ঢাকা ০৩:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রেলের প্রকৌশলী সামছ তুষারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পপুলার লাইফের গ্রাহকরা দাবির টাকা পাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জ এলজিইডিতে ‘৩% দুলাল’ খ্যাত আহসানুজ্জামানের দুর্নীতি ২২ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে তরিকুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি মো. আলমগীর কবীরকে ঘিরে নৌনিরাপত্তা বিভাগে অনিয়ম পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের দুর্নীতি বোরহানউদ্দিনে সামাজিক অপপ্রচার মোকাবিলা ও মূল্যবোধ বিষয়ে আলোচনা সভা মৌলভীবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানে ৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ তিনজন গ্রেপ্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে জামায়াতের মানববন্ধন, বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের হুশিয়ারী রাশিয়া-ইউক্রেনে ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলা, প্রাণ গেল ২২ জনের

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের দুর্নীতি

দেশের অন্যতম পুরোনো বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানকে ঘিরে একের পর এক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, ঋণ বিতরণ, ব্যাংক পরিচালনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ-সব মিলিয়ে তার ভূমিকা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২১১ কোটি টাকা অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগ তদন্তে দুদক একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে এবং ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। দুদকের কাছে জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়, পূবালী ব্যাংকের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ডলার কেনাবেচার ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, পূবালী ব্যাংকের একটি শাখা নির্ধারিত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে মার্কিন ডলার কিনেছে।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, যেখানে প্রতি ডলারের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১০৯ টাকা থেকে ১১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে, সেখানে ব্যাংকটি ১১৩ টাকা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার কেনে। এর ফলে প্রায় ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে।
এই লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা তহবিল থেকেও প্রায় ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয়ের অভিযোগ করা হয়।
শুধু ডলার কেনায় নয়, আমদানি বিল নিষ্পত্তিতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আমদানিকারকদের কাছ থেকে বাজার নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। এর পরিমাণ প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে না গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, তৃতীয় পক্ষের হিসাবে এ ধরনের অর্থ স্থানান্তর অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করে।
অনুসন্ধানে প্রায় ৫০টি এলসিতে একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হওয়ার বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে।
এদিকে পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুদক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নথিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রিফাত গার্মেন্টস, ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন, করিম গ্রুপ, বন্দর স্টিল, হক গ্রুপ, রানু এগ্রো ও তামিম এগ্রোর মতো প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। কিছু ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে ঘিরে। তিনি দীর্ঘদিন ডেল্টা লাইফের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) তদন্ত করে। সংস্থাটির অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং অডিট কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইডিআরএর করা মামলায় মঞ্জুরুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়ম এবং কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কোম্পানির ডাটাবেজের তথ্য পরিবর্তন বা মুছে ফেলার ঘটনা ঘটে, যা অডিট কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। এ ঘটনায় আইডিআরএ তদন্ত করে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়।
ডেল্টা লাইফের প্রায় ২৫ লাখ গ্রাহকের আমানত নিয়েও অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহকদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষ বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তারা কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নয়।
পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে।
মঞ্জুরুর রহমান ২০২০ সাল থেকে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকায় ব্যাংকের জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে।
২০১৩-১৪ সালে পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং পরিচালনা কাঠামো নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হয়।
পরবর্তীতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ আপত্তি জানিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে দুদক পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে-
* বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম
* ডলার ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ
* ঋণ বিতরণে বিধি লঙ্ঘন
* নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম
* সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করে যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়াও চলছে।
পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে-একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল তদারকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় প্রতিবেদক।
আগামী পর্বে চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও অনিয়মের আরও নতুন তথ্য থাকবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রেলের প্রকৌশলী সামছ তুষারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের দুর্নীতি

আপডেট সময় ০২:৫৯:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

দেশের অন্যতম পুরোনো বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানকে ঘিরে একের পর এক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, ঋণ বিতরণ, ব্যাংক পরিচালনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ-সব মিলিয়ে তার ভূমিকা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২১১ কোটি টাকা অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগ তদন্তে দুদক একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে এবং ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। দুদকের কাছে জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়, পূবালী ব্যাংকের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ডলার কেনাবেচার ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, পূবালী ব্যাংকের একটি শাখা নির্ধারিত বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে মার্কিন ডলার কিনেছে।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, যেখানে প্রতি ডলারের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১০৯ টাকা থেকে ১১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে, সেখানে ব্যাংকটি ১১৩ টাকা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার কেনে। এর ফলে প্রায় ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে।
এই লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা তহবিল থেকেও প্রায় ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয়ের অভিযোগ করা হয়।
শুধু ডলার কেনায় নয়, আমদানি বিল নিষ্পত্তিতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আমদানিকারকদের কাছ থেকে বাজার নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। এর পরিমাণ প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে না গিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, তৃতীয় পক্ষের হিসাবে এ ধরনের অর্থ স্থানান্তর অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করে।
অনুসন্ধানে প্রায় ৫০টি এলসিতে একই ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হওয়ার বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে।
এদিকে পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুদক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নথিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রিফাত গার্মেন্টস, ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন, করিম গ্রুপ, বন্দর স্টিল, হক গ্রুপ, রানু এগ্রো ও তামিম এগ্রোর মতো প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। কিছু ঋণের অর্থ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে ঘিরে। তিনি দীর্ঘদিন ডেল্টা লাইফের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) তদন্ত করে। সংস্থাটির অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং অডিট কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইডিআরএর করা মামলায় মঞ্জুরুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা আর্থিক অনিয়ম এবং কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কোম্পানির ডাটাবেজের তথ্য পরিবর্তন বা মুছে ফেলার ঘটনা ঘটে, যা অডিট কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। এ ঘটনায় আইডিআরএ তদন্ত করে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়।
ডেল্টা লাইফের প্রায় ২৫ লাখ গ্রাহকের আমানত নিয়েও অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহকদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষ বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তারা কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নয়।
পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে।
মঞ্জুরুর রহমান ২০২০ সাল থেকে পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকায় ব্যাংকের জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে।
২০১৩-১৪ সালে পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং পরিচালনা কাঠামো নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হয়।
পরবর্তীতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ আপত্তি জানিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে দুদক পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে-
* বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম
* ডলার ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ
* ঋণ বিতরণে বিধি লঙ্ঘন
* নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম
* সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংকের বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করে যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়াও চলছে।
পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে-একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল তদারকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় প্রতিবেদক।
আগামী পর্বে চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও অনিয়মের আরও নতুন তথ্য থাকবে।