ঢাকা ০৫:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হলো গবেষণার সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া: পবিপ্রবি উপাচার্য মহাপরিচালকের কণ্ঠে কথিত অডিও নিয়ে অপপ্রচার, ‘প্রযুক্তির কারসাজি’ বলছে রেলওয়ে আহসানুল হাবিবের নিয়ন্ত্রণে উত্তরা ব্যাংকের সিবিএ, ১৭ বছরেও হয়নি নির্বাচন গণপূর্তের উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশারকে ঘিরে নানা অভিযোগ ক্যাডার-নন-ক্যাডার দ্বন্দ্বে ১৪ বছর ধরে অচলাবস্থা গণপূর্তে এনবিআর সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে বেনামে বন্ড প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ এআইয়ের নতুন নাম দিলেন ট্রাম্প, ভুল বানান নিয়ে হাস্যরস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় মানুষ হাসবে: গোলাম পরওয়ার নিজেদের অর্থ ও স্বেচ্ছাশ্রমে সংস্কার, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা লালপুরে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ধাক্কায় প্রাণ গেল পথচারীর

ক্যাডার-নন-ক্যাডার দ্বন্দ্বে ১৪ বছর ধরে অচলাবস্থা গণপূর্তে

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে ১৪ বছর ধরে চলছে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার জটিলতা। আর এই আইনি মারপ্যাঁচে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মকর্তার বৈধতা নিয়ে অপরপক্ষের করা রিট মামলা এবং আদালতের রায়ের টানাপোড়েনে এই প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

নিয়োগপ্রাপ্তরা নিজেদের ক্যাডার কর্মকর্তা দাবি করছেন। তবে বিসিএস (২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম) ক্যাডার কর্মকর্তাদের দাবি, তারা নন-ক্যাডার এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নিয়ে আইনগত ত্রুটি রয়েছে। এর জেরে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর একাধিক পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে জরুরি সরকারি সেবা। থমকে আছে অনেক সিদ্ধান্তও। অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ফলে একদিকে জনবল থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দুপক্ষের তীব্র দ্বন্দ্বে সমাধান মিলছে না। বিষয়টির সুরাহার জন্য অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। মন্ত্রণালয় মামলার কারণে কাউকে পদোন্নতি দিতে পারছে না।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১১ সালে পিএসসি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে প্রায় শতাধিক আবেদন পড়লেও নিয়োগ পান ১৪ জন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে ২০১২ সালে যোগদান করেন। তাঁদের সবার বিএসসির ফল প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র ক্যাডার রয়েছে, যেখানে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে।

বিসিএস (গণপূর্ত) বিভিন্ন ব্যাচে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা আদালতে একটি মামলা করেন। এরপর মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর ১১ জনকে স্থায়ী নিয়োগের বিষয়ে মতামত চেয়ে চিঠি দিলে পিএসসি চিঠিতে উল্লেখ করে, তাঁদের ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগপ্রাপ্তদের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁরা নিজেদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের আশঙ্কা করছেন।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে রাজনৈতিক বিবেচনায় শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) পদে ১১ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের নন-ক্যাডার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ক্যাডারভুক্তি ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

আবেদনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস, ১৯৮১-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিধিমালা জারির সময় বিসিএস (পাবলিক ওয়ার্কস) ক্যাডারে সহকারী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী পদ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালে বিধিমালা সংশোধন করে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। উচ্চ আদালত ও আপিল বিভাগের বিভিন্ন রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বিধান নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি এবং ২০১২ সালে ওই বিজ্ঞপ্তির অধীনে নিয়োগও আইনগতভাবে বৈধ নয়—এমন দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মূলত নন-ক্যাডার বলা হয়েছে।

চিঠিতে ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাঁরা এরই মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতির প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) পদে যোগ দেওয়া কর্মকর্তারা সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭-এর বিধি ৮(২) অনুযায়ী পঞ্চম গ্রেডের পদে পদোন্নতির যোগ্য নন বলে দাবি করা হয়েছে। একই পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতার মানদণ্ড আইনগতভাবে থাকার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন কর্মকর্তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা উদ্যোগী হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

উপবিভাগীয় পদে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া প্রকৌশলীদের দাবি, পিএসসি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চিঠিতে সব নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নিয়োগে কোনো অবৈধতা প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু এরপরও একের পর এক রিটের কারণে মন্ত্রণালয় নিয়মিত পদে পদোন্নতি দিতে পারছে না। তবে এর দায় অধিদপ্তরের বলে তাঁরা দাবি করেন। পিএসসি ও মন্ত্রণালয় তাঁদের নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই সমস্যা সমাধান করেননি অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা—এমন অভিযোগও করেন তাঁরা।

গণপূর্ত থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে বলা হয়, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা রিজার্ভসহ ১১টি। এই পদের বিপরীতে বর্তমানে সাতজন কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে কর্মরত আছেন। প্রেষণে পদায়ন, পদোন্নতি ও নতুন পদ সৃজিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ১২৪৬ নম্বর পত্রের মাধ্যমে একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে জানানো হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। সরকারি কাজের স্বার্থে তিনটি শূন্য পদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করা প্রয়োজন। এজন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য নাম প্রেরণ করলেও মামলা জটিলতায় তা হয়নি। বরং বারবার চিঠি দিলেও আদালতে রিটের কারণে তা থমকে আছে।

এ বিষয়ে ২০১১ সালে উপবিভাগীয় পদে নিয়োগ পাওয়া এবং বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) হিসেবে কর্মরত মো. জিয়াউর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ও সমীরণ মিস্ত্রী বলেন, ‘উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে আমাদের পিএসসি নিয়োগ দিয়েছে। বিসিএস ক্যাডার প্রকৌশলী হিসেবে দেওয়া হয়েছে।’

বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. মোর্শেদ ইকবাল বলেন, ‘উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা নন-ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁরা ক্যাডার পরিচয় দিচ্ছেন। এটা অবৈধ।’ তিনি বলেন, ‘সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়া এরা পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।’

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি জটিল। পিএসসি এভাবে নিয়োগ দিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। যেহেতু বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র একটি ক্যাডার রয়েছে, সেখানে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান। সেখানে বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এক পদ ওপরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়াটা সমীচীন হয়নি। এ ছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা ছাড়া পদোন্নতিরও সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে কথা বলতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মাদ সারওয়ার জাহান বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হলো গবেষণার সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া: পবিপ্রবি উপাচার্য

ক্যাডার-নন-ক্যাডার দ্বন্দ্বে ১৪ বছর ধরে অচলাবস্থা গণপূর্তে

আপডেট সময় ০৫:০০:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে ১৪ বছর ধরে চলছে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার জটিলতা। আর এই আইনি মারপ্যাঁচে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মকর্তার বৈধতা নিয়ে অপরপক্ষের করা রিট মামলা এবং আদালতের রায়ের টানাপোড়েনে এই প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

নিয়োগপ্রাপ্তরা নিজেদের ক্যাডার কর্মকর্তা দাবি করছেন। তবে বিসিএস (২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম) ক্যাডার কর্মকর্তাদের দাবি, তারা নন-ক্যাডার এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নিয়ে আইনগত ত্রুটি রয়েছে। এর জেরে দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর একাধিক পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে জরুরি সরকারি সেবা। থমকে আছে অনেক সিদ্ধান্তও। অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ফলে একদিকে জনবল থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দুপক্ষের তীব্র দ্বন্দ্বে সমাধান মিলছে না। বিষয়টির সুরাহার জন্য অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। মন্ত্রণালয় মামলার কারণে কাউকে পদোন্নতি দিতে পারছে না।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১১ সালে পিএসসি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে প্রায় শতাধিক আবেদন পড়লেও নিয়োগ পান ১৪ জন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে ২০১২ সালে যোগদান করেন। তাঁদের সবার বিএসসির ফল প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র ক্যাডার রয়েছে, যেখানে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে।

বিসিএস (গণপূর্ত) বিভিন্ন ব্যাচে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা আদালতে একটি মামলা করেন। এরপর মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর ১১ জনকে স্থায়ী নিয়োগের বিষয়ে মতামত চেয়ে চিঠি দিলে পিএসসি চিঠিতে উল্লেখ করে, তাঁদের ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগপ্রাপ্তদের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁরা নিজেদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের আশঙ্কা করছেন।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে রাজনৈতিক বিবেচনায় শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) পদে ১১ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের নন-ক্যাডার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ক্যাডারভুক্তি ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

আবেদনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস, ১৯৮১-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিধিমালা জারির সময় বিসিএস (পাবলিক ওয়ার্কস) ক্যাডারে সহকারী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী পদ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালে বিধিমালা সংশোধন করে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। উচ্চ আদালত ও আপিল বিভাগের বিভিন্ন রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বিধান নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি এবং ২০১২ সালে ওই বিজ্ঞপ্তির অধীনে নিয়োগও আইনগতভাবে বৈধ নয়—এমন দাবি করা হয়েছে। তাঁদের মূলত নন-ক্যাডার বলা হয়েছে।

চিঠিতে ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাঁরা এরই মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতির প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) পদে যোগ দেওয়া কর্মকর্তারা সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭-এর বিধি ৮(২) অনুযায়ী পঞ্চম গ্রেডের পদে পদোন্নতির যোগ্য নন বলে দাবি করা হয়েছে। একই পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতার মানদণ্ড আইনগতভাবে থাকার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন কর্মকর্তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা উদ্যোগী হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

উপবিভাগীয় পদে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া প্রকৌশলীদের দাবি, পিএসসি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চিঠিতে সব নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নিয়োগে কোনো অবৈধতা প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু এরপরও একের পর এক রিটের কারণে মন্ত্রণালয় নিয়মিত পদে পদোন্নতি দিতে পারছে না। তবে এর দায় অধিদপ্তরের বলে তাঁরা দাবি করেন। পিএসসি ও মন্ত্রণালয় তাঁদের নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই সমস্যা সমাধান করেননি অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা—এমন অভিযোগও করেন তাঁরা।

গণপূর্ত থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে বলা হয়, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর মঞ্জুরীকৃত পদের সংখ্যা রিজার্ভসহ ১১টি। এই পদের বিপরীতে বর্তমানে সাতজন কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে কর্মরত আছেন। প্রেষণে পদায়ন, পদোন্নতি ও নতুন পদ সৃজিত হওয়ায় মাঠপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ১২৪৬ নম্বর পত্রের মাধ্যমে একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে জানানো হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। সরকারি কাজের স্বার্থে তিনটি শূন্য পদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করা প্রয়োজন। এজন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য নাম প্রেরণ করলেও মামলা জটিলতায় তা হয়নি। বরং বারবার চিঠি দিলেও আদালতে রিটের কারণে তা থমকে আছে।

এ বিষয়ে ২০১১ সালে উপবিভাগীয় পদে নিয়োগ পাওয়া এবং বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) হিসেবে কর্মরত মো. জিয়াউর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ও সমীরণ মিস্ত্রী বলেন, ‘উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে আমাদের পিএসসি নিয়োগ দিয়েছে। বিসিএস ক্যাডার প্রকৌশলী হিসেবে দেওয়া হয়েছে।’

বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. মোর্শেদ ইকবাল বলেন, ‘উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা নন-ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁরা ক্যাডার পরিচয় দিচ্ছেন। এটা অবৈধ।’ তিনি বলেন, ‘সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়া এরা পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।’

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি জটিল। পিএসসি এভাবে নিয়োগ দিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। যেহেতু বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র একটি ক্যাডার রয়েছে, সেখানে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পান। সেখানে বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এক পদ ওপরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়াটা সমীচীন হয়নি। এ ছাড়া পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা ছাড়া পদোন্নতিরও সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে কথা বলতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মাদ সারওয়ার জাহান বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’