মাত্র পাঁচ লাখ টাকায় অস্ট্রেলিয়া। লাগবে না আইইএলটিএস, লাগবে না শিক্ষাগত যোগ্যতা। আগে দিতে হবে মাত্র ৬০ হাজার টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর বাকি ৪ লাখ ৪০ হাজার। এক থেকে দেড় মাসেই মিলবে ভিসা। সঙ্গে চাকরি, মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বেতন। এমনকি পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার সুযোগও রয়েছে!
স্বপ্নের মতো শোনানো এসব প্রলোভন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে। ‘আল সামস ভিসা সার্ভিস’ নামে বিভিন্ন আইডি, পেজ ও চ্যানেলে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে এমন ভিডিও। আর সেই প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে অর্থ হারানোর অভিযোগ করছেন বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকার তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসীরা।
অনুসন্ধানে অন্তত ২০ জনের প্রতারণার শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কারও কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ টাকা, কারও কাছ থেকে ৬০ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে যোগাযোগ। কেউ ফোন ধরছেন না, কেউ আবার ঘুরছেন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা মো. ইসমাইল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন।
নিজেকে নোয়াখালীর বাসিন্দা দাবি করে তিনি জানান, নয় বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় যান। তার দাবি, অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও পর্তুগাল, দুবাই, ওমান ও মালয়েশিয়ায় তার অফিস রয়েছে। বহু বাংলাদেশিকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশে কোনো অফিস নেই বলেও জানান তিনি। ফলে বাংলাদেশ থেকে যারা যোগাযোগ করেন, তাদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলা হয়।
কিন্তু অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠেছে অন্য জায়গায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা ‘মাত্র পাঁচ লাখ টাকায় অস্ট্রেলিয়া’, ‘আইইএলটিএস ছাড়াই’, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই’ এবং ‘যেকোনো দেশ থেকে শুধু পাসপোর্ট দিয়ে’ যাওয়ার দাবির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃত ভিসা ব্যবস্থার কতটা মিল রয়েছে? অস্ট্রেলিয়ার ৪৮২ ভিসার সরকারি শর্ত পর্যালোচনা করে এসব দাবির বেশ কয়েকটির সঙ্গে স্পষ্ট অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
‘আল সামস ভিসা সার্ভিস’ নামে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে চালানো প্রচারণায় অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক ভিসা, ফ্যামিলি ভিসা এবং পরিবারসহ স্থায়ী হওয়ার সুযোগের কথা বলা হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় যেতে খরচ হবে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। কোথাও বলা হচ্ছে, প্রথমে ৬০ হাজার টাকা দিলেই শুরু হবে প্রক্রিয়া। এরপর জব লেটার, মেডিকেল, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন ধাপে অর্থ নেওয়া হবে। প্রচারণায় সময়ও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে এক থেকে দেড় মাসে।
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণ কিংবা বিদেশে থাকা কোনো প্রবাসীর কাছে এমন প্রস্তাব নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। আর সেই আকর্ষণকেই ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পক্ষ থেকে ছদ্মনামে ইসমাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশে তাদের কোনো অফিস নেই। অস্ট্রেলিয়া যেতে হলে তাকে বিশ্বাস করে ধাপে ধাপে টাকা দিতে হবে। এর আগে পাসপোর্টের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা পাঠাতে বলেন তিনি। বলেন, কাগজপত্র যাচাই করে সঠিক থাকলে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানাবেন। তার চাওয়া কাগজপত্রের মধ্যে মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ছাড়া বাকি নথি কৃত্রিমভাবে তৈরি করে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, কথিত প্রতিষ্ঠানটি আদৌ কাগজপত্র যাচাই করে কি না, তা পরীক্ষা করা। যদি যথাযথভাবে যাচাই করা হতো, তাহলে ভুয়া নথি ধরা পড়ার কথা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আসে আরেকটি বার্তা।
‘আল সামস ভিসা সার্ভিস’ নামে ইমু আইডি থেকে দেওয়া হয় সিটি ব্যাংক নাটোর শাখার একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর। অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম মো. আবুল হোসেন। আবেদন বাবদ ওই হিসাবে ১২ হাজার ৫০০ টাকা পাঠাতে বলা হয়। অর্থাৎ কথিত কাগজপত্র যাচাইয়ের আগেই অর্থ চাওয়ার বিষয়টি অনুসন্ধানে সামনে আসে।
পরে ইসমাইলের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা না পাঠানোয় বিরক্তি প্রকাশ করেন। এ প্রান্ত থেকে তাকে বলা হয়, ওই অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের কোনো ফোন নম্বর না দেওয়ায় টাকা পাঠানো হয়নি। কারণ ফোন নম্বর থাকলে তিনি টাকা পেয়েছেন কি না, তা সহজেই নিশ্চিত হওয়া যেত।
গতকাল সোমবার যোগাযোগ করা হলে ইসমাইল আরও একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেন। সেটি প্রাইম ব্যাংক পিএলসি হেড অফিসের অ্যাকাউন্ট নম্বর। ওই অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের নাম মো. আল আমিন। তার ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আল আমিন জানান, ইসমাইল তার চাচাতো ভাই। আলামিনের বাড়ি নোয়াখালীতে হলেও তিনি সিরাজগঞ্জ সদরে শ্বশুরালয়ে থাকেন। তার মাধ্যমে বহু যুবক ইসমাইলের কাছে টাকা পাঠান। বহু যুবক ইসমাইলের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া গেছেন বলেও দাবি করেন আল আমিন।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা যায়, শুধু এক-দুইটি ব্যাংক হিসাব নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা একাধিক ব্যক্তির হিসাব ব্যবহার করে টাকা নেওয়া হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এসব হিসাব থেকে অর্থ অন্য আর্থিক সেবার মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে থাকা সংশ্লিষ্টদের কাছে টাকা পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, অনুসন্ধানে অন্তত ২০ জনের প্রতারণার শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে, গোলাম রাব্বী নামে এক যুবকের দাবি, তিনি তিন লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। মো. রবিউল জানান, অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্টরা ফোন ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন।
প্রবাসী মো. মাসুমের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে বিশ্বাস করে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য তিনি পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন। পরে বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। মো. মনির আবির ৮৫ হাজার টাকা এবং মো. আরিফ খান এক লাখ টাকা হারানোর দাবি করেছেন। আরও দুই ভুক্তভোগীর একজন সাড়ে তিন লাখ এবং অন্যজন এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া শিপন নামে একজন এক লাখ, অন্য একজন ৬০ হাজার, আরেকজন ৫০ হাজার এবং নুর ই সাজ্জাদ ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার দাবি করেছেন। আকাশ নামে একজনের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। অন্যদিকে আশরাফ নামে এক প্রবাসী জানান, তিনি ওমানে ইসমাইলের অফিসে গিয়েছিলেন। কথাবার্তায় বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কোনো টাকা দেননি।
আল সামস ভিসা সার্ভিসের প্রচারণামূলক ভিডিওগুলোয় ইসমাইলকে বলতে শোনা যায়, দালালের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া যেতে যেখানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়, তাদের মাধ্যমে গেলে খরচ হবে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। আরও দাবি করা হচ্ছে, পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ার ভিসার জন্য আবেদন করা যায়। এমনকি সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন কিংবা মালয়েশিয়ায় থাকা কোনো বাংলাদেশির ‘ভিসা নাই, বাতাকা নাই, আকামা নাই’ এমন অবস্থায়ও শুধু পাসপোর্টের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা করা সম্ভব।
আরেক ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, পৃথিবীর যেকোনো দেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেই সহজে অস্ট্রেলিয়া যাওয়া যাবে এবং সেখানে মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বেতন পাওয়া যাবে।
এদিকে অনুসন্ধানে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ভিসা ব্যবস্থার সঙ্গে এসব দাবির বেশ কয়েকটির মিল পাওয়া যায়নি। প্রচারণায় ‘সাবক্লাস ৪৮২’ এবং ‘ওয়ার্ক পারমিট ভিসা’ করার কথা বলা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাবক্লাস ৪৮২ বর্তমানে স্কিলস ইন ডিমান্ড বা এসআইডি ভিসা। এটি একটি নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ ও মনোনয়নের সঙ্গে যুক্ত অস্থায়ী কর্মভিসা।
অর্থাৎ শুধু পাসপোর্ট থাকলেই এ ভিসা পাওয়ার সুযোগ নেই। কোর স্কিলস স্ট্রিমে আবেদনকারীর মনোনীত পেশা নির্ধারিত তালিকায় থাকতে হয়। সংশ্লিষ্ট কাজে অন্তত এক বছরের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার যোগ্যতাও পূরণ করতে হয়।
২০২৫ সালের সংশ্লিষ্ট অস্ট্রেলীয় আইনি বিধিতেও নির্দিষ্ট ইংরেজি পরীক্ষার স্কোরের বিধান রয়েছে। আইইএলটিএসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান অন্তত ৫.০। অবশ্য আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় থাকতে পারে।
ফলে ‘কোনো আইইএলটিএস লাগবে না’, ‘কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে না’ কিংবা ‘যে কেউ শুধু পাসপোর্ট দিয়ে যেতে পারবেন’ এমন সর্বজনীন দাবি সাবক্লাস ৪৮২ ভিসার সরকারি যোগ্যতার কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রচারণার আরেকটি বড় আকর্ষণ পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সুযোগ। বলা হচ্ছে, অল্প খরচে পরিবার নিয়ে সেখানে স্থায়ী হওয়া যাবে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সাবক্লাস ৪৮২ ভিসাধারীর নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সাবসিকুয়েন্ট ইন্ট্রান্ট হিসেবে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সেটিও মূল ভিসাধারীর ভিসার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্তের অধীন। অর্থাৎ ‘ফ্যামিলি ভিসা’কে সবার জন্য পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
আল সামস ভিসা সার্ভিস আইডিতে দেওয়া ইমু নম্বরে যোগাযোগ করা হলে, অপর প্রান্ত থেকে ইসমাইল বলেন, একজন কর্মীকে অস্ট্রেলিয়ায় নিতে মোট খরচ হবে ১৮ থেকে ১৯ লাখ টাকা। আবেদনকারী দেবেন মাত্র পাঁচ লাখ। বাকি ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা কোম্পানি ‘স্পনসর’ করবে। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কর্মীকে চার বছরের চুক্তিতে নেওয়া হবে। পরে তার বেতন থেকে ১ লাখ টাকা করে কেটে কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ তুলে নেবে। এই দাবির আইনগত ও বাস্তব ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ ৪৮২ ভিসায় কর্মী নির্দিষ্ট অনুমোদিত স্পনসর ও মনোনীত পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে কোন কোম্পানি স্পনসর করছে, কী পেশায় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, চাকরির চুক্তি কী, বেতন কত এবং কর্মীর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না, এসব তথ্য যাচাই করা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন জনশক্তি বিশ্লেষকেরা।
আল সামস ভিসা সার্ভিসের প্রচারণামূলক ভিডিওতে কয়েকজনকে নিজেদের অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে দেখা যায়। মোহাম্মদ রুবেল নামে একজনকে বলতে শোনা যায়, তিনি মালয়েশিয়া থেকে আল সামসের মাধ্যমে আবেদন করে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পেয়েছেন। আরেকজনও মালয়েশিয়া থেকে আবেদন করে ভিসা পাওয়ার কথা জানান।
তবে অনুসন্ধানে তাদের ভিসার প্রকৃত ধরন, কোন নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের অধীনে ভিসা হয়েছে, কোন পেশায় নিয়োগ হয়েছে এবং সরকারি ভিসা নথি কী, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে এসব ভিডিওকে ভিসা পাওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আল সামস ভিসা সার্ভিস নামের পেজ ও আইডির ভিডিওতে মো. ইসমাইলকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের কোনো অফিস নেই বলে ইসমাইল নিজেই জানিয়েছেন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ থেকে যারা আবেদন করছেন তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ? যে ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠাতে বলা হচ্ছে, সেটি প্রতিষ্ঠানের নামে নয় কেন? আবেদনকারীদের টাকা কোথায় যাচ্ছে? সেই অর্থের শেষ গন্তব্যই বা কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে। প্রচারণায় বলা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পেতে সময় লাগবে মাত্র এক থেকে দেড় মাস। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইট ভিসা প্রসেসিং টাইমকে একটি নির্দেশক সময় হিসেবে উল্লেখ করে। নির্দিষ্ট কোনো আবেদন এক থেকে দেড় মাসেই শেষ হবে, এমন নিশ্চয়তা সেখানে নেই। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আল সামস ভিসা সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি প্রতারণার বিষয়টি নানান কৌশলে এড়িয়ে যান।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের প্রলোভন দিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছে বিভিন্ন চক্র। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও বা পোস্ট দেখে ফাঁদে পড়া যাবে না। সন্দেহভাজন কিছু নজরে এলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তৎপর মানবপাচারকারী ও প্রতারকদের আইনের আওতায় আনতে আরও সোচ্চার হতে হবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চমকপ্রদ ভিডিও দেখে ভালোভাবে না বুঝে কোনো ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ডিবিতে এ বিষয়ে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করেননি। তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে কোনো অভিযোগ না পেলেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ সিআইডিতে আসেনি। বিদেশে বসে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নেওয়া নিশ্চয়ই অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, মানব পাচার ও অর্থ পাচারসংক্রান্ত কেউ কোনো অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে। এ ছাড়া তথ্য পেলে নিজস্ব উদ্যোগেও এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় কাজের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় থাকা অনেক বাংলাদেশিও তুলনামূলক ভালো আয় ও উন্নত জীবনযাপনের আশায় অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই চাহিদাকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার প্রচারণায় কাজে লাগানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। আইইএলটিএস নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। আগে পুরো টাকা দিতে হবে না। এক থেকে দেড় মাসে ভিসা। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা বেতন। পরিবারসহ স্থায়ী হওয়ার সুযোগ। বেকার তরুণ কিংবা প্রবাসীর কাছে এমন প্রস্তাব যে আকর্ষণ তৈরি করবে, সেটিই স্বাভাবিক।
কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ভিসা ব্যবস্থার বাস্তবতা ভিন্ন। সাবক্লাস ৪৮২ ভিসা কোনো সাধারণ ‘ওয়ার্ক পারমিট’ নয়। এটি নির্দিষ্ট দক্ষতা, অনুমোদিত স্পনসর, মনোনীত পেশা, অভিজ্ঞতা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েক মিনিটের ভিডিও দেখে পাঁচ লাখ টাকা তুলে দেওয়া মানে শুধু অর্থের ঝুঁকি নয়, নিজের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যক্তিগত তথ্যও অচেনা ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া। ভিসা পাওয়ার শেষ কথা, কোনো ফেসবুক পেজ, ইউটিউব ভিডিও কিংবা টিকটক নয়। সিদ্ধান্ত দেয় সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তাই টাকা দেওয়ার আগে আবেদনকারীর উচিত নিয়োগকর্তা, স্পনসরশিপ, মনোনয়ন, চাকরির চুক্তি, বেতন, ভিসার ধরন এবং সরকারি আবেদনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা।
কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও কয়েক মিনিটেই অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে লাগে বৈধ যোগ্যতা ও সরকারি অনুমোদন। পাঁচ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি নয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















