ঢাকা ০২:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও হরি লুট: অনিয়মের শীর্ষে আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীন

বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে একের পর এক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও ভেতরে ভেতরে চলে দুর্নীতির মহোৎসব। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট সেতু এবং সিডিআরপির মতো বহুল আলোচিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোতে দরপত্র মূল্যায়নে অভূতপূর্ব জালিয়াতি, গুরুতর অডিট আপত্তি ধামাচাপা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ভূমি দখলের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রেলওয়ের দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তা—অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীনের নাম। রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে রেলের খাত থেকে অর্থ লোপাটের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

 

যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার ভয়াবহ অডিট আপত্তি

জাপানি অর্থায়ন সংস্থা জাইকার তহবিলে নির্মিত যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে মহা-অনিয়মের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায়। ওই অডিট প্রতিবেদনে মোট ৩৪টি গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে, যেখানে সরাসরি ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, দরপত্র মূল্যায়নের সময় কারিগরি ও সামর্থ্যের দিক থেকে অযোগ্য ও বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে মূল শর্তাবলী পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের লিখিত আপত্তি উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান নিজের হাতে লেখা তথাকথিত ‘ম্যাজিক নোট’-এর মাধ্যমে প্রাক্কলিত দর ইচ্ছামতো উচ্চমাত্রায় নির্ধারণ করেন।

চুক্তির তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারকে ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার অনৈতিক সুবিধা প্রদান, বাজারমূল্যের চেয়ে চড়া দামে মালামাল কিনে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা অপচয় এবং কোনো অনুমোদিত ডিজাইন ছাড়াই ১২৭ কোটি টাকা খরচ দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি প্রকল্প এলাকায় ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামেও ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিশাল অপচয় ঘটানো হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—প্রকল্পের কাজের জন্য জাপান থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় যেসব বিলাসবহুল গাড়ি আনা হয়েছিল, সরেজমিনে সেগুলোর কোনো হদিস পাননি নিরীক্ষকরা। ধারণা করা হচ্ছে, প্রভাবশালী চক্র নিজেদের ব্যক্তিগত সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে এসব গাড়ি ব্যবহার করছে। এই ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের অধীনে রয়েছে।

 

কালুরঘাট সেতুতে কৃষিবিদকে ‘সিভিল ইঞ্জিনিয়ার’ বানানোর জালিয়াতি

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের কারিগরি মূল্যায়নেও নজিরবিহীন কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি। কিন্তু পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘স্যামবো-জেভি’ একজন প্রার্থীকে উপস্থাপন করে, যার মূল পড়াশোনা ছিল কৃষি প্রকৌশলে। প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান পদে থেকে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান একটি গোপনীয় চিঠির মাধ্যমে ওই কৃষি ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালান।

এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় তার অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন জিএম মো. সুবক্তগীন। দপ্তর সূত্রে জানা যায়, আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীন দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ও দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পিডি থাকাকালেও সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা থেকে বহুগুণ বাড়িয়ে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় ঠেকানোর পেছনে এই সিন্ডিকেটের হাত ছিল বলে জানা যায়। তমা কনস্ট্রাকশনসহ আওয়ামী ঘরানার বিতর্কিত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আতাঁত করে বিল ছাড়ের সময় নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায় এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পাস করানোর অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাদের দুর্নীতির গতি থামেনি, বরং ম্যাক্স ও তমা গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অব্যাহত থাকে।

 

ম্যাক্স গ্রুপকে সুবিধা দিতে নিয়ম ভেঙে এডিবিকে প্রস্তাব

রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু সংস্থাকে সুবিধা দেওয়ার যে চর্চা গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম উদাহরণ ম্যাক্স (MAX) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়ার কৌশল। প্রকল্পের বাধ্যতামূলক নিয়ম (ITB 37.4) অনুযায়ী, দুটি প্রধান কন্ট্রাক্টের (WD-1 ও WD-2) কাজ পেতে হলে দরদাতার সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার হতে হবে কমপক্ষে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ ম্যাক্সের বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলারে।

সাধারণ বিডারদের ক্ষেত্রে ছোটখাটো সনদ বা টেস্ট রিপোর্টের সামান্য ঘাটতি পেলেই যেখানে ‘নন-রেসপন্সিভ’ বা বাতিল ঘোষণা করা হয়, সেখানে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সামর্থ্যের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ম্যাক্সকে কাজ দেওয়ার তোড়জোড় চালানো হয়। প্রায় ১,৪৬আই কোটি টাকা সাশ্রয়ের অযৌক্তিক অযুহাত দেখিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সক্ষমতাহীন প্রতিষ্ঠানকে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দিলে কাজের গুণগত মান এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা যে চরম ঝুঁকিতে পড়বে, তা জানা সত্ত্বেও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে।

 

শতকোটি টাকার রেলের জমিতে অবৈধ বাণিজ্যের মহোৎসব

কেবল প্রকল্প নির্মাণ বা কেনাকাটাই নয়, রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় চলছে চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভূ-সম্পত্তি রক্ষা ও অবৈধ দখল রোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের (DEN) জেলা প্রশাসকের সমমর্যাদার নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে রাজধানীর খিলগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন মূল্যবান এলাকায় রেলের শতকোটি টাকার জমি প্রকাশ্যে দখল হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে নিরব ভূমিকা পালন করছেন কর্মকর্তারা।

খিলগাঁও এলাকায় রেলের জমিতে গড়ে উঠেছে ৫৬০টিরও বেশি স্থায়ী বাণিজ্যিক দোকান। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দখলদারদের উচ্ছেদ না করে উল্টো প্রভাবশালী মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে আইনগত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের অশুভ আঁতাতের কারণে রাষ্ট্রীয় জমি হাতছাড়া হয়ে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

 

অভিযুক্তদের পদায়ন এবং তদন্তের আশ্বাস

মেগা প্রকল্পগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অডিট আপত্তির পরও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) এবং মো. সুবক্তগীনকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে পদায়ন করা হয়েছে, যা নিয়ে রেলওয়ের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কিছু প্রাথমিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তগত হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুশীল সমাজ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মতে, কেবল বদলি বা পদায়ন নয়—দুদকের চলমান অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ না নিলে রেল খাতের এই দীর্ঘদিনের লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব নয়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও হরি লুট: অনিয়মের শীর্ষে আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীন

আপডেট সময় ১২:৪৮:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে একের পর এক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও ভেতরে ভেতরে চলে দুর্নীতির মহোৎসব। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট সেতু এবং সিডিআরপির মতো বহুল আলোচিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোতে দরপত্র মূল্যায়নে অভূতপূর্ব জালিয়াতি, গুরুতর অডিট আপত্তি ধামাচাপা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ভূমি দখলের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রেলওয়ের দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তা—অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীনের নাম। রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে রেলের খাত থেকে অর্থ লোপাটের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

 

যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার ভয়াবহ অডিট আপত্তি

জাপানি অর্থায়ন সংস্থা জাইকার তহবিলে নির্মিত যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে মহা-অনিয়মের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায়। ওই অডিট প্রতিবেদনে মোট ৩৪টি গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে, যেখানে সরাসরি ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, দরপত্র মূল্যায়নের সময় কারিগরি ও সামর্থ্যের দিক থেকে অযোগ্য ও বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে মূল শর্তাবলী পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের লিখিত আপত্তি উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান নিজের হাতে লেখা তথাকথিত ‘ম্যাজিক নোট’-এর মাধ্যমে প্রাক্কলিত দর ইচ্ছামতো উচ্চমাত্রায় নির্ধারণ করেন।

চুক্তির তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারকে ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার অনৈতিক সুবিধা প্রদান, বাজারমূল্যের চেয়ে চড়া দামে মালামাল কিনে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা অপচয় এবং কোনো অনুমোদিত ডিজাইন ছাড়াই ১২৭ কোটি টাকা খরচ দেখানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি প্রকল্প এলাকায় ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামেও ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিশাল অপচয় ঘটানো হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে—প্রকল্পের কাজের জন্য জাপান থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় যেসব বিলাসবহুল গাড়ি আনা হয়েছিল, সরেজমিনে সেগুলোর কোনো হদিস পাননি নিরীক্ষকরা। ধারণা করা হচ্ছে, প্রভাবশালী চক্র নিজেদের ব্যক্তিগত সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে এসব গাড়ি ব্যবহার করছে। এই ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের অধীনে রয়েছে।

 

কালুরঘাট সেতুতে কৃষিবিদকে ‘সিভিল ইঞ্জিনিয়ার’ বানানোর জালিয়াতি

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের কারিগরি মূল্যায়নেও নজিরবিহীন কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি। কিন্তু পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘স্যামবো-জেভি’ একজন প্রার্থীকে উপস্থাপন করে, যার মূল পড়াশোনা ছিল কৃষি প্রকৌশলে। প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান পদে থেকে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান একটি গোপনীয় চিঠির মাধ্যমে ওই কৃষি ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালান।

এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় তার অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন জিএম মো. সুবক্তগীন। দপ্তর সূত্রে জানা যায়, আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীন দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ও দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পিডি থাকাকালেও সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা থেকে বহুগুণ বাড়িয়ে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় ঠেকানোর পেছনে এই সিন্ডিকেটের হাত ছিল বলে জানা যায়। তমা কনস্ট্রাকশনসহ আওয়ামী ঘরানার বিতর্কিত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আতাঁত করে বিল ছাড়ের সময় নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায় এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পাস করানোর অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাদের দুর্নীতির গতি থামেনি, বরং ম্যাক্স ও তমা গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অব্যাহত থাকে।

 

ম্যাক্স গ্রুপকে সুবিধা দিতে নিয়ম ভেঙে এডিবিকে প্রস্তাব

রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু সংস্থাকে সুবিধা দেওয়ার যে চর্চা গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম উদাহরণ ম্যাক্স (MAX) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়ার কৌশল। প্রকল্পের বাধ্যতামূলক নিয়ম (ITB 37.4) অনুযায়ী, দুটি প্রধান কন্ট্রাক্টের (WD-1 ও WD-2) কাজ পেতে হলে দরদাতার সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার হতে হবে কমপক্ষে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ ম্যাক্সের বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলারে।

সাধারণ বিডারদের ক্ষেত্রে ছোটখাটো সনদ বা টেস্ট রিপোর্টের সামান্য ঘাটতি পেলেই যেখানে ‘নন-রেসপন্সিভ’ বা বাতিল ঘোষণা করা হয়, সেখানে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সামর্থ্যের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ম্যাক্সকে কাজ দেওয়ার তোড়জোড় চালানো হয়। প্রায় ১,৪৬আই কোটি টাকা সাশ্রয়ের অযৌক্তিক অযুহাত দেখিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সক্ষমতাহীন প্রতিষ্ঠানকে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দিলে কাজের গুণগত মান এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা যে চরম ঝুঁকিতে পড়বে, তা জানা সত্ত্বেও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে।

 

শতকোটি টাকার রেলের জমিতে অবৈধ বাণিজ্যের মহোৎসব

কেবল প্রকল্প নির্মাণ বা কেনাকাটাই নয়, রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় চলছে চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভূ-সম্পত্তি রক্ষা ও অবৈধ দখল রোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের (DEN) জেলা প্রশাসকের সমমর্যাদার নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তবে রাজধানীর খিলগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন মূল্যবান এলাকায় রেলের শতকোটি টাকার জমি প্রকাশ্যে দখল হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে নিরব ভূমিকা পালন করছেন কর্মকর্তারা।

খিলগাঁও এলাকায় রেলের জমিতে গড়ে উঠেছে ৫৬০টিরও বেশি স্থায়ী বাণিজ্যিক দোকান। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দখলদারদের উচ্ছেদ না করে উল্টো প্রভাবশালী মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে আইনগত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের অশুভ আঁতাতের কারণে রাষ্ট্রীয় জমি হাতছাড়া হয়ে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

 

অভিযুক্তদের পদায়ন এবং তদন্তের আশ্বাস

মেগা প্রকল্পগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অডিট আপত্তির পরও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) এবং মো. সুবক্তগীনকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে পদায়ন করা হয়েছে, যা নিয়ে রেলওয়ের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কিছু প্রাথমিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তগত হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুশীল সমাজ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মতে, কেবল বদলি বা পদায়ন নয়—দুদকের চলমান অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ না নিলে রেল খাতের এই দীর্ঘদিনের লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব নয়।