বেতন সমতাকরণে ৮ লাখ, বিদ্যালয় মেরামতে ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের দাবি; তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের বেতন সমতাকরণের নামে অর্থ আদায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয় মেরামতের বরাদ্দ থেকে অর্থ কেটে নেওয়া, সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সাংবাদিকতা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না থাকা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের মতো একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বেতন সমতাকরণের নামে ৮ লাখ ৮ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ
ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষকের অভিযোগ, বেতন সমতাকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলে ১৪৩ জন শিক্ষকের কাছ থেকে মোট ৮ লাখ ৮ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় (এজি অফিস) এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘুষ দেওয়ার কথা বলে এই অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৩ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ৩১ জন শিক্ষকের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা করে ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, ২০১০ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ৫০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২০১১ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত সাতজনের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা এবং ২০১২ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ৫৫ জনের কাছ থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
এ ঘটনায় নন্দীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম মাওলা বাবু, এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুর হোসেন সুমন, উত্তর জয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোকারম হোসেন, খাজুরিয়া সর্দারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাহাব উদ্দিন, কালারাইতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক গোলাম কিবরিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটি মেসেজিং গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে শিক্ষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত অর্থ সংগ্রহ করেছেন। গ্রুপের বার্তা ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করা গেলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে অর্থ আদায়ের পেছনে কারা জড়িত, টাকা কোথায় ব্যয় হয়েছে এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কি না, তা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩ বিদ্যালয়ের বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সেনবাগ উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মেরামতের জন্য সরকার ৮১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৩৯ টাকা বরাদ্দ দেয় বলে সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২২ মে ২০২৫ তারিখে ২৫টি বিদ্যালয়ের মেরামতকাজের জন্য কোটেশন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এসব কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫৬ লাখ ৭ হাজার ৮৫১ টাকা ৮৭ পয়সা। অন্যদিকে, দেড় লাখ টাকার নিচে বরাদ্দের ১৮টি বিদ্যালয়ের জন্য মোট ২৫ লাখ ৬৬ হাজার ৮৭ টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোটেশন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করে কয়েকজন শিক্ষক তাঁদের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তার করেন। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৫টি বিদ্যালয়ের মেরামতকাজের অর্থ থেকে ভ্যাট কর্তনের পর আরও ৩০ শতাংশ অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৯৪ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২৫টি বিদ্যালয় থেকে আরও তিন লাখ টাকা এবং ১৮টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আরও এক লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ, ঠিকাদারি নথি, ভ্যাট-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া মেরামতকাজ সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ভিত্তিক বরাদ্দ ও অর্থ কর্তনের হিসাব নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিদ্যালয়ের বরাদ্দ, ভ্যাট কর্তন, কথিত ৩০ শতাংশ অর্থ গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের হাতে অবশিষ্ট অর্থের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- পদুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৯৮ টাকা ৪২ পয়সা। অভিযোগ অনুযায়ী, ২৮ হাজার ৩৮৯ টাকা ভ্যাট কর্তন এবং ৪১ হাজার ৫৮২ টাকা নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের জন্য ৯৭ হাজার ২৫ টাকা অবশিষ্ট থাকে।
- খাজুরিয়া সর্দারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৩৭ টাকা ৮৮ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ২৫ হাজার ৭৬১ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৩৭ হাজার ৭৩২ টাকা। বিদ্যালয়ের জন্য ৮৮ হাজার ৪২ টাকা অবশিষ্ট থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
- সিলোনীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৩৭ টাকা ৮৮ পয়সা। অভিযোগে একই পরিমাণ অর্থ কর্তনের কথা বলা হয়েছে।
- পশ্চিম জিরুয়া আকবরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ৩ লাখ ৮৩ হাজার ২০০ টাকা ৬২ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ৫৫ হাজার ১৪৪ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৯৫ হাজার ৪১৬ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- বাবুপুর শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ৭ লাখ ১১ হাজার ৫৬৫ টাকা ৩০ পয়সা। অভিযোগে ৮১ হাজার ৪৩০ টাকা ভ্যাট এবং ১ লাখ ১৯ হাজার ২৭১ টাকা কর্তনের কথা বলা হয়েছে।
- ছাতারপাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৩৭ টাকা ৮৮ পয়সা। ভ্যাট ও কথিত অর্থ কর্তনের পর বিদ্যালয়ের জন্য ৮৮ হাজার ৪২ টাকা অবশিষ্ট থাকার দাবি করা হয়েছে।
- চিলাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ৫ লাখ ২৭ হাজার ২৮৮ টাকা ৩২ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ৬৪ হাজার ৯০ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৯৩ হাজার ৮৭৩ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- কালারাইতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ২ লাখ ১৩ হাজার ৬২৪ টাকা ৭০ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ৩৬ হাজার ৩১৬ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৫৩ হাজার ১৯২ টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
- আটিয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৬৮ টাকা ১৫ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ২৭ হাজার ৭৫ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৩৯ হাজার ৬৯৭ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- মইশাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৩৭ টাকা ৮৮ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ২৫ হাজার ৭৬১ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৩৭ হাজার ৭৩২ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
- পরীকোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৩ টাকা ৮২ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ৩৯ হাজার ২৭৫ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৫৭ হাজার ৫২৭ টাকা বলে উল্লেখ রয়েছে।
- নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: বরাদ্দ ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৯৯ টাকা ৬২ পয়সা। ভ্যাট কর্তন ২৯ হাজার ১৭৮ টাকা এবং কথিত ৩০ শতাংশ কর্তন ৪২ হাজার ৭২৮ টাকা বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া মুটবী, চাঁদপুর, উত্তর অর্জুনতলা, শায়েস্তানগর, নাজিরনগর, উত্তর গোরকাটা, উত্তর মোহাম্মদপুর, উত্তর সাহাপুর, ডোমনাকান্দি, পূর্ব ইয়ারপুর, বালিয়াকান্দি, সাদেকপুর ও ইদিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ ও অর্থ কর্তনের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব হিসাবের কয়েকটি অঙ্কের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। তাই প্রকাশের আগে মূল বরাদ্দপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভ্যাটের চালান, বিল-ভাউচার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে প্রতিটি অঙ্ক মিলিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাবকে যাচাইকৃত সরকারি হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভা পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সেনবাগ উপজেলার ১১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সভায় এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুর হোসেন সুমন সভা পরিচালনা করেন এবং একপর্যায়ে বেতন সমতাকরণে অর্থ আদায় নিয়ে একজন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই প্রধান শিক্ষককে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এরফানুল হক চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ সময়ের বিতর্কের মধ্যে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরীর কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ওই দিন কয়েকজন সহকারী শিক্ষক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা না করে সমন্বয় সভায় অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রধান শিক্ষক। তাঁদের দাবি, এর ফলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হয়।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সভার কার্যবিবরণী, উপস্থিতির তালিকা, বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা এবং শ্রেণি কার্যক্রমের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সাংবাদিকতার অভিযোগ
খাজুরিয়া সর্দারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাখাওয়াত উল্যা এবং এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুর হোসেন সুমনের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির পাশাপাশি সাংবাদিকতা করার অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা যথাক্রমে সেনবাগ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সহসভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিক এম এ আউয়াল ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলম চৌধুরী ৬ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত শেষে ১৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে প্রতিবেদন দাখিল করা হয় এবং দুই শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নং ১৫১ ও ১৫২ দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা ১৯১১ ও ১৯১২ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে ৩১ আগস্ট শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য তাঁদের চিঠি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে বিভাগীয় মামলার বর্তমান অবস্থা, শুনানির ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারি চাকরিবিধি ও প্রযোজ্য নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁদের সাংবাদিকতার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রশাসনের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
বদলির আদেশ বাতিল ও কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ না করে ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার ঘটনায় সারা দেশের ৪১ জন শিক্ষককে বিভাগীয় বদলি করা হয়। তাঁদের মধ্যে সেনবাগের তিন শিক্ষক গোলাম মাওলা বাবু, নুর হোসেন সুমন ও সাহাব উদ্দিন ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের আগের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত না করে উপজেলা সদরের সমিতি কার্যালয়ে সময় কাটানো, শ্রেণি কার্যক্রমে অনিয়মিত থাকা এবং অন্য শিক্ষকের মাধ্যমে হাজিরা ব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আকস্মিক পরিদর্শন, উপস্থিতি রেজিস্টার, পাঠদানসূচি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বদলি নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বদলি-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, কর্মস্থলে যোগদানের পর নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগে বদলির সুপারিশ করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তিন বছর পূর্ণ না হওয়া কয়েকজন শিক্ষকের বদলির সুপারিশ করা হয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরী এ বিষয়ে বলেছেন, সেনবাগে যোগদানের পর তাঁর কর্মকাল তখনো ২০ দিন পূর্ণ হয়নি। বেতন সমতাকরণে অর্থ আদায় ও বিদ্যালয় মেরামতের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। নিয়ম অনুযায়ী বদলির সুপারিশ করা হয়েছে এবং কয়েকজন শিক্ষকের সুপারিশ অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইশরাত নাসিমা হাবীব এর আগে বলেছেন, নীতিমালাবহির্ভূত কোনো কাজে শিক্ষকরা জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য ও বিভাগীয় মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিদ্যালয় মেরামতের বরাদ্দ এবং বেতন সমতাকরণে অর্থ আদায়ের অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা জরুরি।
সচেতন মহলের দাবি, বেতন সমতাকরণের নামে অর্থ আদায়, বিদ্যালয় মেরামতের বরাদ্দের ব্যবহার, শিক্ষকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, পাঠদান কার্যক্রম এবং বদলি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের ভিত্তি। এ খাতে অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষিত থাকলে শিক্ষার পরিবেশ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সেনবাগ প্রতিনিধি 























