জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে বন্দি সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পল্লীর জীবন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে পল্লীতে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটিতে চেকপোস্ট বসিয়ে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীকে একপ্রকার অবরুদ্ধ করে রেখেছে প্রতিষ্টানটির মালিকপক্ষ।
এই পল্লীতে যেতে দেখাতে হয় জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া ‘বিশেষ টোকেন’। টোকেন না থাকায় পল্লীতে যেতে পারে না কোনরকম আত্বীয়-স্বজন। আর বিষয়টি জানেই না বলছেন সীতাকুন্ড ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
পল্লীর বাসিন্দাদের অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দারাও দেশের নাগরিক। তাদের রাস্তা বন্ধ করার কোনো অধিকার কারও নেই। বিষয়টি আমরা জানতাম না। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে আমরা বিষয়টি শুনি। এর আগে জানতাম না। জানার পর উপজেলা প্রশাসনের লোক পাঠিয়ে ত্রিপুরা পল্লীর রাস্তা বন্ধের সত্যতা পাই। বিষয়টি নিয়ে ত্রিপুরার সরদারদের সঙ্গেও কথা বলি। ত্রিপুরার সরদারদের এ বিষয়ে অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা এখনো কোনো অভিযোগ দেননি।
আদিবাসী ফোরাম সীতাকুণ্ড ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্র ত্রিপুরার ভাষ্য, জিপিএইচ ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষ রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার কোনো জায়গা নেই। স্কুলে যেতে হলেও ঝুঁকি নিতে হয়; কারণ চারপাশেই তাদের স্ক্র্যাপ রাখা হয়েছে। এ কারণে পরিবেশও দূষণ হচ্ছে।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের অংশ সুলতানা মন্দির ত্রিপুরা পল্লী। নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ গ্রামটিতে ৩১টি ত্রিপুরা পরিবারে দুই শতাধিক লোকের বাস। পল্লীতে যাওয়ার রাস্তার গা ঘেঁষে করা হয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানার ১০ তলা ভবন। আর কৌশলে রাস্তার ওপর করা হয়েছে কারখানার সীমানা দেয়াল। এটি ব্যবহার করে রাস্তায় বসানো হয়েছে জিপিএইচ ইস্পাতের চেকপোস্ট।
চেকপোস্টে পাহারায় সবসময় থাকেন ৪ জন নিরাপত্তাকর্মী। ত্রিপুরাপল্লীতে যেতে চাইলে বাধা দেন নিরাপত্তাকর্মীরা। নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, রাস্তায় চলাচলকারী ত্রিপুরা পল্লীর লোকজনকে টোকেন দেওয়া হয়েছে। টোকেন দেখালে পার হতে দেওয়া হয় চেকপোস্ট।
তবে ত্রিপুরা পল্লীর লোকজন বলছেন, তাঁরা টোকেন দেখিয়ে পার হতে পারলেও বাইরে থেকে তাঁদের স্বজনদের আসা-যাওয়ায় ঝামেলা হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা বলছেন, ত্রিপুরা পল্লী যেন অবরুদ্ধ। নিজ দেশে থেকেও যেন পরাধীন। একপর্যায়ে এই প্রতিবেদক চেকপোস্ট পার হতে চাইলে সিকিউরিটি কর্মকর্তা বলেন, অনুমতি দিলে আমার চাকরি থাকবে না।
সুলতানা মন্দির ত্রিপুরা পল্লীর প্রবীণ বাসিন্দা বিকারাম ত্রিপুরা (৬০) বলেন, তাঁদের পল্লীতে ৩১ পরিবারের দু‘শর বেশি মানুষের বসবাস। ২০১৯ সালে জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষ কারখানা সম্প্রসারণের সময় ওই রাস্তা বন্ধ করে। জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষ এমনভাবে চলাচল সীমিত করেছে যে অন্যত্র থাকা আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতেও হাজারো প্রশ্ন ও ভোগান্তিতে পড়েন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, জায়গাগুলো আমরা কিনে নিয়েছি। ত্রিপুরা পল্লীর লোকদেরকে থাকতে দিয়েছি। রাস্তা বন্ধ করা হয়নি, চলাচল সীমিত করা হয়েছে। কারণ এখানে ভারী যন্ত্রপাতি ও লোহা থাকে। সে কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এটা করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















