ঢাকা ০৩:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রাশেদ-রেজাউল-শাহজাহান সিণ্ডিকেটে চলছে আরপিসিএলে লুটপাট চারদিনের মাথায় ঢাকায় বদলি গণপূর্তের দুই প্রকৌশলী রায়হান-আনিসুজ্জামান রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি হওয়ার দৌড়ে গোলাম মরতুজা গণপূর্ত প্রকৌশলী আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে কোটি টাকার ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ডেমরা সাব রেজিস্ট্রার রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ ডিএসসিসির ট্রেড সেন্টারের ছাদে ৩ হাজারের বেশি অবৈধ দোকান, নিয়ন্ত্রণে মজু সিন্ডিকেট নজরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস বিল্ডার্সকে কাজ দিয়ে বিপাকে গণপূর্ত ১০৪ বছর বয়সে কারাগারে নুর, ২৬ বছর আগে পেয়েছিলেন মৃত্যুদণ্ড পলিথিন-প্লাস্টিক বন্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
অনার্সে তৃতীয় শ্রেণি

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি হওয়ার দৌড়ে গোলাম মরতুজা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. গোলাম মরতুজার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএ সম্মান (অনার্স) পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি পেয়েছিলেন তিনি। এ তথ্য সামনে আসার পর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেননা সরকারের বিদ্যমান নীতিমালায় বলা আছে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে এমডি পদে নিয়োগের অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তার পরও তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগের আলোচনায় রয়েছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, চাকরিতে প্রবেশের পর অর্জিত অতিরিক্ত কোনো ডিগ্রি কি শিক্ষাজীবনের আগের তৃতীয় শ্রেণির রেকর্ডকে অকার্যকর করতে পারে? নাকি এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার শর্ত সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিদ্যমান এমডি নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালায় বলা হয়েছে, শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে কোনো কর্মকর্তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন না। গত ১৮ জানুয়ারি জারি করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি ও সিইও নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না।

গ্রেডিং পদ্ধতির ফলের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমান এবং এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় জিপিএ ৩-এর কম গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত ডিগ্রির ক্ষেত্রে ৪ পয়েন্ট স্কেলে সিজিপিএ ২ দশমিক ৫০-এর কম এবং ৫ পয়েন্ট স্কেলে ৩-এর কম গ্রহণযোগ্য হবে না। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সমতাকরণও বাধ্যতামূলক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. গোলাম মরতুজা ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ এবং ১৯৮৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে বিএ সম্মান পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন। কর্মজীবনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে পদোন্নতি পান।

কর্মজীবনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বিভিন্ন সময় জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে জনতা ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে ডিএমডি হিসেবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে যোগ দেন। চাকরির নিয়ম অনুযায়ী ২০২৮ সালে তার অবসরে যাওয়ার কথা। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের আলোচনায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর এই প্রেক্ষাপটেই তার শিক্ষাজীবনের পুরোনো ফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

নীতিমালা সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশের সময় যে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে নিয়োগ পান, সেটিই তার চাকরিজীবনের মৌলিক বা মূল একাডেমিক রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা।

চাকরিতে যোগদানের পর কেউ এমবিএ, দ্বিতীয় মাস্টার্স কিংবা বিদেশি কোনো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন। এতে তার জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ে—এ নিয়ে বিতর্ক নেই।

তবে প্রশ্ন হলো, পরে অর্জিত একটি অতিরিক্ত ডিগ্রি কি আগের শিক্ষাগত রেকর্ড পরিবর্তন করতে পারে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশের আগে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি পেয়ে থাকলে পরে অন্য কোনো ডিগ্রিতে ভালো ফল করলেও আগের ফল তার একাডেমিক রেকর্ড থেকে মুছে যায় না।

তাদের প্রশ্ন, নীতিমালায় যখন স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে’ তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকা যাবে না, তখন শিক্ষাজীবনের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? চাকরিতে প্রবেশের সময় পর্যন্ত অর্জিত শিক্ষাগত রেকর্ডকে ভিত্তি ধরা হবে, নাকি চাকরিজীবনের পরে অর্জিত অতিরিক্ত ডিগ্রির মাধ্যমে সেই যোগ্যতা পুনর্নির্ধারণ করা হবে?

এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরও একটি কারণে। পরে অর্জিত অতিরিক্ত ডিগ্রি দিয়ে যদি আগের তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণির ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকে, তাহলে একই ধরনের শিক্ষাগত রেকর্ড থাকা অন্য কর্মকর্তারাও এমডি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একই সুবিধা দাবি করতে পারেন।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি রয়েছে। তাদের কেউ কেউ পরে উচ্চতর ডিগ্রিও অর্জন করেছেন।

ফলে একজনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিগ্রিকে যদি ‘যোগ্যতার ঘাটতি পূরণের’ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের আবেদন অন্যদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি কী হবে—সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ব্যক্তি বিবেচনায় নীতিমালার ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হলে যোগ্যতার প্রতিযোগিতা অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

‘নীতিমালা না মানলে অন্য ব্যাংকেও দৃষ্টান্ত তৈরি হবে’ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ বলেন, বিগত ১৫ থেকে ১৭ বছরের নানা অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এখন ব্যাংক খাতে সার্বিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘একটি ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করা না হলে সেটি অন্য ব্যাংকগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল তদারকির কারণে নানা ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নীতিমালা অনুসরণ না করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি পদে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করেও অনেককে বছরের পর বছর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হয়। তাদের ভাষ্য, শিক্ষাজীবনে কোনো তৃতীয় বিভাগ না থাকা, নির্দিষ্ট সময় ডিএমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ অন্যান্য শর্ত পূরণের পরও এমডি পদে নিয়োগ নিশ্চিত নয়।

‘যোগ্যতা থাকলে সুযোগ পাওয়া উচিত, তবে বিধিমালা মানতে হবে’ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একজন ব্যক্তি যদি যোগ্য হন, তাহলে তার যোগ্যতা অনুযায়ী পদে বসার সুযোগ পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাজীবনের কোনো একটি পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি থাকলেই সেটি একজনের পুরো পেশাগত যোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। তবে যেহেতু সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে, সেক্ষেত্রে সেই বিধিমালার বাইরে গিয়ে কেন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেটি বোধগম্য নয়। প্রয়োজন হলে সরকারের বিধিমালায় পরিমার্জন আনা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বিধিমালা থাকার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন উঠলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সেটি সরকারকে সংকটে ফেলতে পারে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, তারা ওই নীতিমালার আলোকে এমডিদের নিয়োগ দেবেন। এমডি নিয়োগের বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগই চূড়ান্ত করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো মন্তব্য নেই।’

অভিযোগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মো. গোলাম মরতুজার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলে তিনি তা দেখেছেন বলে জানা গেলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

অনার্সে তৃতীয় শ্রেণি

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি হওয়ার দৌড়ে গোলাম মরতুজা

আপডেট সময় ০৩:১৫:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. গোলাম মরতুজার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএ সম্মান (অনার্স) পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি পেয়েছিলেন তিনি। এ তথ্য সামনে আসার পর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেননা সরকারের বিদ্যমান নীতিমালায় বলা আছে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে এমডি পদে নিয়োগের অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তার পরও তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগের আলোচনায় রয়েছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, চাকরিতে প্রবেশের পর অর্জিত অতিরিক্ত কোনো ডিগ্রি কি শিক্ষাজীবনের আগের তৃতীয় শ্রেণির রেকর্ডকে অকার্যকর করতে পারে? নাকি এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার শর্ত সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বিদ্যমান এমডি নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালায় বলা হয়েছে, শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকলে কোনো কর্মকর্তা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন না। গত ১৮ জানুয়ারি জারি করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি ও সিইও নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে না।

গ্রেডিং পদ্ধতির ফলের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমান এবং এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় জিপিএ ৩-এর কম গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত ডিগ্রির ক্ষেত্রে ৪ পয়েন্ট স্কেলে সিজিপিএ ২ দশমিক ৫০-এর কম এবং ৫ পয়েন্ট স্কেলে ৩-এর কম গ্রহণযোগ্য হবে না। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও সমতাকরণও বাধ্যতামূলক।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. গোলাম মরতুজা ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ এবং ১৯৮৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে বিএ সম্মান পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন। কর্মজীবনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে পদোন্নতি পান।

কর্মজীবনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বিভিন্ন সময় জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে জনতা ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে ডিএমডি হিসেবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে যোগ দেন। চাকরির নিয়ম অনুযায়ী ২০২৮ সালে তার অবসরে যাওয়ার কথা। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের আলোচনায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর এই প্রেক্ষাপটেই তার শিক্ষাজীবনের পুরোনো ফল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

নীতিমালা সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশের সময় যে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে নিয়োগ পান, সেটিই তার চাকরিজীবনের মৌলিক বা মূল একাডেমিক রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা।

চাকরিতে যোগদানের পর কেউ এমবিএ, দ্বিতীয় মাস্টার্স কিংবা বিদেশি কোনো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন। এতে তার জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়ে—এ নিয়ে বিতর্ক নেই।

তবে প্রশ্ন হলো, পরে অর্জিত একটি অতিরিক্ত ডিগ্রি কি আগের শিক্ষাগত রেকর্ড পরিবর্তন করতে পারে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন কর্মকর্তা চাকরিতে প্রবেশের আগে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি পেয়ে থাকলে পরে অন্য কোনো ডিগ্রিতে ভালো ফল করলেও আগের ফল তার একাডেমিক রেকর্ড থেকে মুছে যায় না।

তাদের প্রশ্ন, নীতিমালায় যখন স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে’ তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি থাকা যাবে না, তখন শিক্ষাজীবনের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? চাকরিতে প্রবেশের সময় পর্যন্ত অর্জিত শিক্ষাগত রেকর্ডকে ভিত্তি ধরা হবে, নাকি চাকরিজীবনের পরে অর্জিত অতিরিক্ত ডিগ্রির মাধ্যমে সেই যোগ্যতা পুনর্নির্ধারণ করা হবে?

এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরও একটি কারণে। পরে অর্জিত অতিরিক্ত ডিগ্রি দিয়ে যদি আগের তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণির ঘাটতি পূরণের সুযোগ থাকে, তাহলে একই ধরনের শিক্ষাগত রেকর্ড থাকা অন্য কর্মকর্তারাও এমডি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একই সুবিধা দাবি করতে পারেন।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি রয়েছে। তাদের কেউ কেউ পরে উচ্চতর ডিগ্রিও অর্জন করেছেন।

ফলে একজনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিগ্রিকে যদি ‘যোগ্যতার ঘাটতি পূরণের’ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের আবেদন অন্যদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি কী হবে—সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ব্যক্তি বিবেচনায় নীতিমালার ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হলে যোগ্যতার প্রতিযোগিতা অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

‘নীতিমালা না মানলে অন্য ব্যাংকেও দৃষ্টান্ত তৈরি হবে’ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ বলেন, বিগত ১৫ থেকে ১৭ বছরের নানা অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এখন ব্যাংক খাতে সার্বিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘একটি ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করা না হলে সেটি অন্য ব্যাংকগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল তদারকির কারণে নানা ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নীতিমালা অনুসরণ না করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডি পদে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, নীতিমালার সব শর্ত পূরণ করেও অনেককে বছরের পর বছর প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হয়। তাদের ভাষ্য, শিক্ষাজীবনে কোনো তৃতীয় বিভাগ না থাকা, নির্দিষ্ট সময় ডিএমডি হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ অন্যান্য শর্ত পূরণের পরও এমডি পদে নিয়োগ নিশ্চিত নয়।

‘যোগ্যতা থাকলে সুযোগ পাওয়া উচিত, তবে বিধিমালা মানতে হবে’ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একজন ব্যক্তি যদি যোগ্য হন, তাহলে তার যোগ্যতা অনুযায়ী পদে বসার সুযোগ পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাজীবনের কোনো একটি পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণি থাকলেই সেটি একজনের পুরো পেশাগত যোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। তবে যেহেতু সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে, সেক্ষেত্রে সেই বিধিমালার বাইরে গিয়ে কেন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেটি বোধগম্য নয়। প্রয়োজন হলে সরকারের বিধিমালায় পরিমার্জন আনা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বিধিমালা থাকার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন উঠলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সেটি সরকারকে সংকটে ফেলতে পারে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, তারা ওই নীতিমালার আলোকে এমডিদের নিয়োগ দেবেন। এমডি নিয়োগের বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগই চূড়ান্ত করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো মন্তব্য নেই।’

অভিযোগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মো. গোলাম মরতুজার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলে তিনি তা দেখেছেন বলে জানা গেলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।