ঢাকা ০৯:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দায়িত্ব বাড়ল দুই মন্ত্রীর নেত্রকোনায় জুয়ার আসর থেকে ৮ জুয়াড়ি আটক মায়ের কোলে শিশু যেমন নিরাপদ, বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষও তেমন নিরাপদ : চরমোনাই পীর নোয়াখালীতে সাবেক রেলওয়ে প্রকৌশলী শাহ আলমের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল কোটালীপাড়ায় প্রীতি ফুটবল ম্যাচ: বিবাহিত ও অবিবাহিত দল গোলে ড্র শিবগঞ্জে রাতের আঁধারে কবরস্থানের ১৪০ মেহগনি গাছ কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা ব্রাহ্মণপাড়ায় পুলিশের পৃথক অভিযানে ৯ জন গ্রেপ্তার, সাড়ে ২৬ কেজি গাঁজা উদ্ধার ময়নাতদন্ত ও থানায় অভিযোগ ছাড়াই সোহাগের লাশ দাফন: রহস্য আরও ঘনীভূত হাই-টেক পার্কে আনোয়ার-শফিকের কোটি টাকার অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারের তথ্য পাচার ও ওএসএস ঘিরে অভিযোগ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদককে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বদলির পরও শফিকের নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন

হাই-টেক পার্কে আনোয়ার-শফিকের কোটি টাকার অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারের তথ্য পাচার ও ওএসএস ঘিরে অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৭:২১:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১৫ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, কেনাকাটা ও টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস), অনাপত্তিপত্র (এনওসি), জমি ও স্পেস বরাদ্দ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পর আইসিটি বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যেই গত ৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অফিস আদেশে আনোয়ার হোসেনকে চট্টগ্রামের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এবং মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি আদেশ কার্যকর হওয়া নিয়ে এরই মধ্যে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় পার হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানও জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও তিনি যোগদান করেননি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তাঁর বদলি আদেশ বাস্তবায়নে বাধা কোথায়, কার অনুমতিতে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে আছেন এবং এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা রয়েছে কি না।
শুধু বদলি করলেই কি দীর্ঘদিনের অভিযোগের দায় শেষ হয়ে যায়—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। কারণ, শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সঙ্গে হাই-টেক পার্কের প্রশাসনিক কার্যক্রম, প্রকল্প, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি এবং জমি-স্পেস বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নথি, ফাইল, ই-ফাইল, টেন্ডার-সংক্রান্ত তথ্য বা ডিজিটাল অ্যাক্সেস থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও নথির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সরকারি রেকর্ডে শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার হাতে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একই সময়ে ১২টি জেলায় আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব, শিফট/বিআইএফটি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক, ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের দায়িত্ব, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং শাখার দায়িত্ব এবং তাঁর মূল প্রশাসনিক পদসহ অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একজন কর্মকর্তার হাতে এতগুলো সংবেদনশীল দায়িত্ব কীভাবে কেন্দ্রীভূত হলো এবং কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি এসব দায়িত্ব পেয়েছিলেন—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রভাবশালী ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষের সময় থেকে শফিকের প্রশাসনিক প্রভাব বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তার হাতে প্রশাসন, প্রকল্প, ওএসএস, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে ছিল কি না এবং কোনো অডিট আপত্তি বা প্রশাসনিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি এসব দায়িত্ব পালন করেছেন।
আর্থিক নথি ও অডিট-সংক্রান্ত তথ্যেও শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাঁর মূল বেতন বাবদ মোট ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩১৪ টাকা অতিরিক্ত ও অনিয়মিত উত্তোলনের তথ্য সরকারি অডিটে ধরা পড়ে। এই অর্থের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা ফেরত বা সমন্বয় করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার প্রমাণ কোথায়—এ বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর পাশাপাশি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা খরচ দেখানোর বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই ব্যয়ের বড় অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
শফিককে ঘিরে সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযোগগুলোর একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা ওএসএস এবং অনাপত্তিপত্র বা এনওসি প্রদানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, স্যামসাংসহ বিভিন্ন বহুজাতিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ডিউটি-ফ্রি ইকুইপমেন্ট আমদানির অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার গোপন লেনদেন হয়েছে। এই অর্থের অভিযোগ সত্য কি না, কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট এনওসি ফাইলগুলোতে কারা নোট ও অনুমোদন দিয়েছেন এবং আমদানির কাগজপত্রের সঙ্গে অনুমোদনের তথ্য মেলে কি না—এসবই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
এ ছাড়া ১২টি আইটি পার্ক প্রকল্পের ট্রেনিং ও কনস্ট্রাকশন টেন্ডার এবং পার্কগুলোর জমি ও স্পেস বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে অভিযোগের সূত্রপাত তাঁর চাকরিজীবনের পূর্ববর্তী ভূমিকা ও পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থানকে কেন্দ্র করে। পুরোনো কর্মী তালিকায় তাঁকে ‘কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ হিসেবে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত থাকার তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পান—এমন অভিযোগও রয়েছে।
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) রঞ্জিত কুমারের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী নিয়োগ-সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা নাটোরের সিংড়া এলাকায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১০ জন কর্মীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর প্রশাসনিক অভিযোগগুলোর একটি হলো টেন্ডারের গোপন প্রাক্কলন বা টেন্ডার এস্টিমেট নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাছে আগেই পাচার করা।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্নটি এখন শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি নিয়ে। গত ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী তাঁকে যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় এবং ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাই-টেক পার্কের এমডি ফজলুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত স্থানেও শফিক যোগদান করেননি। এখন প্রশ্ন হলো—তিনি বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে কোন অবস্থানে আছেন এবং তাঁর অনুপস্থিতি বা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না।
কারণ, আইসিটি বিভাগ ইতোমধ্যে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করেছে। তদন্ত চলাকালে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি একই প্রশাসনিক পরিবেশে প্রভাব বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তদন্তের নথি, সাক্ষী, ফাইল কিংবা ডিজিটাল তথ্যের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব পড়েছে কি না—সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বদলি কি জবাবদিহির বিকল্প? একটি কর্মকর্তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে; কিন্তু কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওএসএস-এ অর্থ লেনদেন এবং প্রকল্প-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহলে শুধু বদলির মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় না। অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ, অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা নির্ধারণ প্রয়োজন; আর অভিযোগ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তিও নিশ্চিত হওয়া উচিত।
হাই-টেক পার্কের এমডি ফজলুর রহমান বলেছেন, শফিককে বদলি করা হয়েছে, তিনি দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং শুনেছেন বদলিকৃত স্থানেও তিনি যোগদান করেননি। এমডি আরও জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৭ বছর ধরে যে প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রভাবের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা শুধু ব্যক্তিবিশেষের বদলি দিয়ে শেষ করার সুযোগ নেই। হাই-টেক পার্কের প্রকল্প, নিয়োগ, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি, জমি ও স্পেস বরাদ্দ এবং আর্থিক লেনদেনের পুরো ‘মানি ট্রেইল’ ও ‘ফাইল ট্রেইল’ অনুসরণ করলেই বোঝা সম্ভব—অভিযোগগুলো কতটা সত্য, কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারা সুবিধা পেয়েছেন এবং কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় কোথায় গিয়ে থামে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দায়িত্ব বাড়ল দুই মন্ত্রীর

বদলির পরও শফিকের নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন

হাই-টেক পার্কে আনোয়ার-শফিকের কোটি টাকার অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারের তথ্য পাচার ও ওএসএস ঘিরে অভিযোগ

আপডেট সময় ০৭:২১:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, কেনাকাটা ও টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস), অনাপত্তিপত্র (এনওসি), জমি ও স্পেস বরাদ্দ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পর আইসিটি বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যেই গত ৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অফিস আদেশে আনোয়ার হোসেনকে চট্টগ্রামের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এবং মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি আদেশ কার্যকর হওয়া নিয়ে এরই মধ্যে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় পার হলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমানও জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও তিনি যোগদান করেননি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তাঁর বদলি আদেশ বাস্তবায়নে বাধা কোথায়, কার অনুমতিতে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে আছেন এবং এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা রয়েছে কি না।
শুধু বদলি করলেই কি দীর্ঘদিনের অভিযোগের দায় শেষ হয়ে যায়—এ প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। কারণ, শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সঙ্গে হাই-টেক পার্কের প্রশাসনিক কার্যক্রম, প্রকল্প, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি এবং জমি-স্পেস বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নথি, ফাইল, ই-ফাইল, টেন্ডার-সংক্রান্ত তথ্য বা ডিজিটাল অ্যাক্সেস থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও নথির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সরকারি রেকর্ডে শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার হাতে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একই সময়ে ১২টি জেলায় আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব, শিফট/বিআইএফটি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক, ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের দায়িত্ব, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং শাখার দায়িত্ব এবং তাঁর মূল প্রশাসনিক পদসহ অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
একজন কর্মকর্তার হাতে এতগুলো সংবেদনশীল দায়িত্ব কীভাবে কেন্দ্রীভূত হলো এবং কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি এসব দায়িত্ব পেয়েছিলেন—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রভাবশালী ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষের সময় থেকে শফিকের প্রশাসনিক প্রভাব বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, একই কর্মকর্তার হাতে প্রশাসন, প্রকল্প, ওএসএস, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে ছিল কি না এবং কোনো অডিট আপত্তি বা প্রশাসনিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি এসব দায়িত্ব পালন করেছেন।
আর্থিক নথি ও অডিট-সংক্রান্ত তথ্যেও শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাঁর মূল বেতন বাবদ মোট ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩১৪ টাকা অতিরিক্ত ও অনিয়মিত উত্তোলনের তথ্য সরকারি অডিটে ধরা পড়ে। এই অর্থের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা ফেরত বা সমন্বয় করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার প্রমাণ কোথায়—এ বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর পাশাপাশি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা খরচ দেখানোর বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই ব্যয়ের বড় অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
শফিককে ঘিরে সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযোগগুলোর একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা ওএসএস এবং অনাপত্তিপত্র বা এনওসি প্রদানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, স্যামসাংসহ বিভিন্ন বহুজাতিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ডিউটি-ফ্রি ইকুইপমেন্ট আমদানির অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার গোপন লেনদেন হয়েছে। এই অর্থের অভিযোগ সত্য কি না, কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট এনওসি ফাইলগুলোতে কারা নোট ও অনুমোদন দিয়েছেন এবং আমদানির কাগজপত্রের সঙ্গে অনুমোদনের তথ্য মেলে কি না—এসবই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
এ ছাড়া ১২টি আইটি পার্ক প্রকল্পের ট্রেনিং ও কনস্ট্রাকশন টেন্ডার এবং পার্কগুলোর জমি ও স্পেস বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে অভিযোগের সূত্রপাত তাঁর চাকরিজীবনের পূর্ববর্তী ভূমিকা ও পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থানকে কেন্দ্র করে। পুরোনো কর্মী তালিকায় তাঁকে ‘কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ হিসেবে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত থাকার তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পান—এমন অভিযোগও রয়েছে।
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) রঞ্জিত কুমারের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী নিয়োগ-সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা নাটোরের সিংড়া এলাকায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১০ জন কর্মীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর প্রশাসনিক অভিযোগগুলোর একটি হলো টেন্ডারের গোপন প্রাক্কলন বা টেন্ডার এস্টিমেট নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাছে আগেই পাচার করা।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্নটি এখন শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি নিয়ে। গত ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী তাঁকে যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় এবং ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হাই-টেক পার্কের এমডি ফজলুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত স্থানেও শফিক যোগদান করেননি। এখন প্রশ্ন হলো—তিনি বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে কোন অবস্থানে আছেন এবং তাঁর অনুপস্থিতি বা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না।
কারণ, আইসিটি বিভাগ ইতোমধ্যে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করেছে। তদন্ত চলাকালে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি একই প্রশাসনিক পরিবেশে প্রভাব বজায় রাখতে পারেন, তাহলে তদন্তের নথি, সাক্ষী, ফাইল কিংবা ডিজিটাল তথ্যের ওপর কোনো ধরনের প্রভাব পড়েছে কি না—সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বদলি কি জবাবদিহির বিকল্প? একটি কর্মকর্তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে; কিন্তু কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি কোটি কোটি টাকার অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওএসএস-এ অর্থ লেনদেন এবং প্রকল্প-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহলে শুধু বদলির মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় না। অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ, অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা নির্ধারণ প্রয়োজন; আর অভিযোগ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তিও নিশ্চিত হওয়া উচিত।
হাই-টেক পার্কের এমডি ফজলুর রহমান বলেছেন, শফিককে বদলি করা হয়েছে, তিনি দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং শুনেছেন বদলিকৃত স্থানেও তিনি যোগদান করেননি। এমডি আরও জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৭ বছর ধরে যে প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রভাবের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা শুধু ব্যক্তিবিশেষের বদলি দিয়ে শেষ করার সুযোগ নেই। হাই-টেক পার্কের প্রকল্প, নিয়োগ, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি, জমি ও স্পেস বরাদ্দ এবং আর্থিক লেনদেনের পুরো ‘মানি ট্রেইল’ ও ‘ফাইল ট্রেইল’ অনুসরণ করলেই বোঝা সম্ভব—অভিযোগগুলো কতটা সত্য, কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কারা সুবিধা পেয়েছেন এবং কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় কোথায় গিয়ে থামে।