বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড—আরপিসিএলকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ঠিকাদারকে কথিত অবৈধ সুবিধা, সরকারি অর্থের ক্ষতি, একাধিক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব, ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং একটি প্রভাবশালী কর্মকর্তাচক্রের হাতে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ, নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) মো. রেজাউল কবীর এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. শাহজাহান ফকিরের নাম। আরপিসিএলের সরকারি ওয়েবসাইটেও বর্তমানে এএইচএম রাশেদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রেজাউল কবীরকে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) এবং শাহজাহান ফকিরকে নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে শাহজাহান ফকিরকে মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) হিসেবেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগের শুরুটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্নকে ঘিরে—এএইচএম রাশেদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ। সংশ্লিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এমডি নিয়োগ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করা সত্ত্বেও এএইচএম রাশেদকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাশেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রেজাউল কবীর, শাহজাহান ফকির এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তৎকালীন সদস্য (অর্থ) নাজমুস সায়াদাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এমনকি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফাওজুল কবীরকে প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় পাওয়া গেছে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের পরবর্তী স্তরে উঠে আসে ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন ৩৬০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির কথিতভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেন এবং এর বিনিময়ে ঠিকাদারকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—প্রকল্পের ২৪০ এমভিএ, ১৩২ কেভি স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমারটি নষ্ট অবস্থায় সরবরাহ করা হলেও আরপিসিএল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেটি মেরামত করে পুনরায় সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আরইবি সদস্য (অর্থ) নাজমুস সায়াদাতের অনুমোদনে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির এতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চক্র অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেয়।
এই একই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি প্রশ্ন হলো—প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্বের দায় কার। অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহ ৩৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পের কাজ প্রায় দুই বছর বিলম্বিত হয়েছে। অথচ প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীরকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী এবং মাত্র দুই মাসের মধ্যে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) করা হয়। অন্যদিকে একই সময়ে প্রকল্পটির বিলম্বের কারণে আরপিসিএল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাশেদ-রেজাউল সম্পর্কের আরেকটি দিক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এএইচএম রাশেদ এমডি হওয়ার পর মাত্র দুই মাসের মধ্যে রেজাউল কবীরকে প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে দুই কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আরও জোরালো হয়। আরপিসিএলের সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমানে রেজাউল কবীরকে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
অন্যদিকে শাহজাহান ফকিরকে ঘিরে অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদে নিয়োগের জন্য আরপিসিএল বোর্ডের সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সার্কুলার দেওয়া হয়নি এবং শাহজাহান ফকিরকে অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখা হয়েছে। কারণ হিসেবে তার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শাহজাহান ফকিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে দুদক চেয়ারম্যান ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল বলে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছে। সেই আবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি ২০২৪ সালের অক্টোবরে নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরও প্রায় এক বছর একই পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট পদে এমবিএ/অ্যাকাউন্টিং/ফাইন্যান্সে মাস্টার্স ডিগ্রির প্রয়োজন থাকলেও তিনি তখন সান্ধ্যকালীন এমবিএ কোর্সে অধ্যয়নরত ছিলেন।
দুদকে করা ওই অভিযোগে আরও বলা হয়েছিল, শাহজাহান ফকিরের এমবিএ শেষ হওয়ার পর তাকে নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে। একই অভিযোগে দাবি করা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও শুধু এমডি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছিলেন, নিয়োগসংক্রান্ত নথি প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হলে এইচআর বিভাগের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এসবই অভিযোগ; এর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্তের ফল প্রয়োজন।
শাহজাহান ফকিরকে ঘিরে অভিযোগ শুধু আরপিসিএলের অভ্যন্তরীণ পদায়নেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি আরপিসিএলের পাশাপাশি আরএনপিএল এবং বিপিইএমসিতেও একাধিক দায়িত্ব পালন করেছেন। চীনা প্রতিষ্ঠান শেনজেন স্টারের সঙ্গে আরপিসিএলের যৌথ উদ্যোগে গঠিত বিপিইএমসির সিএফও হিসেবেও তাকে অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখার অভিযোগ রয়েছে। একই অভিযোগে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ লাখ স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ডিপিএম পদ্ধতিতে কেনার উদ্যোগে অনিয়ম এবং এজেন্সি কমিশন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—একজন কর্মকর্তার হাতে কেন একাধিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছিল। আরপিসিএলের সরকারি ওয়েবসাইটে শাহজাহান ফকিরকে একই সঙ্গে মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), অতিরিক্ত দায়িত্বে দেখানো হয়েছে। ফলে অভিযোগের বাইরে একটি যাচাইযোগ্য বিষয় হলো—তার অতিরিক্ত দায়িত্বের মেয়াদ, নিয়োগের যোগ্যতা, বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের নথি।
আরপিসিএল-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ আরএনপিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়লা সরবরাহের জন্য ‘পিটি সাম্পার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে একক দরপত্রের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত এমডি নাজমুস সায়াদাত এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন এবং পরে নিম্নমানের কয়লা সরবরাহের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয়। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, রাশেদ, শাহজাহান ফকির ও নাজমুস সায়াদাত প্রতি টন কয়লার বিপরীতে কথিত অবৈধ সুবিধা নিয়ে নিম্নমানের কয়লা গ্রহণে আরএনপিএলকে বাধ্য করেন। প্রায় ছয় লাখ টন কয়লা সরবরাহের পর বর্তমানে সরবরাহ স্থগিত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্রুততার সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা এবং মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে নাজমুস সায়াদাতকে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এখানে তদন্তের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি, দরদাতার সংখ্যা, মূল্যায়ন কমিটির গঠন, বোর্ডের অনুমোদন, চুক্তির মূল্য, কয়লার মান নির্ধারণের স্পেসিফিকেশন, ল্যাবরেটরি টেস্ট, সরবরাহের পরিমাণ এবং নিম্নমানের কয়লা গ্রহণের সিদ্ধান্তের নথি পর্যালোচনা করা। কারণ কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি প্রমাণিত হয় না; কিন্তু একই সঙ্গে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহের অভিযোগ সত্য হলে তার আর্থিক ও উৎপাদনগত প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটির গ্যাস টারবাইন-৪ নষ্ট হয়ে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ১৪ মাস বন্ধ ছিল এবং এতে আরপিসিএলের প্রায় ১১০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় এএইচএম রাশেদ কেন্দ্রটির প্লান্ট ইনচার্জ ছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট বন্ধ থাকার কারণ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, মেরামতের উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কী ছিল। ১১০ কোটি টাকার ক্ষতির দাবিটি অবশ্য সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি, উৎপাদন-ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ বিক্রয়/রাজস্ব হিসাব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
আরপিসিএলের উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দুটি পদ দীর্ঘদিন শূন্য রেখে পছন্দের ও অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ধস নেমেছে। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট, গাজীপুরের ১০৫ মেগাওয়াট ও ৫২ মেগাওয়াট এবং রাউজানের ২৬ মেগাওয়াট কেন্দ্র—এই চারটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কেন কম উৎপাদন হচ্ছে, তা তদন্তের দাবি উঠেছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি কেন্দ্রের ইনস্টলড ক্যাপাসিটি, উপলব্ধতা, forced outage, maintenance outage, fuel availability এবং actual generation data পাশাপাশি রাখলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও অভিযোগের কমতি নেই। সম্প্রতি আরপিসিএলের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং অর্থের বিনিময়ে পছন্দের প্রার্থীদের পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলীর তিনটি শূন্য পদের বিপরীতে ১:৩ অনুপাতে নয়জনকে পরীক্ষায় ডাকা হয় এবং প্রশ্ন আগে থেকে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে সিনিয়রিটি ভেঙে অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একইভাবে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর ছয়টি পদের বিপরীতে ১:৩ অনুপাত অনুসরণ না করে ২৬ জনকে পরীক্ষায় ডাকার অভিযোগ রয়েছে। সেখানেও প্রশ্নফাঁস, অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি এবং সিনিয়র প্রকৌশলীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ করা হয়েছে।
এই নিয়োগ কমিটিগুলোর গঠন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী পরিচালক (পিএন্ডডি) নাঈমকে বাদ দিয়ে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) রেজাউল কবীরকে এসব কমিটিতে রাখা হয়। অভিযোগকারীরা এর কারণ হিসেবে রেজাউল কবীরের সঙ্গে এমডি রাশেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সামনে আনছেন। আরপিসিএলের সরকারি ওয়েবসাইটে কে এম নঈম খানকে নির্বাহী পরিচালক (পিএন্ডডি) এবং রেজাউল কবীরকে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগের আরও একটি অংশ রাশেদ ও রেজাউল কবীরের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তারা দুজনই ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা এবং সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই সম্পর্ককে ব্যবহার করে তারা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগকে দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; এর সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত বা আর্থিক লেনদেনের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র থাকলে তবেই তা অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন ৩৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি মাদারগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিলম্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পের কাজ প্রায় দুই বছর পিছিয়ে গেছে এবং এতে আরপিসিএল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাদারগঞ্জ সৌর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ফেরদৌসকে শাস্তির মুখোমুখি করা হলেও ৩৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীরকে শাস্তি না দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রকল্প বিলম্বে কেন দুই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়।
প্রতিষ্ঠানের যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আরপিসিএল চারটি নতুন পাজেরো জিপ কিনেছে এবং সেগুলো ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) শাহজাহান ফকির ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত কাজেও গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ যাচাই করতে ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বোর্ড অনুমোদন, গাড়ির সংখ্যা, বরাদ্দের আদেশ, লগবুক এবং জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব পরীক্ষা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
শাহজাহান ফকিরকে বিপিইএমসির সিএফও হিসেবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি সেখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন, যদিও প্রতিষ্ঠানটিতে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম নেই। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ‘শেনজেন স্টার’-এর সঙ্গে যৌথ কার্যক্রমের কারণে তিনি এই দায়িত্ব ছাড়তে আগ্রহী নন। একই সঙ্গে আরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়াউল আজীম এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সবুর হোসেনকে বিদেশ সফরে নিয়ে গিয়ে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
সব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো—আরপিসিএলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কি ধীরে ধীরে একটি ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে? অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাশেদ এমডি হওয়ার পর রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির তার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছেন। এমনকি আরপিসিএল, আরএনপিএল এবং বিপিইএমসির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কারিগরি বিষয়েও শাহজাহান ফকির ও নাজমুস সায়াদাতের সঙ্গে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। রাশেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
শাহজাহান ফকিরকে ঘিরে অভিযোগের একটি অংশ ইতোমধ্যে প্রকাশ্য নথির পর্যায়ে এসেছে। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে দুদকে আবেদন করা হয়েছিল বলে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছে। ওই আবেদনে অতিরিক্ত দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্ব, বিপিইএমসির দায়িত্ব, স্মার্ট মিটার ক্রয়, একাধিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব এবং মাদারগঞ্জ সৌর প্রকল্পসহ বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করা হয়। তবে অভিযোগ দাখিল হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; দুদকের তদন্ত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত গুরুত্ব বহন করবে।
এদিকে আরপিসিএলের নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইটে এএইচএম রাশেদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিচালক হিসেবেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই ওয়েবসাইটে রেজাউল কবীরের নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) এবং শাহজাহান ফকিরের নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও হিসাব), অতিরিক্ত দায়িত্বের পদ নিশ্চিত করা যায়।
সব মিলিয়ে রাশেদ-রেজাউল-শাহজাহানকে ঘিরে যে অভিযোগের চিত্র সামনে এসেছে, সেটি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগ নয়; বরং নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা, কয়লা ক্রয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহন ব্যবহার, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে। তবে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো অভিযোগ ও প্রমাণকে আলাদা রাখা।
তাই আরপিসিএল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে অন্তত আট ধরনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন—এমডি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষার ফল, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, রেজাউল কবীরের পদোন্নতির নথি, শাহজাহান ফকিরের অতিরিক্ত দায়িত্বের আদেশ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি, ময়মনসিংহ ৩৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পের হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে চুক্তি ও ট্রান্সফরমার-সংক্রান্ত নথি, আরএনপিএলের কয়লা ক্রয় ও পিটি সাম্পারের চুক্তি, প্রকৌশলী পদোন্নতির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন নথি এবং ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন-৪-এর ১৪ মাসের outage ও আর্থিক ক্ষতির হিসাব। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেওয়া দরকার।
সংবাদ শিরোনাম ::
রাশেদ-রেজাউল-শাহজাহান সিণ্ডিকেটে চলছে আরপিসিএলে লুটপাট
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৩:৫১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ৫০৮ বার পড়া হয়েছে
জনপ্রিয় সংবাদ



















