ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঘুষ-নোটিশ বাণিজ্যে রাজউক পরিচালক হামিদুলের ‘অবৈধ বিপুল সম্পদের পাহাড়’ বৈশাখীকে বাদ দিয়ে টেন্ডার ছাড়াই মেট্রোরেলে নতুন চুক্তি! জাল দলিলে খাস জমি খারিজের নামে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ইসহাক আলী আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকে অনিয়মের অভিযোগ অতীতে আটকে গেলে তো উন্নয়ন হবে না : ভারতীয় হাইকমিশনার দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি : প্রধানমন্ত্রী দুই দিনের সফরে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি নেপাল-তিব্বতে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০০০ মুকসুদপুরে সরকারি খাসজমি ও জলাশয় দখলের অভিযোগ বোরহানউদ্দিনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত, হাফিজ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র‍্যালি

জাল দলিলে খাস জমি খারিজের নামে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ইসহাক আলী

জাল দলিলে সরকারি খাস ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত গেজেটভুক্ত জমি নামজারি (খারিজ) করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রবীণ গৃহস্থের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌর এলাকার হুজরাপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ লোকমান আলীর ছেলে মোঃ ইসহাক আলী (সাহেব)-এর বিরুদ্ধে।

বর্তমানে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ কোর্ট এলাকায় আদালত ভবনের একটি গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, একাধিক দফায় তিন লাখ টাকা নিলেও কাজ না করে উল্টো তাকে ভয়ভীতি ও পুলিশি হুমকির মুখে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, যার বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, সেই মধ্যস্থতাকারী মোঃ ইসহাক আলী (সাহেব) টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও জমির দলিল জাল ও সরকারি

স্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় খারিজ সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছেন।
এই ঘটনায় সদর উপজেলা ভূমি প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী বৃদ্ধ মফিজুল ইসলামের শারীরিক অসুস্থতা ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র জমি নামজারির নামে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

ভুক্তভোগী মফিজুল ইসলাম প্রতিবেদকের গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত বক্তব্যের একপর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি নিজের নামটাও পর্যন্ত ভালো করে সই করতে জানি না।

ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ায় হাঁটাচলা ও চোখে দেখা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই সুযোগে ইসহাক (সাহেব) নামের এক ব্যক্তি জমি খারিজ করে দেওয়ার কথা বলে তিনবারে মোট তিন লাখ টাকা নিয়েছে। ডিমের দোকানদারসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনেও টাকা লেনদেন হয়েছে। এখন বলছে, জমি নাকি জমিদারের, খারিজ হবে না। টাকা ফেরত চাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আমাকে পুলিশের ভয় দেখানো হচ্ছে। আমি এই বয়সে কোথায় দৌড়াব?
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী ইসহাক (সাহেব) প্রতিবেদকের গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত বক্তব্যের একপর্যায়ে টাকা লেনদেনের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চাচাকে (মফিজুল ইসলাম) সরল বিশ্বাসেই সহায়তা করতে চেয়েছিলাম। একটি খতিয়ানের (৫০ নম্বর খতিয়ান) এক একর পাঁচ শতক জমির খারিজ ইতিমধ্যে করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে এক একর ২০ শতক জমির যে দলিল তিনি দিয়েছেন, কানুনগো স্যারের যাচাই-বাছাইয়ে সেটি জাল এবং ‘খ’ তফসিলভুক্ত (ভেস্টেড) সম্পত্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জাল দলিল দিয়ে কাজ করানো তো সম্ভব নয়। তবে টাকা যে নিয়েছি, তা অস্বীকার করছি না। তাছাড়া টাকার ভাগ তো সবাই নিয়েছে, কিন্তু কেউ কি এখন তা স্বীকার করবে?

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঝিলিম ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোঃ মাসুদ রানা জানান, মফিজুল নামের আবেদনকারী দুটি নামজারির আবেদন করেছিলেন। সরেজমিন ও নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, একটি খতিয়ানের জমি সঠিক থাকায় প্রস্তাব দাখিল করা হয়। কিন্তু অপরটি ‘খ’ তফসিল গেজেটভুক্ত সরকারি জমি। আইন অনুযায়ী, গেজেট অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তা খারিজের সুযোগ নেই। ইসহাক নামে এক যুবক মফিজুলের হয়ে অফিসে সুপারিশ করতে আসলেও মফিজুল ইসলাম কখনো সরাসরি অফিসে যোগাযোগ করেননি।

বিষয়টি নিয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইকরামুল হক নাহিদ জানান, নামজারি প্রক্রিয়ায় তিন স্তরে যাচাই-বাছাই হয়-ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়, কানুনগো এবং সর্বশেষ এসিল্যান্ডের শুনানি। আলোচ্য ক্ষেত্রে কানুনগো পর্যায়েই সরকারি স্বার্থ জড়িত থাকা এবং দলিলের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ফলে খারিজের প্রস্তাব বাতিল হয়।

নামজারির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ১ হাজার ১৭০ টাকা। এর বাইরে কোনো অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আমাদের অফিসে বা বাইরে কেউ বাড়তি টাকা নিলে কিংবা প্রতারণা করলে ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তাৎক্ষণিক তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব। আর যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য জাল দলিল তৈরি করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হবে।

সরকারি জমি খাস রাখা এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে রুট লেভেলে প্রশাসনিক নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘুষ-নোটিশ বাণিজ্যে রাজউক পরিচালক হামিদুলের ‘অবৈধ বিপুল সম্পদের পাহাড়’

জাল দলিলে খাস জমি খারিজের নামে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ইসহাক আলী

আপডেট সময় ০২:৫৫:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাল দলিলে সরকারি খাস ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত গেজেটভুক্ত জমি নামজারি (খারিজ) করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রবীণ গৃহস্থের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌর এলাকার হুজরাপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ লোকমান আলীর ছেলে মোঃ ইসহাক আলী (সাহেব)-এর বিরুদ্ধে।

বর্তমানে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ কোর্ট এলাকায় আদালত ভবনের একটি গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, একাধিক দফায় তিন লাখ টাকা নিলেও কাজ না করে উল্টো তাকে ভয়ভীতি ও পুলিশি হুমকির মুখে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, যার বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, সেই মধ্যস্থতাকারী মোঃ ইসহাক আলী (সাহেব) টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও জমির দলিল জাল ও সরকারি

স্বার্থসংশ্লিষ্ট হওয়ায় খারিজ সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছেন।
এই ঘটনায় সদর উপজেলা ভূমি প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী বৃদ্ধ মফিজুল ইসলামের শারীরিক অসুস্থতা ও অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র জমি নামজারির নামে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

ভুক্তভোগী মফিজুল ইসলাম প্রতিবেদকের গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত বক্তব্যের একপর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি নিজের নামটাও পর্যন্ত ভালো করে সই করতে জানি না।

ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ায় হাঁটাচলা ও চোখে দেখা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই সুযোগে ইসহাক (সাহেব) নামের এক ব্যক্তি জমি খারিজ করে দেওয়ার কথা বলে তিনবারে মোট তিন লাখ টাকা নিয়েছে। ডিমের দোকানদারসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনেও টাকা লেনদেন হয়েছে। এখন বলছে, জমি নাকি জমিদারের, খারিজ হবে না। টাকা ফেরত চাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো আমাকে পুলিশের ভয় দেখানো হচ্ছে। আমি এই বয়সে কোথায় দৌড়াব?
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী ইসহাক (সাহেব) প্রতিবেদকের গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত বক্তব্যের একপর্যায়ে টাকা লেনদেনের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চাচাকে (মফিজুল ইসলাম) সরল বিশ্বাসেই সহায়তা করতে চেয়েছিলাম। একটি খতিয়ানের (৫০ নম্বর খতিয়ান) এক একর পাঁচ শতক জমির খারিজ ইতিমধ্যে করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে এক একর ২০ শতক জমির যে দলিল তিনি দিয়েছেন, কানুনগো স্যারের যাচাই-বাছাইয়ে সেটি জাল এবং ‘খ’ তফসিলভুক্ত (ভেস্টেড) সম্পত্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জাল দলিল দিয়ে কাজ করানো তো সম্ভব নয়। তবে টাকা যে নিয়েছি, তা অস্বীকার করছি না। তাছাড়া টাকার ভাগ তো সবাই নিয়েছে, কিন্তু কেউ কি এখন তা স্বীকার করবে?

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঝিলিম ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোঃ মাসুদ রানা জানান, মফিজুল নামের আবেদনকারী দুটি নামজারির আবেদন করেছিলেন। সরেজমিন ও নথিপত্র যাচাই করে দেখা যায়, একটি খতিয়ানের জমি সঠিক থাকায় প্রস্তাব দাখিল করা হয়। কিন্তু অপরটি ‘খ’ তফসিল গেজেটভুক্ত সরকারি জমি। আইন অনুযায়ী, গেজেট অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তা খারিজের সুযোগ নেই। ইসহাক নামে এক যুবক মফিজুলের হয়ে অফিসে সুপারিশ করতে আসলেও মফিজুল ইসলাম কখনো সরাসরি অফিসে যোগাযোগ করেননি।

বিষয়টি নিয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইকরামুল হক নাহিদ জানান, নামজারি প্রক্রিয়ায় তিন স্তরে যাচাই-বাছাই হয়-ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়, কানুনগো এবং সর্বশেষ এসিল্যান্ডের শুনানি। আলোচ্য ক্ষেত্রে কানুনগো পর্যায়েই সরকারি স্বার্থ জড়িত থাকা এবং দলিলের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ফলে খারিজের প্রস্তাব বাতিল হয়।

নামজারির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ১ হাজার ১৭০ টাকা। এর বাইরে কোনো অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আমাদের অফিসে বা বাইরে কেউ বাড়তি টাকা নিলে কিংবা প্রতারণা করলে ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তাৎক্ষণিক তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব। আর যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য জাল দলিল তৈরি করে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হবে।

সরকারি জমি খাস রাখা এবং সাধারণ মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে রুট লেভেলে প্রশাসনিক নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।