ঢাকা ০৬:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৬৯ বছরেও মেলেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড, ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন পরীমণির সঙ্গে কী ঘটেছিল, জানালেন হেনস্তার শিকার সেই সাংবাদিক! সীমান্তের কাঁটাতারে ৫০ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন বাবা-মেয়ে, দেখা হলো শেষ বিদায়ে এক্সপ্রেসওয়ের ক্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল প্রকৌশলীর, পিতৃহারা শিশুর দায়িত্ব নেবে কে? অনিয়ম-দুর্নীতি-করদাতাদের সাথে আঁতাত, সবকিছুতেই সর্বেসর্বা কর কমিশনার মুরাদ পবিত্র মদিনা লক্ষ্য করে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চট্টগ্রামে রেলের ৬৫ লাখ টাকার দরপত্র জালিয়াতির তদন্তে গড়িমসি, সময়সীমা জানেন না জিএম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র: স্পিকার বরিশাল বিআরটিএতে সৌরভ সাহার দাপট, দালাল সিন্ডিকেটে জমজমাট লাইসেন্স বাণিজ্য ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নতুন আশার আলো সালাউদ্দিন তিতু

৬৯ বছরেও মেলেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড, ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন

বয়স ৬৯ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জোটেনি সরকারি বয়স্ক ভাতার কার্ড। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে খড়, গোলপাতা ও মরিচা ধরা পুরোনো টিনে তৈরি একটি জরাজীর্ণ ঘর। বৃষ্টি হলেই ছাউনি চুঁইয়ে পানি পড়ে। সেই ঘরেই স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমানের। তাঁর স্বামী শামছুর রহমান গাজীও পাননি বয়স্ক ভাতার কার্ড। স্বামীর ভিক্ষার টাকায় কোনো রকমে চলে তাঁদের সংসার। এমন অসহায় অবস্থায় বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার জন্য ৩ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ করেছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম সরদারের বিরুদ্ধে।

ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমানের বাড়ি উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ছোটভেটখালী গ্রামে। তাঁর অভিযোগ, বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য তিনি একাধিকবার ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর আলম সরদারের কাছে গিয়েছেন। অনলাইনে আবেদন করার কথা বলে ওই সদস্য তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে ২০০ টাকা নেন। পরে কার্ড করে দেওয়ার জন্য আরও ৩ হাজার টাকা দাবি করেন ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম সরদার।

ছকিনা খাতুন বলেন, টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই জানালে ইউপি সদস্য তাঁকে বলেন, “আমি কি জমি বিক্রি করে তোমার কার্ড করে দেব? তিন হাজার টাকা লাগবে, না হলে কাগজপত্র নিয়ে যাও।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম সরদার বলেন, “কার্ড করে দেওয়ার জন্য আমি তাঁর কাছে টাকা চাইনি। অনলাইনে করার খরচের জন্য টাকা নিয়েছিলাম।” এ বিষয়ে প্রতিবেদককে কিছু জানাতে তিনি বাধ্য নন বলেও মন্তব্য করেন।

ছকিনা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী মো. শামছুর রহমান গাজী এলাকায় ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই দুজনের সংসার চলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতেও তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ভাতার কার্ডের জন্য টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁদের নেই।

ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “আমার বয়স ৬৯ বছর। আমি গরিব মানুষ, থাকার মতো একটি ভালো ঘরও নেই। স্বামী ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়ে সংসার চলে না। কার্ড করার জন্য টাকা কোথায় পাব?”

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হযরত আলী বলেন, ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমান অত্যন্ত অসহায় ও দরিদ্র। ভাঙা ঘরে বসবাস করেন। বর্ষা এলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। স্বামীর ভিক্ষার টাকায় কোনো রকমে তাঁদের দিন কাটে। এই বয়সে তাঁর একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড ও নিরাপদ বাসস্থান প্রয়োজন।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. নুরুজ্জামান গাজী বলেন, ৬৯ বছর বয়সেও ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমান সরকারি বয়স্ক ভাতার কার্ড পাননি। তাঁদের বসবাসের ঘরটিও অত্যন্ত নাজুক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন আর্থিক অবস্থা যাচাই করে সরকারি ভাতা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন।

এলাকাবাসী বলেন, ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমানের বসবাসের ঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। খড় ও গোলপাতার ছাউনির ওপর বসানো কয়েকটি পুরোনো টিনও নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের বেড়া গোলপাতার তৈরি। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। ঝড়-বৃষ্টির সময় নিরাপদে থাকার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই স্বামীকে নিয়ে দিন কাটছে তাঁর। স্বামীর ভিক্ষার টাকায় অত্যন্ত কষ্টে সংসার চলে তাঁদের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন তাঁদের একটি ঘর ও বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করে দেন।

ছকিনা খাতুনের দাবি, জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত নিরাপদ ঘরে কাটাতে চান তিনি। পাশাপাশি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্য সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাঁর আর্থিক অবস্থা যাচাই করে বয়স্ক ভাতার যোগ্যতা নির্ধারণ এবং নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা সমাজসেবা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর উদ্যোগ চান তিনি।

এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “উনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমার কার্যালয়ে জমা দিলে বয়স্ক ভাতার কার্ডের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, “ওনাকে আমার কার্যালয় বরাবর একটি লিখিত আবেদন করতে বলুন। সরকারি নীতিমালার আওতায় ওনাকে যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করব।”

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৬৯ বছরেও মেলেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড, ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন

৬৯ বছরেও মেলেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড, ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন

আপডেট সময় ০৬:১১:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

বয়স ৬৯ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও জোটেনি সরকারি বয়স্ক ভাতার কার্ড। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে খড়, গোলপাতা ও মরিচা ধরা পুরোনো টিনে তৈরি একটি জরাজীর্ণ ঘর। বৃষ্টি হলেই ছাউনি চুঁইয়ে পানি পড়ে। সেই ঘরেই স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমানের। তাঁর স্বামী শামছুর রহমান গাজীও পাননি বয়স্ক ভাতার কার্ড। স্বামীর ভিক্ষার টাকায় কোনো রকমে চলে তাঁদের সংসার। এমন অসহায় অবস্থায় বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার জন্য ৩ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ করেছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম সরদারের বিরুদ্ধে।

ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমানের বাড়ি উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ছোটভেটখালী গ্রামে। তাঁর অভিযোগ, বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য তিনি একাধিকবার ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর আলম সরদারের কাছে গিয়েছেন। অনলাইনে আবেদন করার কথা বলে ওই সদস্য তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে ২০০ টাকা নেন। পরে কার্ড করে দেওয়ার জন্য আরও ৩ হাজার টাকা দাবি করেন ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম সরদার।

ছকিনা খাতুন বলেন, টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই জানালে ইউপি সদস্য তাঁকে বলেন, “আমি কি জমি বিক্রি করে তোমার কার্ড করে দেব? তিন হাজার টাকা লাগবে, না হলে কাগজপত্র নিয়ে যাও।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম সরদার বলেন, “কার্ড করে দেওয়ার জন্য আমি তাঁর কাছে টাকা চাইনি। অনলাইনে করার খরচের জন্য টাকা নিয়েছিলাম।” এ বিষয়ে প্রতিবেদককে কিছু জানাতে তিনি বাধ্য নন বলেও মন্তব্য করেন।

ছকিনা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী মো. শামছুর রহমান গাজী এলাকায় ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই দুজনের সংসার চলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতেও তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ভাতার কার্ডের জন্য টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁদের নেই।

ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “আমার বয়স ৬৯ বছর। আমি গরিব মানুষ, থাকার মতো একটি ভালো ঘরও নেই। স্বামী ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়ে সংসার চলে না। কার্ড করার জন্য টাকা কোথায় পাব?”

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হযরত আলী বলেন, ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমান অত্যন্ত অসহায় ও দরিদ্র। ভাঙা ঘরে বসবাস করেন। বর্ষা এলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। স্বামীর ভিক্ষার টাকায় কোনো রকমে তাঁদের দিন কাটে। এই বয়সে তাঁর একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড ও নিরাপদ বাসস্থান প্রয়োজন।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মো. নুরুজ্জামান গাজী বলেন, ৬৯ বছর বয়সেও ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমান সরকারি বয়স্ক ভাতার কার্ড পাননি। তাঁদের বসবাসের ঘরটিও অত্যন্ত নাজুক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন আর্থিক অবস্থা যাচাই করে সরকারি ভাতা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন।

এলাকাবাসী বলেন, ছকিনা খাতুন ও শামছুর রহমানের বসবাসের ঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। খড় ও গোলপাতার ছাউনির ওপর বসানো কয়েকটি পুরোনো টিনও নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের বেড়া গোলপাতার তৈরি। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। ঝড়-বৃষ্টির সময় নিরাপদে থাকার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ঘরেই স্বামীকে নিয়ে দিন কাটছে তাঁর। স্বামীর ভিক্ষার টাকায় অত্যন্ত কষ্টে সংসার চলে তাঁদের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন তাঁদের একটি ঘর ও বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করে দেন।

ছকিনা খাতুনের দাবি, জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত নিরাপদ ঘরে কাটাতে চান তিনি। পাশাপাশি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রাপ্য সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাঁর আর্থিক অবস্থা যাচাই করে বয়স্ক ভাতার যোগ্যতা নির্ধারণ এবং নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা সমাজসেবা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর উদ্যোগ চান তিনি।

এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “উনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমার কার্যালয়ে জমা দিলে বয়স্ক ভাতার কার্ডের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, “ওনাকে আমার কার্যালয় বরাবর একটি লিখিত আবেদন করতে বলুন। সরকারি নীতিমালার আওতায় ওনাকে যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করব।”