কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে আমন ধানের ক্ষেতে পোকা দমনে কীটনাশকের পরিবর্তে এখন চাষিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পার্চিং পদ্ধতি। ধানির জমিতে গাছের ডাল, খুঁটি, বাঁশের কঞ্চি ও ধইঞ্চার ডাল পোঁতা হয়। সেগুলোর ওপর বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বসে ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার এ পদ্ধতিকেই পার্চিং বলা হয়।
গতকাল শনিবার সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমনের ক্ষেতে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ৬টি করে ডাল বা কঞ্চি পুঁতে দিয়ে ক্ষতিকর পোকা দমন করছেন আমন চাষিরা। কীটনাশক ছাড়া ডাল বা কঞ্চি স্থাপন করে ফসলের জমির ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করার পদ্ধতিটির নাম পার্চিং পদ্ধতি।
জমিতে উঁচু স্থানে পাখি বসার সুযোগ তৈরি করে দেওয়াই পার্চিং পদ্ধতি। পার্চিং পদ্ধতিটি পরিবেশবান্ধব এবং লাভজনক। কারণ এর মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহার ও ফসলের উৎপাদন খরচ কমে। বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখা এবং পোকার বংশবিস্তার কমানো যায়। এই পদ্ধতির আরও একটি সুবিধা হলো, পাখির বিষ্ঠা জমিতে জৈব পদার্থ যোগ করে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। পার্চিং পদ্ধতিটি বিশেষত পাখিদের জন্য। কারণ পার্চিংয়ে বসে দোল খেতে খেতে পাখিরা মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা, ধানের স্কিপা পোকার মথ, শিষ কাটা লেদা পোকা, সবুজ শুঁড় লেদা পোকা, শুঁড় ঘাসফড়িং, লম্বা শুঁড় ঘাসফড়িং, উড়চুঙ্গা ধরে খায়।
সাধারণত দেখা যায়, জমিতে সার দেওয়ার পর থেকেই রোপা-আমনের ফসলি জমিতে বাদামি ঘাসফড়িং বা কারেন্ট পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা এবং চুঙ্গি-মাজরাসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এতদিন কৃষকরা এসব পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে কীটনাশকসহ বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে আসছিলেন। এখন পোকা দমনে প্রাকৃতিক পার্চিং পদ্ধতি কৃষকদের মধ্যে আশা জাগিয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক চাষি হাবিবুর রহমান, ফজলুর রহমান, আল আমিন, সুশান্ত কুমার, মাহফুজুর রহমান, শাহিন আলম, মাহবুবুর রহমানসহ আরও অনেকে বলেন, আমরা আমাদের এলাকার কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের পরামর্শে জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করি। এ পার্চিং পদ্ধতিতে ফসলি জমিতে পোতা ডালগুলোর ওপর পাখি বসে ফসলি জমির ক্ষতিকারক পোকা ও পোকার ডিম খেয়ে ফেলার ফলে আর কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। যার ফলে কম খরচে অধিক ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে আমরা জমিতে কীটনাশক পরিহার করে পোকা দমনে সহজ ও পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছি। তবে সব ধরনের পাখি পার্চিংয়ে বসে না। মূলত ফিঙে, শালিক, বুলবুলি, শ্যামা, দোয়েল, সাতভায়রা—এসব পাখি পার্চিংয়ে বসে পোকা ধরে খায় বলে জানান তারা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৮২৩ হেক্টর। হাইব্রিড ৫৪০, উফশী ৭ হাজার ২৮০, স্থানীয় ৩ হেক্টর। আবাদ হয়েছে হাইব্রিড ৫০০, উফশী ৪ হাজার ৯৫০ ও স্থানীয় ৩ হেক্টর, মোট ৫ হাজার ৪৫৩ হেক্টর।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ বিকাশ রায় বলেন, পার্চিং পদ্ধতি ফসলের পোকা দমনের জন্য অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশবান্ধব। এ পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন খরচ ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় এটি উপজেলার কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক কৃষক আমন ফসলের ক্ষেতে কীটনাশক পরিহার করে পোকা দমনে সহজ ও লাভজনক পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। তিনি আরও বলেন, একটি ফিঙে পাখি সারা দিনে কমপক্ষে ৩০টি করে মাজরা পোকার মথ, ডিম ও পুত্তলি খেয়ে থাকে। ফসল রোপণের পরপরই পার্চিং স্থাপন করতে হয়।
রুহুল আমিন, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি 



















