ঢাকা ০২:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জামালপুরে ১০ বছরেও শুরু হয়নি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ নেত্রকোণায় দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নারী নিহত, আহত ২০ জঙ্গলে ২৭ বছর কাটিয়ে দেশে ফিরলেন নি‌খোঁজ মালয়েশিয়া প্রবাসী উল্টো পথে আসা পিকআপে অটোরিকশায় ধাক্কা, অন্তঃসত্ত্বাসহ আহত ৭ এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’ সদস্য হলেন ২ এমপি গুম-নির্যাতের পেছনে দায়ী শেখ হাসিনা : জেরায় সাক্ষী পটুয়াখালীতে এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় ৫৩৩ জন অনুপস্থিত বাংলাদেশি জাহাজকে কেন হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান? অপতথ্যের বিস্তার রোধে ইউনেস্কোর সহযোগিতা চাইলেন তথ্যমন্ত্রী ঢাকায় মা‌র্কিন রাষ্ট্রদূ‌তের ১০০ দিন : বাণিজ্য চুক্তিকে বললেন ‘ঐতিহাসিক’

বাংলাদেশি জাহাজকে কেন হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান?

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের জের ধরে হরমুজ প্রণালি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এর অনুমতি না পেয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ১৯ এপ্রিল রোববার রাতে তুরস্কে এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহকে জাহাজটির হরমুজ প্রণালি নিরাপদে পার হতে সহায়তার অনুরোধ করেছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

এদিকে ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজ সৌদি আরবের জুয়াইমাহ বন্দর থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা থাকলেও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় সেটিও আসতে পারেনি বলে জানা গেছে।

যদিও গত পহেলা এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত হরমুজ প্রণালি পার হতে অনুমতির অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি জাহাজকে সহায়তার কথা বলেছিলেন। এর আগে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশসহ ৬টি দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

এরপর দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে ইরানি নৌ বাহিনী ও আইআরজিসির অনুমতি না পেয়ে ৩৭ হাজার টন সারসহ এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে বাংলার জয়যাত্রা।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসির মালিকানায় থাকা এই জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে। তবে এর নাবিকদের সবাই বাংলাদেশি। জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে যাবার কথা ছিল।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, জাহাজটিকে হরমুজ পার করানোর জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে ইরানের ঐতিহাসিক সহযোগিতামুলক সম্পর্ক থাকার পরেও বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ পার হতে ইরান কেন বাধা দিচ্ছে।

এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, কোনো দেশে আক্রমণ বাংলাদেশ সমর্থন করে না- এই নীতিই বাংলাদেশ সবসময় অনুসরণ করে আসছিল কিন্তু এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো বিভ্রান্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে।

জয়যাত্রাকে ইরান কেন বাধা দিচ্ছে

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো যে ধারণা দিচ্ছে তা হলো ইরানে হামলার ঘটনা ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত নিজেও বলেছেন। মূলত এ কারণেই ইরানের নৌ-বাহিনী হরমুজ পার হতে বাংলাদেশি জাহাজকে অনুমতি দিচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে এবং হামলার প্রথমদিনই নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েক জন সদস্য। এছাড়াও এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান।

জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ‘মার্কিন সেনাঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো’ লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

এ অবস্থার মধ্যেই পহেলা মার্চ রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়, যেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে’ দাবি করে এর নিন্দা জানায় বাংলাদেশ সরকার।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে কোথাও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নামও উল্লেখ করা হয়নি। সেই সঙ্গে ইরানে হামলার ঘটনায়ও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

এ নিয়ে দেশের ভেতরে তীব্র সমালোচনা দেখা দিলে ২রা মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ লাইনের আরেকটি বিবৃতি দিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে ইরানের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করে।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খামেনির মৃত্যুর বিষয়ে যথাযথ শোক না জানানো ও দূতাবাসে শোক বইতে কোনো কর্মকর্তা গিয়ে স্বাক্ষর না করার ঘটনা ইরানিদের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই এ তথ্য জানিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।

এছাড়া ০১ এপ্রিল দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশের দুই বিবৃতি নিয়ে ইরানের মনোকষ্টের বিষয়টি প্রকাশ্যেই তুলে ধরেন।

জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি। এ সময় তিনি স্পেনের মত ইউরোপীয় দেশ ও আমেরিকার ভেতরে জনগণের যুদ্ধবিরোধী মিছিল ও সমালোচনার উদাহরণ দেন। সে আলোকে বাংলাদেশও সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে বলে আশা করেন ইরানি রাষ্ট্রদূত।

রাষ্ট্রদূত অবশ্য তখনো এ ও জানান যে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান।

জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত।

এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ই এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলার জয়যাত্রাসহ আরেকটি বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে যথাযথ পর্যায়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

কিন্তু এর পরেও দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে পারেনি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি। ফলে ১৯ এপ্রিল তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবারও বিষয়টি উত্থাপন করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, মূলত যুদ্ধকেন্দ্রিক বাংলাদেশের অবস্থানটিই ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা এখন সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয় এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হোক বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না।

“বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে গত ২৬শে জানুয়ারি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যায় জাহাজটি। পরে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ওই বন্দরে জাহাজটির দুশো মিটারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এর মধ্যেও সেখানে পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ভারতের মুম্বাই বন্দর ঠিক হলেও আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ডের নিরাপত্তার কথা জানিয়ে বাধা দিলে জাহাজটি গভীর জলসীমায় অবস্থান নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ই এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় তখন জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি।

পরে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি হরমুজের দিকে রওনা হয়।

কিন্তু হরমুজ প্রণালির ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যাওয়ার পর ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটির হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সময় গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম না করে জাহাজটি আবার আগের অবস্থানের দিকে ফিরে যায়।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “যেভাবে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে আমরা আশা করি দ্রুতই হরমুজ পার হতে জাহাজটি ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাবে।”

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জামালপুরে ১০ বছরেও শুরু হয়নি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ

বাংলাদেশি জাহাজকে কেন হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান?

আপডেট সময় ০১:৪১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধের জের ধরে হরমুজ প্রণালি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এর অনুমতি না পেয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ১৯ এপ্রিল রোববার রাতে তুরস্কে এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহকে জাহাজটির হরমুজ প্রণালি নিরাপদে পার হতে সহায়তার অনুরোধ করেছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

এদিকে ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজ সৌদি আরবের জুয়াইমাহ বন্দর থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা থাকলেও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় সেটিও আসতে পারেনি বলে জানা গেছে।

যদিও গত পহেলা এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত হরমুজ প্রণালি পার হতে অনুমতির অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি জাহাজকে সহায়তার কথা বলেছিলেন। এর আগে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশসহ ৬টি দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

এরপর দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে ইরানি নৌ বাহিনী ও আইআরজিসির অনুমতি না পেয়ে ৩৭ হাজার টন সারসহ এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে বাংলার জয়যাত্রা।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসির মালিকানায় থাকা এই জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে। তবে এর নাবিকদের সবাই বাংলাদেশি। জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে যাবার কথা ছিল।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, জাহাজটিকে হরমুজ পার করানোর জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে ইরানের ঐতিহাসিক সহযোগিতামুলক সম্পর্ক থাকার পরেও বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ পার হতে ইরান কেন বাধা দিচ্ছে।

এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, কোনো দেশে আক্রমণ বাংলাদেশ সমর্থন করে না- এই নীতিই বাংলাদেশ সবসময় অনুসরণ করে আসছিল কিন্তু এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো বিভ্রান্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে।

জয়যাত্রাকে ইরান কেন বাধা দিচ্ছে

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো যে ধারণা দিচ্ছে তা হলো ইরানে হামলার ঘটনা ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত নিজেও বলেছেন। মূলত এ কারণেই ইরানের নৌ-বাহিনী হরমুজ পার হতে বাংলাদেশি জাহাজকে অনুমতি দিচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে এবং হামলার প্রথমদিনই নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েক জন সদস্য। এছাড়াও এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ইরান।

জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ‘মার্কিন সেনাঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো’ লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

এ অবস্থার মধ্যেই পহেলা মার্চ রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়, যেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে’ দাবি করে এর নিন্দা জানায় বাংলাদেশ সরকার।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে কোথাও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নামও উল্লেখ করা হয়নি। সেই সঙ্গে ইরানে হামলার ঘটনায়ও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

এ নিয়ে দেশের ভেতরে তীব্র সমালোচনা দেখা দিলে ২রা মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ লাইনের আরেকটি বিবৃতি দিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে ইরানের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করে।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খামেনির মৃত্যুর বিষয়ে যথাযথ শোক না জানানো ও দূতাবাসে শোক বইতে কোনো কর্মকর্তা গিয়ে স্বাক্ষর না করার ঘটনা ইরানিদের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই এ তথ্য জানিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।

এছাড়া ০১ এপ্রিল দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশের দুই বিবৃতি নিয়ে ইরানের মনোকষ্টের বিষয়টি প্রকাশ্যেই তুলে ধরেন।

জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি। এ সময় তিনি স্পেনের মত ইউরোপীয় দেশ ও আমেরিকার ভেতরে জনগণের যুদ্ধবিরোধী মিছিল ও সমালোচনার উদাহরণ দেন। সে আলোকে বাংলাদেশও সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে বলে আশা করেন ইরানি রাষ্ট্রদূত।

রাষ্ট্রদূত অবশ্য তখনো এ ও জানান যে, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান।

জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত।

এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ই এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলার জয়যাত্রাসহ আরেকটি বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে যথাযথ পর্যায়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

কিন্তু এর পরেও দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে পারেনি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি। ফলে ১৯ এপ্রিল তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবারও বিষয়টি উত্থাপন করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, মূলত যুদ্ধকেন্দ্রিক বাংলাদেশের অবস্থানটিই ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা এখন সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয় এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হোক বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না।

“বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে গত ২৬শে জানুয়ারি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যায় জাহাজটি। পরে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ওই বন্দরে জাহাজটির দুশো মিটারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এর মধ্যেও সেখানে পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ভারতের মুম্বাই বন্দর ঠিক হলেও আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ডের নিরাপত্তার কথা জানিয়ে বাধা দিলে জাহাজটি গভীর জলসীমায় অবস্থান নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ই এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় তখন জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি।

পরে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি হরমুজের দিকে রওনা হয়।

কিন্তু হরমুজ প্রণালির ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যাওয়ার পর ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটির হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সময় গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম না করে জাহাজটি আবার আগের অবস্থানের দিকে ফিরে যায়।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “যেভাবে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে আমরা আশা করি দ্রুতই হরমুজ পার হতে জাহাজটি ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাবে।”