ঢাকা ০২:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
উল্টো পথে আসা পিকআপে অটোরিকশায় ধাক্কা, অন্তঃসত্ত্বাসহ আহত ৭ এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’ সদস্য হলেন ২ এমপি গুম-নির্যাতের পেছনে দায়ী শেখ হাসিনা : জেরায় সাক্ষী পটুয়াখালীতে এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় ৫৩৩ জন অনুপস্থিত বাংলাদেশি জাহাজকে কেন হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান? অপতথ্যের বিস্তার রোধে ইউনেস্কোর সহযোগিতা চাইলেন তথ্যমন্ত্রী ঢাকায় মা‌র্কিন রাষ্ট্রদূ‌তের ১০০ দিন : বাণিজ্য চুক্তিকে বললেন ‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে অনীহা, সিরাজগঞ্জে প্রভাষক সাময়িক বরখাস্ত ১৪ জেলায় বইছে তাপপ্রবাহ, অব্যাহত থাকার আভাস সাভারে খাদ্য অধিদপ্তরের ৩৬১ বস্তা চাল জব্দ, আটক ৩

বহাল তবিয়তে ডিপিডিসির আব্দুর রাজ্জাক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০১:৪৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ৬৭৬ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। বিশেষ করে বিতরণ পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং আর্থিক স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে যে বিতর্ক ও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, তা আবারো বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির চিত্র সামনে এনেছে।
ডিপিডিসির ভেতর দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীরা বলছেন—
তিনি নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে আর্থিক সুবিধা আদায় করেন।
টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় কমিশনভিত্তিক লেনদেন নিশ্চিত করেন।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন একই পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যসিস্ট আমলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও উচ্চ আওয়ামী সরকারের আমলা-মন্ত্রীদের শক্তির কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ডিপিডিসির ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়-
কোনো ধরনের বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে আব্দুর রাজ্জাকের অনুমোদন ছাড়া কিছুই হয় না।
অনেক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে আর্থিকভাবে সক্ষম ও ঘনিষ্ঠ লোকদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়।
কর্মক্ষেত্রে ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে না পারে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে কোনো ধরনের প্রশাসনিক কাজে তাঁর অনুমতি লাগবে। অনেক সময় তিনি লিখিত আইনকেও অগ্রাহ্য করেন। এ কারণে সৎভাবে কাজ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়।”
বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের টেন্ডার বা ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আব্দুর রাজ্জাক নিয়মিতভাবে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেন।
কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।
যে ঠিকাদার ঘুষ দিতে অস্বীকার করেন, তাঁকে বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়।
এতে প্রকল্পের মান হ্রাস পাচ্ছে এবং গ্রাহকরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর প্রভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে, ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, আব্দুর রাজ্জাক আওয়ামীলীগের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত পর্যায়েই থেমে যায়।
শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ফলে তিনি সবসময় নিরাপদ থাকেন।
প্রশাসনিক উচ্চ মহলও তাঁকে বাঁচিয়ে চলেন। ফলশ্রুতিতে সিস্টেমেটিক দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কর্মচারীদের বেতন, ওভারটাইম বিল, এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব বিদ্যমান।
সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় দ্রুত সংযোগ দেওয়ার নামে।
অনেক ভুয়া বিল ও ওভারটাইম বাবদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে।
অডিট রিপোর্টেও একাধিকবার অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডিপিডিসির গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়- বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গেলে নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়।
সংযোগ দেওয়ার সময় এক সপ্তাহের কাজ তিন মাসেও শেষ হয় না।
“সরাসরি রাজ্জাক সাহেবের লোকের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে কাজ হবে”-এমন পরামর্শ কর্মকর্তারা দেন।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, “বিদ্যুৎ ছাড়া ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। অথচ সংযোগ নিতে গিয়ে আমাকে কয়েক দফায় অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়েছে।”
একজন কর্মকর্তার অনিয়ম কেবল তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা বিদ্যুৎ খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিম্নমানের প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা কমছে। গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এমন কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে থাকেন, তাহলে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না-সে প্রশ্ন এখন জনমনে।
কেউ কেউ মনে করেন, তদন্ত প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
আবার অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ সাহস করে পদক্ষেপ নিতে পারেন না।
একজন সাবেক বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি বন্ধ করতে হবে। নইলে দুর্নীতি চক্র অটুট থেকে যাবে।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন-
স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে আব্দুর রাজ্জাকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তারা ভয় ছাড়া অভিযোগ জানাতে পারে।
দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেন তদন্ত করে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থেকে বিদ্যুৎ খাতকে মুক্ত রাখা।
আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে, তা কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; বরং বিদ্যুৎ খাতের গভীর সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই খাতে যদি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শক্তিশালী প্রশাসনিক পদক্ষেপই পারে ডিপিডিসি ও বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতির গ্রাস থেকে মুক্ত করতে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উল্টো পথে আসা পিকআপে অটোরিকশায় ধাক্কা, অন্তঃসত্ত্বাসহ আহত ৭

বহাল তবিয়তে ডিপিডিসির আব্দুর রাজ্জাক

আপডেট সময় ০১:৪৭:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। বিশেষ করে বিতরণ পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং আর্থিক স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে যে বিতর্ক ও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, তা আবারো বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির চিত্র সামনে এনেছে।
ডিপিডিসির ভেতর দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীরা বলছেন—
তিনি নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে আর্থিক সুবিধা আদায় করেন।
টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় কমিশনভিত্তিক লেনদেন নিশ্চিত করেন।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন একই পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যসিস্ট আমলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও উচ্চ আওয়ামী সরকারের আমলা-মন্ত্রীদের শক্তির কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ডিপিডিসির ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়-
কোনো ধরনের বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে আব্দুর রাজ্জাকের অনুমোদন ছাড়া কিছুই হয় না।
অনেক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে আর্থিকভাবে সক্ষম ও ঘনিষ্ঠ লোকদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়।
কর্মক্ষেত্রে ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে না পারে।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে কোনো ধরনের প্রশাসনিক কাজে তাঁর অনুমতি লাগবে। অনেক সময় তিনি লিখিত আইনকেও অগ্রাহ্য করেন। এ কারণে সৎভাবে কাজ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়।”
বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের টেন্ডার বা ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আব্দুর রাজ্জাক নিয়মিতভাবে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেন।
কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।
যে ঠিকাদার ঘুষ দিতে অস্বীকার করেন, তাঁকে বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়।
এতে প্রকল্পের মান হ্রাস পাচ্ছে এবং গ্রাহকরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর প্রভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে, ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, আব্দুর রাজ্জাক আওয়ামীলীগের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত পর্যায়েই থেমে যায়।
শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার ফলে তিনি সবসময় নিরাপদ থাকেন।
প্রশাসনিক উচ্চ মহলও তাঁকে বাঁচিয়ে চলেন। ফলশ্রুতিতে সিস্টেমেটিক দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কর্মচারীদের বেতন, ওভারটাইম বিল, এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব বিদ্যমান।
সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় দ্রুত সংযোগ দেওয়ার নামে।
অনেক ভুয়া বিল ও ওভারটাইম বাবদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে।
অডিট রিপোর্টেও একাধিকবার অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডিপিডিসির গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়- বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গেলে নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়।
সংযোগ দেওয়ার সময় এক সপ্তাহের কাজ তিন মাসেও শেষ হয় না।
“সরাসরি রাজ্জাক সাহেবের লোকের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে কাজ হবে”-এমন পরামর্শ কর্মকর্তারা দেন।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, “বিদ্যুৎ ছাড়া ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। অথচ সংযোগ নিতে গিয়ে আমাকে কয়েক দফায় অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়েছে।”
একজন কর্মকর্তার অনিয়ম কেবল তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোটা বিদ্যুৎ খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিম্নমানের প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা কমছে। গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এমন কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে থাকেন, তাহলে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না-সে প্রশ্ন এখন জনমনে।
কেউ কেউ মনে করেন, তদন্ত প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
আবার অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ সাহস করে পদক্ষেপ নিতে পারেন না।
একজন সাবেক বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি বন্ধ করতে হবে। নইলে দুর্নীতি চক্র অটুট থেকে যাবে।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন-
স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে আব্দুর রাজ্জাকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।
কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যাতে তারা ভয় ছাড়া অভিযোগ জানাতে পারে।
দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেন তদন্ত করে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থেকে বিদ্যুৎ খাতকে মুক্ত রাখা।
আব্দুর রাজ্জাককে ঘিরে যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে, তা কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; বরং বিদ্যুৎ খাতের গভীর সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এই খাতে যদি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শক্তিশালী প্রশাসনিক পদক্ষেপই পারে ডিপিডিসি ও বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতির গ্রাস থেকে মুক্ত করতে।