কক্সবাজার-মহেশখালী নৌপথ দ্বীপবাসীর যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। প্রায় চার লাখ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ঘাটে টোল আদায় নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম-অভিযোগ যেন পিছু ছাড়ছে না। এবার সরকারি গেজেট প্রকাশের পরও দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ৫ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা করে টোল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ঘাট ইজারাদারের বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় যাত্রীদের জন্য এক হার এবং দেশীয় পর্যটকদের জন্য অস্বাভাবিক হারে টোল আদায় করা হচ্ছে। বিষয়টি শুধু অযৌক্তিক নয়, বৈষম্যমূলকও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে মহেশখালীর দুই ঘাটে ৫ টাকা করে টোল আদায় করা হলেও হঠাৎ দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে টোল আদায় শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে দ্বীপবাসী বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি।
এর মধ্যেই সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি গেজেটে পর্যটনবাহী নৌযানের পর্যটক ছাড়া অন্যান্য পর্যটকের কাছ থেকে ৫ টাকার বেশি টোল আদায় না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। গেজেট প্রকাশের পর মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্যও নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ নির্দেশনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নির্ধারিত হারের বাইরে টোল আদায় করা হলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশনা প্রকাশের পরও কক্সবাজার ঘাটে দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে টোল আদায় অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি গেজেট, প্রশাসনের নির্দেশনা এবং জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্য অবস্থানের পরও ঘাটে এই বাড়তি টোল আদায়ের নেপথ্যে কার প্রভাব কাজ করছে?
মহেশখালী কোনো গেজেটভুক্ত পর্যটনকেন্দ্র নয়,এমন দাবি করে স্থানীয়রা বলেন, মানুষ এখানে আসে পাহাড়, প্রকৃতি ও দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং কিছুটা সময় কাটাতে। পর্যটনকেন্দ্রের নামে তাদের ওপর অতিরিক্ত টোলের বোঝা চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘুরতে আসা কয়েকজন পর্যটক বলেন, মহেশখালী আসার সময় কক্সবাজার ঘাটে আমাদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে টোল নেওয়া হয়েছে। পরে মহেশখালী এসে জানতে পারি, সরকারি গেজেট অনুযায়ী পর্যটকদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে টোল নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সরকারি নিয়মের বাইরে ৫০ টাকা করে নেওয়া আমাদের সঙ্গে বৈষম্য করার শামিল।
স্থানীয় বাসিন্দারাও একই অভিযোগ তুলে বলেন, পর্যটকরাও আমাদের মতোই দেশের নাগরিক। আমরা যদি ৫ টাকা দিয়ে পার হতে পারি, তাহলে তারা কেন ৫০ টাকা দেবে? এ ধরনের বৈষম্যমূলক টোল কোনোভাবেই মানানসই নয়। আমরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সবার কাছ থেকে ৫ টাকা টোল আদায়ের দাবি জানাই।
তাদের আরও অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকেও টোল নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার প্রশ্ন, ইজারাদাররা যদি এমপির নির্দেশনাই না মানে, তাহলে তারা কি জনপ্রতিনিধির চেয়েও শক্তিশালী?
তবে বাড়তি টোল আদায়ের বিষয়ে ঘাটের ইজারাদার মিন্টু বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিএকে প্রায় ২ কোটি টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা নিয়েছি। বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। কোন খাতে কত টাকা টোল আদায় করতে হবে, চুক্তিতে তা উল্লেখ করা আছে। আমরা সেই নিয়ম অনুযায়ী টোল নিচ্ছি। সরকার গেজেট প্রকাশ করলেও বিআইডব্লিউটিএ এখনো আমাদের কোনো সংশোধিত নির্দেশনা বা দরখাস্ত দেয়নি। তাই আগের নিয়মেই টোল আদায় করা হচ্ছে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সরকারি নির্দেশনার বাইরে টোল আদায়ের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও ইজারাদারের সঙ্গে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি গেজেট জারির পরও যদি মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে তা প্রশাসনিক নির্দেশনার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে স্থানীয় যাত্রীদের তুলনায় দশগুণ টোল আদায়ের অভিযোগ কোনোভাবেই জনবান্ধব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাদের দাবি, ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা ইজারা চুক্তির অজুহাতে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ইজারা চুক্তি ও সরকারি গেজেটের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
দ্বীপবাসী ও পর্যটকদের প্রত্যাশা—কক্সবাজার-মহেশখালী নৌপথের ঘাটে দীর্ঘদিনের টোল-নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও জনবান্ধব ঘাট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।
আবু হেনা মোঃ আসিফ, মহেশখালী, কক্সবাজার 























