খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা রাজধানীর অভিজাত গুলশান ও বনানীতে গড়ে উঠেছে কয়েক ডজন স্পা সেন্টার ও শীষা বার। প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে ওইসব বার ও স্পা সেন্টারে মাদক কেনাবেচা এবং দেহ ব্যবসা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান ও বনানীতে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড বাবুল ও বাহার। তাদের নেতৃত্বে চলছে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড। বনানীতে মাদক ও স্পা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জের নেসার আহমেদ বাবুল। এই বাবুল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার স্পা সেন্টারে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি টানিয়ে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর। নিজেকে কখনো কখনো আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবেও জাহির করতেন।
দীর্ঘদিন ধরে বনানীর আওয়াল সেন্টারে তিনি অর্গানিক স্পা সেন্টার চালিয়ে যাচ্ছেন। স্পার নামে সেখানে নিয়মিত ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও মদ সেবন এবং কেনাবেচা চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাবুলের স্পা সেন্টারটির মূল ফটকে তালা লাগিয়ে রাখার কারণে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি বন্ধ। নির্দিষ্ট খদ্দেররা ফোন দিয়ে গেলে তালা খুলে তাদের ভেতরে নেওয়া হয়। এরপর সেখানে নানা ধরনের মাদক দিয়ে আপ্যায়ন ও দেহপসারিণীদের মনোরঞ্জন চলে বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানীর একজন স্থানীয় বাসিন্দা প্রতিবেদককে জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণআন্দোলনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে বাবুলের জোরালো ভূমিকা ছিল। তার বিরুদ্ধে একটি ছাত্র হত্যা মামলাও রয়েছে। ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বাবুল। তিনি মোটা অঙ্কের টাকা খরচ ও তদবির করে তার নাম এজাহার থেকে বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে।
গাজীপুরের বাসিন্দা বাহার প্রায় এক যুগ ধরে গুলশান-২-এর ৯৯ নম্বর রোডের ৩৩/এ (ব্লুবেল) ভবনের একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে কথিত স্পা সেন্টারের আড়ালে দেহ ব্যবসা ও মাদকের রমরমা বাণিজ্য পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও স্থানীয় মাস্তানদের ম্যানেজ করে ওপেন সিক্রেটভাবেই চলছে এই ব্যবসা বলে অভিযোগ। দেহ ব্যবসার আড়ালে এখানে মূলত ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও মদ সেবন এবং কেনাবেচা চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাহার নিজেই ইয়াবা সেবন করেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
গুলশান এলাকায় মোট আটটি স্পা সেন্টার রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব স্পা সেন্টারের প্রশাসন ও স্থানীয় গুন্ডা-মাস্তানদের ম্যানেজ করার দায়িত্ব বাহারের হাতে বলে অভিযোগ রয়েছে। গুলশান-২-এর ওয়েস্টিন হোটেলের পাশের গলিতে হোটেল এইচ-এর চতুর্থ তলায় রয়েছে রত্নার স্পা সেন্টার। গুলশান-১-এর ২৪ নম্বর রোডের ৯১/বি (রতনপুর ক্যাসেল) ভবনের চতুর্থ তলায় রয়েছে মাদক সম্রাট হুমায়ুনের স্পা সেন্টার। একইভাবে এই দুটি স্পা সেন্টারেও রাতদিন মাদকের রমরমা বাণিজ্য ও দেহ ব্যবসা চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যেকটিকে মধুকুঞ্জ ও মাদকের হাট বললেও কম বলা হবে।
এ ছাড়া বনানী কবরস্থানের পাশে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শহীদ মেসেজ পার্লারের অন্তরালে একই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বনানী কবরস্থানের বিপরীতে ২৭ নম্বর রোডের ৩৭ নম্বর বাসার (অবন্তী হাউজ) ষষ্ঠ তলার (লিফট-৫) ডি ফ্ল্যাটে শহীদের স্পা সেন্টারে এমন অবৈধ কার্যকলাপ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে বলে অভিযোগ।
কবরস্থানের মতো একটি পবিত্র জায়গার খুব কাছে গড়ে তোলা হয়েছে দুনিয়ার জাহান্নাম হিসেবে পরিচিত এই স্পা সেন্টারটি। নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা পরিচয় দেওয়া শহীদ এখন বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে দেহ ব্যবসাসহ মাদক বাণিজ্য করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহীদের স্পা সেন্টারে রয়েছে অত্যাধুনিক ডিজিটাল লক সিস্টেম ও বেশ কয়েকটি গোপন ক্যামেরা। যার মাধ্যমে বনানী কবরস্থান থেকে শুরু করে তার স্পা সেন্টারের ভেতরে ও বাইরে সবকিছু দেখা যায় বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পায়েল নামে আরেক স্পা ব্যবসায়ী গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার সুবাদে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের দাপট দেখিয়ে এবং নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিয়ে বনানী চেয়ারম্যানবাড়ির পাশে বিলাসবহুল একটি বাড়িতে বছরের পর বছর স্পা সেন্টারের আড়ালে মাদক বাণিজ্য ও অসামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও পায়েল বর্তমানে নিজেকে বিএনপির কর্মী দাবি করেন।
গুলশান ও বনানী এলাকায় অন্তত ১২টি স্পা সেন্টারের সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্পা সেন্টারে অনৈতিক কাজের গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানো হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন ও ব্যবসায়ীসহ বিত্তশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে স্পা সেন্টারে কর্মরত সার্ভিসবয় ও মালিকপক্ষ অনৈতিক কাজের সময় তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে কৌশলে তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে হোয়াটসঅ্যাপে অনৈতিক কাজের ভিডিও পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। লোকলজ্জা ও সংসার ভাঙার ভয়ে অনেকেই তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া অনেক কলেজপড়ুয়া মেয়ের ভিডিও ধারণ করে রেখে পরবর্তীতে সেসব ভিডিও ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বছরের পর বছর তাদের দিয়ে দেহ ব্যবসা করানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় স্পার আড়ালে এ ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদক ব্যবসা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে ডিসি গুলশানকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও তিনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























