদ্ধে ৫টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
প্রথম অভিযোগটি টাঙ্গাইলের একটি মামলার জাল সমন তৈরি সংক্রান্ত। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কথা বলে টাঙ্গাইল আদালতের একটি সমন দেখিয়ে কর্মস্থলের বাইরে থাকার অনুমতি নেন আরিফুল ইসলাম। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই দিন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের কোনো দিন ছিল না এবং বিচারক আরিফুল ওই মামলার সাক্ষীও ছিলেন না। বেঞ্চ সহকারী মহির উদ্দিন ও অফিস সহায়ক মো. শাহাদাত হোসেনের সহায়তায় ইচ্ছাকৃতভাবে এই মিথ্যা সমন তৈরি করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় অভিযোগটি চারটি দেওয়ানি মামলার মূল নথি আটকে রাখা ও গায়েব করা নিয়ে। রায় লেখার কথা বলে আরিফুল ইসলাম নিজ জিম্মায় নথিগুলো নিয়েছিলেন এবং লিখিত স্বীকৃতিপত্রও দিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘদিনেও সেগুলো ফেরত না দেওয়ায় এবং রায়ের সার্টিফায়েড কপি চাইতে প্রার্থীরা আবেদন করলে নথি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে যে নথিগুলো আর ফেরত দেওয়া হয়নি।
তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ভেদরগঞ্জ সিভিল জজ আদালতের দেওয়ানি ১৬৭/২০২১ নম্বর মামলাকে কেন্দ্র করে। বিচারক আরিফুল দাবি করেছিলেন যে তিনি ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে আদালতে এই মামলাটি খারিজ করে রায় ঘোষণা করেছিলেন এবং জেলা জজ তা ছিঁড়ে ফেলেছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই দিন মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারিতই ছিল না; বরং বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা রায়ের তালিকা থেকে প্রত্যাহার করে পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল। মূল নথিতে কোনো রায়ের অস্তিত্ব না থাকলেও পরে একটি মিথ্যা ও জাল রায় সৃজন করে তা সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয় ও অনুসন্ধান কমিটির কাছে দাখিল করা হয়, যা দণ্ডবিধির ৪৬৬ ও ৪৭১ ধারায় স্পষ্টত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
চতুর্থ ও পঞ্চম অভিযোগটি জেলা জজের সঙ্গে গোপন কথোপকথন রেকর্ড এবং তা গণমাধ্যমে ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত। বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) নিয়ে আলোচনার সময় জেলা জজ মো. সোলায়মানের খাসকামরায় নিজের মোবাইল ফোনে গোপনে কথোপকথন রেকর্ড করেন আরিফুল। পরবর্তীতে সেই রেকর্ডিংয়ের সূত্র ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও অনলাইন চ্যানেলে জেলা জজের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করানোর প্রাথমিক সত্যতাও অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে।
গাজীপুরে মার্কেট দখল ও আত্মীয়দের ওপর মামলাবাজির অভিযোগ
বিচারিক জীবনের অনিয়মের পাশাপাশি এই বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রভাবে সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত হাজি হোসেন পাইকারি মার্কেটের দখল নিতে নিজের আপন চাচা শ্বশুর তৌহিদুল ইসলাম মজিবর এবং সেখানকার প্রায় দেড় শতাধিক কাপড় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে যত্রতত্র মামলা করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে পৈতৃক সম্পত্তির বিরোধের জেরে ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অপব্যবহার করে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও যশোরে অন্তত ১৮টি কাল্পনিক মামলা দায়ের করান। চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, মানব পাচার, গণধর্ষণ এমনকি ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর ধারায় দায়ের করা এসব মামলার কারণে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি ভাইয়ের মেয়ে জামাইয়ের ক্ষমতার প্রভাবে চাচা শ্বশুরকে ২৩ মাস কারাবাসও করতে হয়েছে।
একাধিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা সুবিচার চেয়ে প্রধান বিচারপতিসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। বিভাগীয় মামলার বর্তমান তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিচারক আরিফুলের বিরুদ্ধে ওঠা এই ক্ষমতার অপব্যবহার ও হয়রানিমূলক মামলাবাজির অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















