ঢাকা ০৮:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শিক্ষিত যুবকদের জন্য বিশেষ ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ: দেশের ৬৪ জেলায় কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ আ.লীগের সাব-রেজিষ্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ “ড. তারেক হোসেনের নেতৃত্বে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়োগ ও টেন্ডার সিণ্ডিকেট” বালিয়াডাঙ্গীতে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে রং মিশ্রিত শিং-মাগুর মাছ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য : মির্জা ফখরুল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে একের পর এক নিয়োগ বিতর্কে বয়জার রহমান বাগেরহাটের রামপালে চাঁদা দাবি করে সাংবাদিককে প্রাণে মারার হুমকি । জুলাই যোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর সাথে সচিবালয়ে সাক্ষাত নওগাঁয় বিএমডিএ জোনে ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ,তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আবু সুফিয়ানের প্রকল্প-নিয়োগ বাণিজ্য

পাইলট নন, তবু ফ্লাইট তদারকির দায়িত্বে কাজী ফৌজিয়া নাহার

  • মোঃ মামুন হোসেন
  • আপডেট সময় ০১:০৫:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫১৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের আকাশপথের নিরাপত্তা, পাইলটদের দক্ষতা যাচাই এবং ফ্লাইট পরিচালনা ব্যবস্থার তদারকির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব যেখানে নির্ভর করে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দীর্ঘ উড্ডয়ন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের ওপর, সেখানে এক ব্যতিক্রমী এবং বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এমন একজন কর্মকর্তাকে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর (এফওআই) পদে পদোন্নতি দিয়েছে, যার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল লাইব্রেরিয়ান হিসেবে এবং যার নেই কোনো ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা, নেই পাইলট প্রশিক্ষণ, এমনকি কখনও ককপিটে বসার বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই। সেই কর্মকর্তা হলেন কাজী ফৌজিয়া নাহার। দেশের পাইলটদের লাইসেন্স যাচাই, প্রশিক্ষণ তদারকি এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা মূল্যায়নের মতো গুরুদায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত হওয়ার ঘটনায় এভিয়েশন অঙ্গনে বিস্ময়, উদ্বেগ ও প্রশ্ন—সবই একসঙ্গে সামনে এসেছে।

ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর পদটি কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি সরাসরি বিমান চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিশেষায়িত কারিগরি অবস্থান। আন্তর্জাতিকভাবে এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, এফওআই হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই বৈধ পাইলট লাইসেন্সধারী হতে হবে এবং দীর্ঘ উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সাধারণভাবে এই অভিজ্ঞতার পরিমাণ পাঁচ হাজার ঘণ্টার কম হওয়া উচিত নয় বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কারণ একজন এফওআই মূলত অন্য পাইলটদের দক্ষতা মূল্যায়ন করেন, তাদের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া তদারকি করেন এবং অপারেশনাল নিরাপত্তার ঝুঁকি নিরূপণ করেন। এমন দায়িত্ব পালনের জন্য বাস্তব ফ্লাইট অভিজ্ঞতা ছাড়া কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, কাজী ফৌজিয়া নাহারের পেশাগত পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ১৯৯৭ সালে বেবিচকে লাইব্রেরিয়ান পদে যোগদান করেন, যা একটি ক্লোজড পোস্ট হিসেবে পরিচিত। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী এই পদে সাধারণত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত বা নেই বললেই চলে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লাইব্রেরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তার একাডেমিক যোগ্যতা লাইব্রেরি ও ইনফরমেশন সায়েন্সে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও বিমান পরিচালনা, উড্ডয়ন নিরাপত্তা বা পাইলটিং সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্স তার নেই বলে জানা গেছে। তবুও ২০২১ সালে তাকে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা সংশ্লিষ্ট মহলে বিস্ময়ের জন্ম দেয়।

এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিধিমালা অনুযায়ী, এফওআই হিসেবে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারিত। অথচ কাজী ফৌজিয়া নাহারকে যখন এ পদে পদায়ন করা হয়, তখন তার বয়স ছিল ৪৯ বছরের বেশি। এ বিষয়টি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এই পদোন্নতির পথ সুগম করতে চাকরি বিধিমালায় সংশোধন আনা হয়েছিল। তাদের দাবি, বিদ্যমান নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বেবিচকের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের পদে নিয়োগ সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং অভিজ্ঞ পাইলটদের মধ্য থেকে দেওয়া হয়। আইকাও নির্দেশনায়ও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে নির্বাচন করেই এই ধরনের কারিগরি পদে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কীভাবে এমন একটি কারিগরি দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলেন, যার মূল ভিত্তিই হলো বাস্তব উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা।

বেবিচকের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, কাজী ফৌজিয়া নাহারকে এফওআই পদে পদায়ন করা হলেও তিনি মূলত কেবিন সেফটি ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে এই দায়িত্বের স্পষ্ট উল্লেখ নেই বলে জানা গেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেবিন সেফটি ইন্সপেক্টর পদেও নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। আইকাও-এর প্রণীত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই পদে থাকতে হলে বেসামরিক বিমান পরিবহণ কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং অন্তত পাঁচ বছরের কেবিন ক্রু হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি কেবিন সুরক্ষা ও জরুরি প্রক্রিয়াবিষয়ক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক বা মূল্যায়নকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই যোগ্যতাগুলোর কোনোটিই কাজী ফৌজিয়া নাহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক ব্যতিক্রম নয়, এটি সরাসরি যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরদের কাজ হলো পাইলটদের লাইসেন্স যাচাই করা, প্রশিক্ষণের মান মূল্যায়ন করা এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন এফওআই নিজেই যদি উড্ডয়ন অভিজ্ঞতাহীন হন, তাহলে তার মাধ্যমে দেওয়া সার্টিফিকেশন এবং তদারকি কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

সাবেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অডিটে এই ধরনের নিয়োগ ধরা পড়লে দেশের ফ্লাইট সেফটি রেটিং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদনেও প্রভাব পড়তে পারে। আইকাও নিয়মিতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিমান চলাচল ব্যবস্থার ওপর নজরদারি চালায় এবং তাদের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। ফলে একটি নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুরো এভিয়েশন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ ধরনের নিয়োগকে বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির মতে, যদি বিধিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়ে থাকে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

কাজী ফৌজিয়া নাহারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে জানা গেছে। ফলে তার ব্যক্তিগত অবস্থান বা ব্যাখ্যা এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তবে এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি কেবল একজন কর্মকর্তার নিয়োগ নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও প্রক্রিয়ার প্রতিফলন, যেখানে দক্ষতার চেয়ে প্রভাব বা সুযোগ বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। কারণ বিমান চলাচলে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ—এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এই নিয়োগের পেছনে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের নিয়োগ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রী নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্নে বিষয়টি এখন আর শুধু প্রশাসনিক সীমার মধ্যে নেই; এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইলে এমন বিতর্কিত নিয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষিত যুবকদের জন্য বিশেষ ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ: দেশের ৬৪ জেলায় কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ

পাইলট নন, তবু ফ্লাইট তদারকির দায়িত্বে কাজী ফৌজিয়া নাহার

আপডেট সময় ০১:০৫:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের আকাশপথের নিরাপত্তা, পাইলটদের দক্ষতা যাচাই এবং ফ্লাইট পরিচালনা ব্যবস্থার তদারকির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল দায়িত্ব যেখানে নির্ভর করে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দীর্ঘ উড্ডয়ন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের ওপর, সেখানে এক ব্যতিক্রমী এবং বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এমন একজন কর্মকর্তাকে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর (এফওআই) পদে পদোন্নতি দিয়েছে, যার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল লাইব্রেরিয়ান হিসেবে এবং যার নেই কোনো ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা, নেই পাইলট প্রশিক্ষণ, এমনকি কখনও ককপিটে বসার বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই। সেই কর্মকর্তা হলেন কাজী ফৌজিয়া নাহার। দেশের পাইলটদের লাইসেন্স যাচাই, প্রশিক্ষণ তদারকি এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা মূল্যায়নের মতো গুরুদায়িত্ব তার হাতে ন্যস্ত হওয়ার ঘটনায় এভিয়েশন অঙ্গনে বিস্ময়, উদ্বেগ ও প্রশ্ন—সবই একসঙ্গে সামনে এসেছে।

ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর পদটি কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি সরাসরি বিমান চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিশেষায়িত কারিগরি অবস্থান। আন্তর্জাতিকভাবে এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, এফওআই হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই বৈধ পাইলট লাইসেন্সধারী হতে হবে এবং দীর্ঘ উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সাধারণভাবে এই অভিজ্ঞতার পরিমাণ পাঁচ হাজার ঘণ্টার কম হওয়া উচিত নয় বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কারণ একজন এফওআই মূলত অন্য পাইলটদের দক্ষতা মূল্যায়ন করেন, তাদের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া তদারকি করেন এবং অপারেশনাল নিরাপত্তার ঝুঁকি নিরূপণ করেন। এমন দায়িত্ব পালনের জন্য বাস্তব ফ্লাইট অভিজ্ঞতা ছাড়া কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, কাজী ফৌজিয়া নাহারের পেশাগত পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ১৯৯৭ সালে বেবিচকে লাইব্রেরিয়ান পদে যোগদান করেন, যা একটি ক্লোজড পোস্ট হিসেবে পরিচিত। চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী এই পদে সাধারণত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত বা নেই বললেই চলে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লাইব্রেরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তার একাডেমিক যোগ্যতা লাইব্রেরি ও ইনফরমেশন সায়েন্সে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও বিমান পরিচালনা, উড্ডয়ন নিরাপত্তা বা পাইলটিং সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্স তার নেই বলে জানা গেছে। তবুও ২০২১ সালে তাকে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা সংশ্লিষ্ট মহলে বিস্ময়ের জন্ম দেয়।

এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিধিমালা অনুযায়ী, এফওআই হিসেবে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারিত। অথচ কাজী ফৌজিয়া নাহারকে যখন এ পদে পদায়ন করা হয়, তখন তার বয়স ছিল ৪৯ বছরের বেশি। এ বিষয়টি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এই পদোন্নতির পথ সুগম করতে চাকরি বিধিমালায় সংশোধন আনা হয়েছিল। তাদের দাবি, বিদ্যমান নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বেবিচকের ভেতরের কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের পদে নিয়োগ সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং অভিজ্ঞ পাইলটদের মধ্য থেকে দেওয়া হয়। আইকাও নির্দেশনায়ও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে নির্বাচন করেই এই ধরনের কারিগরি পদে নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কীভাবে এমন একটি কারিগরি দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলেন, যার মূল ভিত্তিই হলো বাস্তব উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা।

বেবিচকের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, কাজী ফৌজিয়া নাহারকে এফওআই পদে পদায়ন করা হলেও তিনি মূলত কেবিন সেফটি ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে এই দায়িত্বের স্পষ্ট উল্লেখ নেই বলে জানা গেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেবিন সেফটি ইন্সপেক্টর পদেও নিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। আইকাও-এর প্রণীত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই পদে থাকতে হলে বেসামরিক বিমান পরিবহণ কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং অন্তত পাঁচ বছরের কেবিন ক্রু হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি কেবিন সুরক্ষা ও জরুরি প্রক্রিয়াবিষয়ক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক বা মূল্যায়নকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই যোগ্যতাগুলোর কোনোটিই কাজী ফৌজিয়া নাহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক ব্যতিক্রম নয়, এটি সরাসরি যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরদের কাজ হলো পাইলটদের লাইসেন্স যাচাই করা, প্রশিক্ষণের মান মূল্যায়ন করা এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন এফওআই নিজেই যদি উড্ডয়ন অভিজ্ঞতাহীন হন, তাহলে তার মাধ্যমে দেওয়া সার্টিফিকেশন এবং তদারকি কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

সাবেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অডিটে এই ধরনের নিয়োগ ধরা পড়লে দেশের ফ্লাইট সেফটি রেটিং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদনেও প্রভাব পড়তে পারে। আইকাও নিয়মিতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিমান চলাচল ব্যবস্থার ওপর নজরদারি চালায় এবং তাদের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। ফলে একটি নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুরো এভিয়েশন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ ধরনের নিয়োগকে বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির মতে, যদি বিধিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়ে থাকে, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

কাজী ফৌজিয়া নাহারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে জানা গেছে। ফলে তার ব্যক্তিগত অবস্থান বা ব্যাখ্যা এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তবে এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি কেবল একজন কর্মকর্তার নিয়োগ নয়; এটি একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও প্রক্রিয়ার প্রতিফলন, যেখানে দক্ষতার চেয়ে প্রভাব বা সুযোগ বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। কারণ বিমান চলাচলে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ—এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এই নিয়োগের পেছনে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের নিয়োগ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রী নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্নে বিষয়টি এখন আর শুধু প্রশাসনিক সীমার মধ্যে নেই; এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত বৈশ্বিক মানদণ্ডে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইলে এমন বিতর্কিত নিয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠছে।