ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
চলে গেলে কেউ দেবে না, তাই বিভিন্ন স্থাপনায় নিজের নাম দিচ্ছি: ট্রাম্প মরণফাঁদে কুমিল্লা সদরের রঘুপুর সড়ক, দুর্দশায় ১৩ হাজার মানুষ লং মার্চের নামে বিরোধী দল জ্বালানি অপচয় করছে : মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী দেশ গঠনে বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতি তারেক রহমানের চার বিশেষ আহ্বান রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে ডা. জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন পর্যটকের কাছ থেকে ৫০ টাকা আদায়, ৫ টাকার নির্দেশনা উপেক্ষা; ক্ষোভে দ্বীপবাসী সামান্য ভুলেও ১৫ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ মির্জাপুর ভূমি অফিসে রিনা রানীর দাপট, ঘুষ-নথি জালিয়াতির অভিযোগ ডেমরা রেজিস্ট্রি অফিসে তুহিন-সাজুর দাপট, প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অনিয়মের অভিযোগ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে পিআইবির ডিজি ফারুক ওয়াসিফের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন

গাজীপুরে সারের লাইসেন্স নিয়ে চলছে টানাটানি, ডিলার আছে নেই গোডাউন-দোকান

খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কত রকমের সংস্কারের কথা হচ্ছে, কাজ করছে কত কমিশন, কিন্তু কৃষি সংস্কারের কোনো আলোচনাই নেই। অথচ কৃষি খাত বহু কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। প্রতি বছর আমন মৌসুম ঘিরে মাঠ পর্যায়ে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ বেশ পুরোনো। একদল সার ডিলার এ সংকট সৃষ্টির নেপথ্যে কাজ করছে বছরের পর বছর। যার নেপথ্যে রয়েছে আওয়ামীপন্থী ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতা। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিএনপি-জামায়াতসহ নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতারাও। ফলে নতুন করে লাইসেন্স নিয়ে চলছে টানাটানি ও অতিরিক্ত দামে সার কিনতে গিয়ে বিপদে পড়ছে গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলার কৃষক।

তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার বদলের এক বছর হতে চললেও সারের বাজারের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ আওয়ামীলীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের হাতেই রয়ে গেছে। এসব ডিলারের অনেকে পালিয়ে বেড়ালেও তাদের লাইসেন্সের বিপরীতে সার বরাদ্দ থেমে নেই। কোনো কোনো আওয়ামীলীগ নেতার পরিবারের একাধিক সদস্যের নামেও আছে সারের লাইসেন্স। সেইসাথে এখন এসব লাইসেন্স নিয়ে টানাটানি করছে বিএনপি, জামায়াতসহ নতুন রাজনৈতিক দলের নেতারাও।

 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গাজীপুর জেলা সদর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ, শ্রীপুর, কালিয়াকৈরসহ সকল উপজেলায় সার নিয়ে ও সারের লাইসেন্স নিয়ে চলছে টানাটানি। কৃষকরা নিদিষ্ট সময়ে তাদের হাতে পাচ্ছেন না সার। অথচ কর্মকর্তারা বলছেন সার রয়েছে, সংকট নেই। নির্ধারিত ইউনিয়নে নিজস্ব গুদামে রেখে সার বিক্রি করার কথা ডিলারদের। কিন্তু এ জেলায় যেনও তা ভিন্ন। জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ডিলাররা সার মজুত করছেন উপজেলা পর্যায়ে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কেউ কেউ এসব সার বিক্রি করে দিচ্ছেন অন্য জায়গায় অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সার বিক্রি করা হচ্ছে গ্রামের কৃষকদের কাছে। প্রায় এক যুগ ধরে এমন অবস্থা চলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে গিয়ে কৃষককে বস্তাপ্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। বিষয়টি জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানলেও তারা পালন করছেন নিরব ভূমিকা। তাদের চোখের সামনেই অনেকেই আবার লাইসেন্স ছাড়া অবাধে বিক্রি করে যাচ্ছেন সার, বীজ ও কীটনাশক। সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, ইউনিয়নের জন্য নির্ধারিত সার ডিলার ওই ইউনিয়নে নিজস্ব গুদাম তৈরি করে সেখানে সার মজুত করবেন এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করবেন। কিন্তু এসব কাগজে-কলমে থাকলেও নেই বাস্তবে।

তথ্য বলছে, জেলার কাপাসিয়া উপজেলায় বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন ১৬ জন, বিএডিসি সার ডিলার ১৬ জন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা সার বিক্রেতা রয়েছেন প্রায় ১০০ জন। ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতারা কৃষকদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। এ উপজেলার অনেক ইউনিয়নে ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা সার বিক্রেতাদের চেনেন না কৃষকরা। কোনো কোনো জায়গায় খুচরা সার বিক্রেতাদের চিনলেও চেনেন না তাদের গোডাউন ও দোকান। তাদের সার কোথায় বিক্রি হয় এটাও জানেন না কৃষকরা। অথচ তারা লাইসেন্স দখল করে বছরের পর বছর কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সার তুলে নিজেরাই হচ্ছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এদিকে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা ও ডিএপি ২১ টাকা বিক্রির কথা থাকলেও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করছেন অতিরিক্ত দামে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক জানান, ইউনিয়নভিত্তিক ডিলার নিয়োগের নিয়ম থাকলেও এ উপজেলায় অনেক ডিলার আছেন যারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। ফলে তারা উপজেলা শহর বা অন্য এলাকায় থেকে ব্যবসা চালিয়ে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছেন। অনেক খুচরা বিক্রেতা আছে যারা সার দোকানে রাখেন না, অন্যত্র রেখে তা বেশি টাকায় বিক্রি করেন। ফলে আমরা পড়েছি বিপাকে। একদিকে বেশি দাম, অন্যদিকে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ব্যয় করে সার আনতে হচ্ছে অন্য জায়গা থেকে। আবার লাইসেন্স ছাড়াই এ উপজেলায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে সার, বীজ ও কীটনাশক। দাম নিচ্ছেন চড়া দিচ্ছেন নিম্নমানের বীজ ও কীটনাশক এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি আমরা। এসব বিষয়ে বার বার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বলা হলেও তারা দেখছি বলে বিষয়গুলো এড়িয়ে যান।

সূত্র বলছে, সারাদেশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সারের ডিলার আছেন ৭ হাজার ১৫০ জন। এর মধ্যে বিএডিসি অনুমোদিত ৫ হাজার ২২ জন এবং বিসিআইসির ২ হাজার ১১৮ জন। এসব ডিলার অধিকাংশই আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পেয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএডিসি নন-ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের জোগান দিয়ে থাকে। বিএডিসির পাশাপাশি নন-ইউরিয়া সার আসে বেসরকারি আমদানিকারকের মাধ্যমেও। স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে ইউরিয়ার জোগান দেয় বিসিআইসি। বর্তমানে বিএডিসি ও বিসিআইসি আলাদা সংস্থা হলেও তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দুই সংস্থার ডিলারদের আলাদা বরাদ্দ থাকায় কৃষককে দুই দোকানে ঘুরতে হয়। আবার দুই সংস্থাই ডিলার নিয়োগ করে।

স্থানীয় কৃষি বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু বিএডিসির হাতেই ডিলার নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিবেচনায় সারের লাইসেন্স প্রদান করা হলে, যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করা হতে পারে। লাইসেন্স প্রদানে দুর্নীতি বা অনিয়ম হলে, প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স পেতে সমস্যায় পড়েন এ বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। লাইসেন্স যেনও এমন ব্যক্তির হাতে যায় যিনি কৃষির সাথে কাজ করেন।

 

জেলার বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিসের কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, আগে সারের লাইসেন্স পেতে তদবির করতো আওয়ামীলীগের নেতারা আর এখন তদবির করছে স্থানীয় কিছু বিএনপি-জামায়াতসহ নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের লাইসেন্স দেয়ার জন্য সুপারিশ করছে কিংবা নিজেরাই ব্যবসার জন্য লাইসেন্স চাচ্ছে।

এদিকে, বিসিআইসির ডিলারদের লাইসেন্স নবায়নের সময় বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে, এ সনদের পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে সিন্ডিকেট। এ পরিস্থিতিতে বিএডিসি ও বিসিআইসির আলাদা নীতিমালা এক করে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ডিলারদের তথ্য চেয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ১০ আগস্টের মধ্যে চাওয়া হয়েছে উপজেলা ও জেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির মতামত। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সব ডিলারের তথ্য হালনাগাদ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সার বিতরণ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি যথেষ্ট কঠোর নয়। ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় খেয়াল-খুশিমতো সার মজুত ও বিক্রির সুযোগ থাকায় কৃষক যথাসময়ে ন্যায্য দামে সার পান না। এতে কৃষি উৎপাদনে পরিবর্তন ঘটে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। অবৈধ মজুতদারির প্রভাবে সারের বাজারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতি শুধু কৃষকেরই হয় না, দেশেরও ক্ষতি হয়। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসগুলোকে কঠোর অবস্থান নিয়ে কাজ করতে হবে এবং সার নিয়ে অনিয়ম রোধে কঠোর হতে হবে। ডিলারদের সরবরাহ ও বিক্রির প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত। তারা আরো বলেন, স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের আরও তৎপর হতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। স্থানীয় কৃষকের সরাসরি অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। সার নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা লাইসেন্স নিয়ে বসে আছে অথচ কৃষকরা সার পাচ্ছেন না তাদের বিরুদ্ধে সবার আগে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এসব বিষয় নিয়ে এ প্রতিবেদকের সাথে জেলার উপজেলা কৃষি অফিসগুলোর কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।

গাজীপুর জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্তরা প্রভাব খাটিয়ে ২০০৯ সাল থেকে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ব্যবসা করে আসছেন। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেছি কিন্তু তারা নানাভাবে তাদের এসব কার্যক্রম চালাতেন। বর্তমানে এসবের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলার সকল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চলে গেলে কেউ দেবে না, তাই বিভিন্ন স্থাপনায় নিজের নাম দিচ্ছি: ট্রাম্প

গাজীপুরে সারের লাইসেন্স নিয়ে চলছে টানাটানি, ডিলার আছে নেই গোডাউন-দোকান

আপডেট সময় ০১:২২:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ অগাস্ট ২০২৫

খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কত রকমের সংস্কারের কথা হচ্ছে, কাজ করছে কত কমিশন, কিন্তু কৃষি সংস্কারের কোনো আলোচনাই নেই। অথচ কৃষি খাত বহু কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। প্রতি বছর আমন মৌসুম ঘিরে মাঠ পর্যায়ে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ বেশ পুরোনো। একদল সার ডিলার এ সংকট সৃষ্টির নেপথ্যে কাজ করছে বছরের পর বছর। যার নেপথ্যে রয়েছে আওয়ামীপন্থী ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতা। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিএনপি-জামায়াতসহ নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতারাও। ফলে নতুন করে লাইসেন্স নিয়ে চলছে টানাটানি ও অতিরিক্ত দামে সার কিনতে গিয়ে বিপদে পড়ছে গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলার কৃষক।

তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার বদলের এক বছর হতে চললেও সারের বাজারের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ আওয়ামীলীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের হাতেই রয়ে গেছে। এসব ডিলারের অনেকে পালিয়ে বেড়ালেও তাদের লাইসেন্সের বিপরীতে সার বরাদ্দ থেমে নেই। কোনো কোনো আওয়ামীলীগ নেতার পরিবারের একাধিক সদস্যের নামেও আছে সারের লাইসেন্স। সেইসাথে এখন এসব লাইসেন্স নিয়ে টানাটানি করছে বিএনপি, জামায়াতসহ নতুন রাজনৈতিক দলের নেতারাও।

 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গাজীপুর জেলা সদর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ, শ্রীপুর, কালিয়াকৈরসহ সকল উপজেলায় সার নিয়ে ও সারের লাইসেন্স নিয়ে চলছে টানাটানি। কৃষকরা নিদিষ্ট সময়ে তাদের হাতে পাচ্ছেন না সার। অথচ কর্মকর্তারা বলছেন সার রয়েছে, সংকট নেই। নির্ধারিত ইউনিয়নে নিজস্ব গুদামে রেখে সার বিক্রি করার কথা ডিলারদের। কিন্তু এ জেলায় যেনও তা ভিন্ন। জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ডিলাররা সার মজুত করছেন উপজেলা পর্যায়ে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কেউ কেউ এসব সার বিক্রি করে দিচ্ছেন অন্য জায়গায় অথবা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সার বিক্রি করা হচ্ছে গ্রামের কৃষকদের কাছে। প্রায় এক যুগ ধরে এমন অবস্থা চলায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে গিয়ে কৃষককে বস্তাপ্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। বিষয়টি জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানলেও তারা পালন করছেন নিরব ভূমিকা। তাদের চোখের সামনেই অনেকেই আবার লাইসেন্স ছাড়া অবাধে বিক্রি করে যাচ্ছেন সার, বীজ ও কীটনাশক। সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, ইউনিয়নের জন্য নির্ধারিত সার ডিলার ওই ইউনিয়নে নিজস্ব গুদাম তৈরি করে সেখানে সার মজুত করবেন এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করবেন। কিন্তু এসব কাগজে-কলমে থাকলেও নেই বাস্তবে।

তথ্য বলছে, জেলার কাপাসিয়া উপজেলায় বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন ১৬ জন, বিএডিসি সার ডিলার ১৬ জন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা সার বিক্রেতা রয়েছেন প্রায় ১০০ জন। ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতারা কৃষকদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা। এ উপজেলার অনেক ইউনিয়নে ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা সার বিক্রেতাদের চেনেন না কৃষকরা। কোনো কোনো জায়গায় খুচরা সার বিক্রেতাদের চিনলেও চেনেন না তাদের গোডাউন ও দোকান। তাদের সার কোথায় বিক্রি হয় এটাও জানেন না কৃষকরা। অথচ তারা লাইসেন্স দখল করে বছরের পর বছর কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সার তুলে নিজেরাই হচ্ছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ। এদিকে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা ও ডিএপি ২১ টাকা বিক্রির কথা থাকলেও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করছেন অতিরিক্ত দামে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক জানান, ইউনিয়নভিত্তিক ডিলার নিয়োগের নিয়ম থাকলেও এ উপজেলায় অনেক ডিলার আছেন যারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। ফলে তারা উপজেলা শহর বা অন্য এলাকায় থেকে ব্যবসা চালিয়ে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছেন। অনেক খুচরা বিক্রেতা আছে যারা সার দোকানে রাখেন না, অন্যত্র রেখে তা বেশি টাকায় বিক্রি করেন। ফলে আমরা পড়েছি বিপাকে। একদিকে বেশি দাম, অন্যদিকে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ব্যয় করে সার আনতে হচ্ছে অন্য জায়গা থেকে। আবার লাইসেন্স ছাড়াই এ উপজেলায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে সার, বীজ ও কীটনাশক। দাম নিচ্ছেন চড়া দিচ্ছেন নিম্নমানের বীজ ও কীটনাশক এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি আমরা। এসব বিষয়ে বার বার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বলা হলেও তারা দেখছি বলে বিষয়গুলো এড়িয়ে যান।

সূত্র বলছে, সারাদেশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সারের ডিলার আছেন ৭ হাজার ১৫০ জন। এর মধ্যে বিএডিসি অনুমোদিত ৫ হাজার ২২ জন এবং বিসিআইসির ২ হাজার ১১৮ জন। এসব ডিলার অধিকাংশই আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পেয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএডিসি নন-ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের জোগান দিয়ে থাকে। বিএডিসির পাশাপাশি নন-ইউরিয়া সার আসে বেসরকারি আমদানিকারকের মাধ্যমেও। স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে ইউরিয়ার জোগান দেয় বিসিআইসি। বর্তমানে বিএডিসি ও বিসিআইসি আলাদা সংস্থা হলেও তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দুই সংস্থার ডিলারদের আলাদা বরাদ্দ থাকায় কৃষককে দুই দোকানে ঘুরতে হয়। আবার দুই সংস্থাই ডিলার নিয়োগ করে।

স্থানীয় কৃষি বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু বিএডিসির হাতেই ডিলার নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বিবেচনায় সারের লাইসেন্স প্রদান করা হলে, যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করা হতে পারে। লাইসেন্স প্রদানে দুর্নীতি বা অনিয়ম হলে, প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স পেতে সমস্যায় পড়েন এ বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। লাইসেন্স যেনও এমন ব্যক্তির হাতে যায় যিনি কৃষির সাথে কাজ করেন।

 

জেলার বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিসের কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, আগে সারের লাইসেন্স পেতে তদবির করতো আওয়ামীলীগের নেতারা আর এখন তদবির করছে স্থানীয় কিছু বিএনপি-জামায়াতসহ নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের লাইসেন্স দেয়ার জন্য সুপারিশ করছে কিংবা নিজেরাই ব্যবসার জন্য লাইসেন্স চাচ্ছে।

এদিকে, বিসিআইসির ডিলারদের লাইসেন্স নবায়নের সময় বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে, এ সনদের পেছনে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে সিন্ডিকেট। এ পরিস্থিতিতে বিএডিসি ও বিসিআইসির আলাদা নীতিমালা এক করে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ডিলারদের তথ্য চেয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ১০ আগস্টের মধ্যে চাওয়া হয়েছে উপজেলা ও জেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির মতামত। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সব ডিলারের তথ্য হালনাগাদ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সার বিতরণ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি যথেষ্ট কঠোর নয়। ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় খেয়াল-খুশিমতো সার মজুত ও বিক্রির সুযোগ থাকায় কৃষক যথাসময়ে ন্যায্য দামে সার পান না। এতে কৃষি উৎপাদনে পরিবর্তন ঘটে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। অবৈধ মজুতদারির প্রভাবে সারের বাজারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতি শুধু কৃষকেরই হয় না, দেশেরও ক্ষতি হয়। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসগুলোকে কঠোর অবস্থান নিয়ে কাজ করতে হবে এবং সার নিয়ে অনিয়ম রোধে কঠোর হতে হবে। ডিলারদের সরবরাহ ও বিক্রির প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত। তারা আরো বলেন, স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের আরও তৎপর হতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। স্থানীয় কৃষকের সরাসরি অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। সার নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা লাইসেন্স নিয়ে বসে আছে অথচ কৃষকরা সার পাচ্ছেন না তাদের বিরুদ্ধে সবার আগে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এসব বিষয় নিয়ে এ প্রতিবেদকের সাথে জেলার উপজেলা কৃষি অফিসগুলোর কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি।

গাজীপুর জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্তরা প্রভাব খাটিয়ে ২০০৯ সাল থেকে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ব্যবসা করে আসছেন। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেছি কিন্তু তারা নানাভাবে তাদের এসব কার্যক্রম চালাতেন। বর্তমানে এসবের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলার সকল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।