ম্যানেজ মাষ্টার খ্যাত ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই দুর্নীতির রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অসাধু কর্মকর্তাদের নানা সুযোগ সুবিধা ও উপঢৌকন দিয়ে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে পোষ্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে রং পাল্টিয়ে সেই সরকারেরই আস্থাভাজন হয়েছেন আবুল কালাম আজাদ।
টেন্ডারপ্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই তিনি ব্যাপক দুর্নীতি করেন। ফ্যাসিবাদ সরকারের সময় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের ক্যাশিয়ার খ্যাত আবুল কালাম আজাদ পাহাড় সমান দুর্নীতি ও অনিয়ম করে বর্তমানে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন। সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এপিপির বেশি বরাদ্দ এই ডিভিশনে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি এনসিপি নেতাদের সবচেয়ে বেশি কাজ দেন। বর্তমানে বিএনপি নেতা কর্মিদের কাজ দিয়ে তিনি তাদের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করছেন।
নগর গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের নকশা পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেওয়া, মেরামত বা সংস্কারকাজের নামে ভুয়া বিলভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বেনামে এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা করেন নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঠুনকো কারণে অপছন্দের ঠিকাদারকে অযোগ্য (ননরেসপনসিভ) করা হয় এবং কৌশলে পছন্দের ঠিকাদারকে যোগ্য (রেসপনসিভ) করা হয়। এখন ই-জিপির মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করা হলেও টেন্ডার দাখিলের আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে মূল্য জানিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া পছন্দের ঠিকাদারের যেসব অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে অন্য ঠিকাদার টেন্ডারে অংশ নিতে না পারেন। যখন যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে সেই সব দলের প্রভাবশালী নেতা কর্মিদের বড় বড় কাজ দিয়ে তাদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিজের চেয়ার ঠিক রেখেছেন। বর্তমানে তিনি বোল পাল্টিয়ে নিজেকে বিএনপি পরিবারের সদস্য সাজার চেষ্টা করছেন।
প্রতিটি কাজের চুক্তির সময় ঠিকাদারের কাছ থেকে তিনি ৩ পারসেন্ট এবং বিল পেমেন্টে ৫ পারসেন্ট ঘুষ আদায় করেন। আর ঘুষের টাকা লেনদেন করেন তার ক্যাশিয়ার খ্যাত স্টাফ অফিসার-১ শাওন শাহরিয়ার ও রমনার এসডি মো. মেহবুবুর রহমান। বড় কাজের পারসেন্টেজ বা পিসি রমনার এসডি মেহবুব আদায় করেন।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে এপিপির কাজ ৫০% কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়েছেন। ফ্যাসিবাদ সরকারের অন্যতম দোসর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার আবুল কালাম আজাদ এর মাধ্যমে টাকা কালেকশন করতেন। নগর গণপূর্ত বিভাগের সাধারণ ঠিকাদাররা বলেন, ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। টেন্ডারপ্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই নিবিড় মনিটরিংয়ের প্রয়োজন, কারণ এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির ব্যাপকতা রয়েছে। এমনকি ইজিপি প্রক্রিয়ায়ও ঠিকাদার-কর্মকর্তার যোগসাজশের ঘটনা ঘটছে।
বড় বড় প্রকল্প, বিশেষ করে ৩০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের দায় এড়ানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ছোট প্যাকেজ করে প্রাক্কলন প্রণয়ন, অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ই-জিপি টেন্ডারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও টেন্ডারের শর্তানুসারে নমুনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঠিকাদারের চাপে অথবা একশ্রেণির প্রকৌশলী-কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
প্রকল্পের ছক সংশোধন করে অনাবশ্যকভাবে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করার অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আর্থিক লাভের আশায় ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যয় বাড়ানো হয়। প্রয়োজনমতো জরুরিভাবে কাজ করে না নগর গণপূর্ত বিভাগ।
অনিয়মের আরেকটি বড় ক্ষেত্র বিল দেওয়ার বিষয়ে নগর গণপূর্ত বিভাগে। অনেক সময় কাজ শেষে ঠিকাদার বিল জমা দিলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা নির্বাহী প্রকৌশলী নানা অজুহাত দেখিয়ে বিল আটকে দেন। যেসব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয়, তাদের বিল আগে পরিশোধ করার তথ্যও পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও যেসব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয়, তাদের বিল আংশিক পরিশোধ না করে পুরোপুরিই পরিশোধ করা হয়।
ই-জিপি টেন্ডারপ্রক্রিয়া সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় যাতে কোন দুর্নীতি বা জালিয়াতি না হয়, সে জন্য ক্রয়কারী কার্যালয়ের প্রধানের দপ্তরে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করতে হবে। প্রকল্প নির্বাচনের পর ড্রয়িং, ডিজাইন ও প্রাক্কলন তৈরি করে তা প্রত্যাশী সংস্থা থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অহেতুক অযৌক্তিক সময় বাড়ানোর বিষয়টি নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষর করার পর টেন্ডারমূল্য, মেয়াদকাল ও চুক্তির অন্যান্য শর্ত সুনির্দিষ্ট বিধান ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়। কোনো ঠিকাদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ না করলেও তাদের অগ্রিম বিল দেন তিনি। কাজের গুণগতমান নিবিড় তদারকির জন্য দুই স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কেনাকাটা, নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজে গাফিলতি কিংবা এজেন্ট বা ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা মানা হয়না।
পিপিআর আইন সংশোধনের পরও এটিএম-এলটিএম টেন্ডারে দুর্নীতি : বাংলাদেশ সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) ২০২৫ সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ করলেও দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের দোসদের কারণে এর সুফল পুরোপুরি মিলছে না বলে ভুক্তভোগিরা এমন অভিযোগ করেছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পক্ষপাত, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা প্রদান, কোটেশন কারসাজি ও প্রতিযোগিতা সীমিত করার মতো কার্যক্রম সংঘটিত হচ্ছে। টেন্ডার ডকুমেন্টে শর্ত পরিবর্তন করে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া পিপিআর ২০২৫ এর সংশোধিত ধারা উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। নথিপত্র, টেন্ডার কাগজ, যোগাযোগের রেকর্ড ও সাক্ষ্যসহ একাধিক প্রমাণ রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করলে তার সত্যতা পাবে। আর এ বিষয় জনস্বার্থে তদন্তের দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগি ঠিদারগণ।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, পিপিআর ২০২৫-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ই-জিপি ও আধুনিক ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি কমানো। কিন্তু যদি মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অনিয়মে জড়ান, তবে সরকারের এই সংস্কার উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়বে। সুশীল সমাজ ও স্থানীয় ঠিকাদাররা দুদক, সিপিটিইউ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে নগর গণপূর্ত বিভাগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যারা স্বৈরাচারী আমলে পদোন্নতি লাভ করেছেন এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করছেন। সিন্ডিকেটটি শুধুমাত্র প্রকল্প বরাদ্দ ও টেন্ডার কারচুপিই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং কর্মী নিয়োগ, বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















