কথায় আছে—যত গর্জে, তত বর্ষে না। এই প্রবাদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট।
বিশ্বাস না হলে লিটন দাস-নিগার সুলতানা জ্যোতিদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখুন। স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার।
তবে পারফরম্যান্স যা-ই হোক, হাঁকডাক কমে না বাংলাদেশের। টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগে গলার স্বর থাকে উঁচুতে।
মুখে সর্বোচ্চ সাফল্য ছোঁয়াই লক্ষ্য থাকে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষে ভিন্ন চিত্রের দেখা মেলে। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রিক্ত হাতেই ফিরছেন তারা। তাই এমনটা বলাই যায়—মুখে হাঁক, সাফল্যে ‘ডাক’।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আজ প্রথম তিন ব্যাটার সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান তামিম ও অধিনায়ক লিটনও ‘ডাক’ মেরেছেন। পরে তাঁদের সঙ্গী হন মাহাদী হাসান।
সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান গেমসেই চোখ বোলানো যাক। জাপানের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে কত স্বপ্নই না দেখালেন লিটন-জ্যোতি। দুই অধিনায়কের কথার সুর ছিল এমন—ব্রোঞ্জ অনেক হয়েছে, এবার আমাদের চোখ স্বর্ণে।
চলুন, দেখে নেওয়া যাক এশিয়ান গেমস নিয়ে কী বলেছিলেন লিটন-জ্যোতি। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার লিটন বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে খেলাটাই বড় জিনিস, সঙ্গে এ রকম জায়গায় খেলা এটাও বড় বিষয়। সব সময় (অন্য টুর্নামেন্টে) জিতলে আপনি ট্রফি জিতবেন, কিন্তু এখানে সোনা জেতার বিষয় থাকে। এটা একটা বড় স্বপ্ন, আমার মনে হয় সব ক্রিকেটার রোমাঞ্চিত।’
সাধারণত এ ধরনের টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সারির দল পাঠায় দেশগুলো। বাংলাদেশ-ভারত ব্যতিক্রম। জাতীয় দলই পাঠিয়েছে তারা। লক্ষ্যটা তাই একদম স্পষ্ট। লিটনও দেশ ছাড়ার বেলায় তাই বলেছিলেন, ‘আমরা কীভাবে ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারি, এদিকেই তাকিয়ে আছি। কারণ, ফাইনাল খেললে সুযোগ থাকবে সোনা জেতার। ক্রিকেটে যে জিনিসটা বলি, অলওয়েজ ম্যাচ বাই ম্যাচ। আমরা ম্যাচ বাই ম্যাচই যাব।’
কিন্তু মুখের কথা কি মাঠে ফলাতে পারলেন লিটনরা? ম্যাচ বাই ম্যাচ ধরে সোনা জয়ের যে স্বপ্ন ছিল তাঁদের চোখেমুখে, বাস্তবে তার উল্টোটা দেখালেন। অনেকটা দ্বিতীয় সারির দল পাঠানো পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার কাছে নাস্তানাবুদ হলেন। দুই দলের কাছে যেভাবে ধরাশায়ী হয়েছেন, তাতে সন্দেহ হয়—আমরা কি মালয়েশিয়ার কাছেও…! বেরসিক বৃষ্টি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটা ভেস্তে যাওয়াতে।
২০১০ সালে স্বর্ণ জয়ের পর সর্বশেষ দুই আসরে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ গলায় পরেছিল বাংলাদেশ। ১৬ বছর পর আবারও সোনার হাসির খোঁজে ছিল বাংলাদেশ। লক্ষ্য পূরণে শক্তিশালী দলের সঙ্গে উইকেটও বাংলাদেশের পক্ষেই ছিল। কেননা, জাপানের কোরোগি স্পোর্টস পার্কের পিচ তৈরি করেন গামিনি ডি সিলভা। বাংলাদেশের সাবেক কিউরেটরের কাছে পরামর্শ নিয়ে তাই স্বপ্ন পূরণের কথা জানিয়েছিলেন বোলিং কোচ তালহা জুবায়ের। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের পরেও খাতায় নম্বর তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। উল্টো সব হারিয়ে রিক্ত হাতে ফিরেছে।
মেয়েদের নামের পাশে দুটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ রয়েছে। এবার তাই চক্রপূরণ করাই ছিল জ্যোতিদের লক্ষ্য। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার বলেছিলেন, ‘এবার আমাদের মূল লক্ষ্য ফাইনাল। আমরা এর আগেও সেমিফাইনালে খেলেছি এবং বাদ পড়েছি। বারবার একই জিনিস হচ্ছে, তাই এবার আমরা সেই বাধাটা ভাঙতে চাই।’
বাধা ডিঙানো দূরে থাক, প্রতিরোধও গড়তে পারেননি মেয়েরা। অসহায় আত্মসমর্পণে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁরা। স্বপ্ন শেষ হওয়ার পর অবশ্য হুঁশ ফিরেছে বাংলাদেশের। তাই বাস্তবতা মেনে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে। ব্রোঞ্জ মেডেলের ম্যাচ শেষে পুরুষ দলের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেছেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমরা দেশবাসীর কাছে লজ্জিত। কোচ হিসেবেও মনে করি আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের কাছে দেশবাসীর যে প্রত্যাশা ছিল, সেটা পূরণ করতে পারিনি। খুবই হতাশাজনক এবং পুরো দেশবাসীর কাছে আমরা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।’
তবে প্রশ্ন হলো, ক্ষমা চেয়েই কি দায় শেষ? জয়ের পর মুক্ত আকাশে জাতীয় পতাকা উড়ানোয় অভ্যস্ত হবে না বাংলাদেশ। কে জানে, এমন দৃশ্যের অপেক্ষা ফুরাবে কবে?
ক্রীড়া প্রতিবেদক 

























