ঢাকা ০৪:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দায়িত্ব বাড়ল দুই মন্ত্রীর নেত্রকোনায় জুয়ার আসর থেকে ৮ জুয়াড়ি আটক মায়ের কোলে শিশু যেমন নিরাপদ, বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষও তেমন নিরাপদ : চরমোনাই পীর নোয়াখালীতে সাবেক রেলওয়ে প্রকৌশলী শাহ আলমের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল কোটালীপাড়ায় প্রীতি ফুটবল ম্যাচ: বিবাহিত ও অবিবাহিত দল গোলে ড্র শিবগঞ্জে রাতের আঁধারে কবরস্থানের ১৪০ মেহগনি গাছ কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা ব্রাহ্মণপাড়ায় পুলিশের পৃথক অভিযানে ৯ জন গ্রেপ্তার, সাড়ে ২৬ কেজি গাঁজা উদ্ধার ময়নাতদন্ত ও থানায় অভিযোগ ছাড়াই সোহাগের লাশ দাফন: রহস্য আরও ঘনীভূত হাই-টেক পার্কে আনোয়ার-শফিকের কোটি টাকার অনিয়ম, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারের তথ্য পাচার ও ওএসএস ঘিরে অভিযোগ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদককে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

বিআইডব্লিউটিএতে ৪৪ হাজার লিটার তেল চুরি, মূলহোতা মাস্টার নজরুল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৩:২০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫২৬ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজের জ্বালানি তেল চুরি, ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি এবং ঠিকাদারি অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে আয়োজিত এই দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম এবং নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের চাঁদপুর কার্যালয়ের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খান।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান সরাসরি সরকারি ডিপো থেকে ডিজেল ও লুব-অয়েল ক্রয়ের নির্দেশ দেন। এ আদেশের আলোকেই চাঁদপুর ডিপো থেকে গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখ থেকে ধাপে ধাপে চার দফায় সর্বমোট ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল ও লুব-অয়েল সংগ্রহ করা হয়।

কাগজে-কলমে এই জ্বালানি বিভিন্ন নৌযানে সরবরাহ দেখানো হলেও বাস্তবে তা সম্পূর্ণ ভুয়া বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে:

উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম: ৮,০০০ লিটার ডিজেল

ওয়ার্কবোট কপোত ও আড়িয়াল খাঁ: যথাক্রমে ৩,০০০ ও ৫,০০০ লিটার ডিজেল

টাগবোট দুর্দান্ত: ২৬,০০০ লিটার ডিজেল

এসএমবি-৩ মার্কিং বোট: ২,০০০ লিটার ডিজেল

অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত সময়ে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তম’ বা টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ কোনো প্রকার উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়নি। এমনকি এসএমবি-৩ বোটটি অলস বসিয়ে রেখে ভাড়াকৃত সাধারণ নৌকা দিয়ে মার্কিং কাজ পরিচালনা করা হয়, যার পেছনেও গত তিন মাসে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ভাড়া বিল দেখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, প্রতি লিটার ৯৫ টাকা দরে মোট ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের সম্পূর্ণ ৪৪ হাজার লিটার তেল চোরচক্রের মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়।

গোপন সিসিটিভি ফুটেজ ও অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা যায়, গত ৩০ মে ২০২৬ তারিখে গভীর রাতে টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর মাস্টার নজরুল ইসলাম নিজে পাহারা দিয়ে পাম্প মেশিনের মাধ্যমে চাঁদপুরের তেল ব্যবসায়ী সুমনের ট্যাঙ্কারে সরাসরি সরকারি ডিজেল পাচার করেন। সরকারি আইন অনুযায়ী ইঞ্জিন রুম ও জ্বালানির দায়িত্ব ড্রাইভারের হলেও মাস্টার নজরুল বেআইনিভাবে এই পাচার কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। ঘটনাটি জাহাজের কর্মচারীরা ধরে ফেললে তাদের ১১ লাখ টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয় এবং পরবর্তীতে ঘটনা চেপে রাখতে স্থানীয় ক্যাডার দিয়ে তাদের চাকরিচ্যুত ও স্থানান্তরের হুমকি প্রদান করা হয়।

সরকারি সম্পত্তি ও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল চুরির এই ঘটনায় যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাঁদপুর নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে স্বীকার করলেও বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মাস্টার নজরুল ইসলাম তেল চুরির বিষয়টি অস্বীকার করলেও ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন না করার জন্য অনুরোধ জানান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ দণ্ডবিধির (Penal Code) ৪০৯ ও ৩৮আই ধারায় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিআইডব্লিউটিএ-এর মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ভয়াবহ চুরি রোধে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মন্ত্রণালয়ের কঠোর আইনি পদক্ষেপ দাবি করছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দায়িত্ব বাড়ল দুই মন্ত্রীর

বিআইডব্লিউটিএতে ৪৪ হাজার লিটার তেল চুরি, মূলহোতা মাস্টার নজরুল

আপডেট সময় ০৩:২০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজের জ্বালানি তেল চুরি, ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি এবং ঠিকাদারি অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে আয়োজিত এই দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চাঁদপুর নদী বন্দরের টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ জাহাজের মাস্টার নজরুল ইসলাম এবং নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের চাঁদপুর কার্যালয়ের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খান।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান সরাসরি সরকারি ডিপো থেকে ডিজেল ও লুব-অয়েল ক্রয়ের নির্দেশ দেন। এ আদেশের আলোকেই চাঁদপুর ডিপো থেকে গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখ থেকে ধাপে ধাপে চার দফায় সর্বমোট ৪৪ হাজার লিটার ডিজেল ও লুব-অয়েল সংগ্রহ করা হয়।

কাগজে-কলমে এই জ্বালানি বিভিন্ন নৌযানে সরবরাহ দেখানো হলেও বাস্তবে তা সম্পূর্ণ ভুয়া বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে:

উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম: ৮,০০০ লিটার ডিজেল

ওয়ার্কবোট কপোত ও আড়িয়াল খাঁ: যথাক্রমে ৩,০০০ ও ৫,০০০ লিটার ডিজেল

টাগবোট দুর্দান্ত: ২৬,০০০ লিটার ডিজেল

এসএমবি-৩ মার্কিং বোট: ২,০০০ লিটার ডিজেল

অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত সময়ে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘রুস্তম’ বা টাগবোট ‘দুর্দান্ত’ কোনো প্রকার উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়নি। এমনকি এসএমবি-৩ বোটটি অলস বসিয়ে রেখে ভাড়াকৃত সাধারণ নৌকা দিয়ে মার্কিং কাজ পরিচালনা করা হয়, যার পেছনেও গত তিন মাসে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ভাড়া বিল দেখানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, প্রতি লিটার ৯৫ টাকা দরে মোট ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের সম্পূর্ণ ৪৪ হাজার লিটার তেল চোরচক্রের মাধ্যমে খোলা বাজারে বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়।

গোপন সিসিটিভি ফুটেজ ও অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা যায়, গত ৩০ মে ২০২৬ তারিখে গভীর রাতে টাগবোট ‘দুর্দান্ত’-এর মাস্টার নজরুল ইসলাম নিজে পাহারা দিয়ে পাম্প মেশিনের মাধ্যমে চাঁদপুরের তেল ব্যবসায়ী সুমনের ট্যাঙ্কারে সরাসরি সরকারি ডিজেল পাচার করেন। সরকারি আইন অনুযায়ী ইঞ্জিন রুম ও জ্বালানির দায়িত্ব ড্রাইভারের হলেও মাস্টার নজরুল বেআইনিভাবে এই পাচার কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। ঘটনাটি জাহাজের কর্মচারীরা ধরে ফেললে তাদের ১১ লাখ টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয় এবং পরবর্তীতে ঘটনা চেপে রাখতে স্থানীয় ক্যাডার দিয়ে তাদের চাকরিচ্যুত ও স্থানান্তরের হুমকি প্রদান করা হয়।

সরকারি সম্পত্তি ও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল চুরির এই ঘটনায় যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাঁদপুর নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ সবুর খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন বলে স্বীকার করলেও বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মাস্টার নজরুল ইসলাম তেল চুরির বিষয়টি অস্বীকার করলেও ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন না করার জন্য অনুরোধ জানান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ দণ্ডবিধির (Penal Code) ৪০৯ ও ৩৮আই ধারায় এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিআইডব্লিউটিএ-এর মতো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ভয়াবহ চুরি রোধে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মন্ত্রণালয়ের কঠোর আইনি পদক্ষেপ দাবি করছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজ।