স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্ত্রীকে নিজের আওতাধীন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক মো. আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে। সরকারি চাকরিবিধি স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করার পরও এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে অভিনব পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে বলে ওয়াসাসংশ্লিষ্টদের দাবি। দেড় বছর আগে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি দীর্ঘ সময়েও কোনো রিপোর্ট জমা না দেওয়ায় বর্তমানে খোদ ‘তদন্ত কমিটির ভূমিকা নিয়েই নতুন তদন্ত কমিটি’ গঠনের দাবি তুলেছেন ওয়াসার ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করে ঠিকাদারি ব্যবসা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মো. আব্দুল মজিদ যখন ওয়াসা মডস্ সার্কেল-১ এ কর্মরত ছিলেন, ঠিক সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে বেআইনিভাবে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। তাঁর স্ত্রী তামান্না শারমিন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আইনি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ‘প্রিমিয়াম কোয়ালিটি’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন।
যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (জয়েন্ট স্টক) নিবন্ধনের সময় তামান্না শারমিন তাঁর সরকারি চাকরির তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, নিবন্ধনের জন্য জমা দেওয়া নথিপত্রে স্ত্রীর অফিসের ঠিকানার বিপরীতে স্বয়ন প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ নিজে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। নথিপত্রে উভয়েই তাঁদের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেন— ১০/সি, অনামিকা কনকর্ড, ৫৮৩ রোকেয়া সরণি, শেওড়াপাড়া, মিরপুর।
চাকরিবিধি লঙ্ঘন ও তড়িঘড়ি মালিকানা হস্তান্তর
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল কোনো ব্যক্তি সরকারের কোনো ঠিকাদারি, ব্যবসা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন না। চাকরিবিধির এই বিধিনিষেধ অমান্য করা এবং অসদাচরণের দায় প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ঘটনাটি জনসমক্ষে চলে আসা এবং গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর নিজের অপকর্ম ঢাকতে তামান্না শারমিন তড়িঘড়ি করে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির মালিকানা থেকে তাঁর নাম প্রত্যাহার করে নেন।
দেড় বছরেও জমা হয়নি ১০ দিনের তদন্ত প্রতিবেদন
অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিস্তারিত জানাজানি হওয়ার পর গত বছরের ১৯ মার্চ ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সিনিয়র সহকারী সচিব রাসেদুজ্জামানকে আহ্বায়ক, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিব আহমেদকে সদস্য এবং শ্রম ও কল্যাণ বিভাগের উপ-সচিব নুরুজ্জামান মিয়াজিকে সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হলেও দেড় বছর পার হয়ে গেলেও সেই তদন্তের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট না দেওয়া এবং ধীরগতির এই প্রক্রিয়াকে ওয়াসার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিগ্রস্ত বলয়কে সুরক্ষার সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলে এখনো প্রভাবশালী
ঢাকা ওয়াসার নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রেখেছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি চতুরতার সাথে নতুন রাজনৈতিক ছত্রছায়া খোঁজার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার নিকটাত্মীয় পরিচয়ে নিজের অনিয়ম-দুর্নীতি ধামাচাপা দিয়ে বহাল তবিয়তে ওয়াসা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াসাজুড়ে চরম ক্ষোভ ও আইনি ব্যবস্থার দাবি
ঢাকা ওয়াসায় প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং রহস্যজনকভাবে তদন্ত আটকে রাখার এই সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে পদে থেকে স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির মতো সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ওয়াসার সাধারণ কর্মকর্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে বিশ্বাসীদের মতে, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দ্রুত তদন্তের স্থবিরতা কাটাতে হবে। তারা বলছেন, দুর্নীতির আশ্রয়দাতা ও অপরাধী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ওয়াসার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















