রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিরীক্ষা শাখার সহকারী পরিচালক নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে রাখা, গ্রাহক হয়রানি এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, তাঁকে ঘিরে রাজউকের নিরীক্ষা শাখায় একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয়, যাকে কেউ কেউ ‘টুম্পা সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগগুলোর সবকটির পক্ষে নথিভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, প্রকাশিত তথ্য ও সরকারি নথিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
রাজউকের সরকারি কর্মকর্তা তালিকায় নাদিয়া আহমেদ টুম্পাকে সহকারী পরিচালক (নিরীক্ষা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই তালিকায় তাঁর দাপ্তরিক ই-মেইল ও মোবাইল নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে।
১. অভিযোগের উৎস: কোথা থেকে উঠছে ‘সিন্ডিকেট’-এর অভিযোগ?
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সূত্রগুলোর কাছ থেকে মূলত পাঁচ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রথমত, ফ্ল্যাট হস্তান্তর, নামজারি, জমির মালিকানা পরিবর্তন ও কমিশন-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন বা নিষ্পত্তিতে অর্থ দাবির অভিযোগ।
দ্বিতীয়ত, জমি তদন্ত বা কমিশনের কার্যক্রমের নামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার দাবি।
তৃতীয়ত, রাজউকে হাজিরা বা সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ।
চতুর্থত, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার দাবি।
পঞ্চমত, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, নতুন আপত্তি তৈরি করা কিংবা ভুল তথ্যসংবলিত চিঠি দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ—ফাইল আটকে রাখা, তদন্ত ও হাজিরার নামে অর্থ নেওয়া এবং ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের দাবি—প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে ওই প্রতিবেদনের অভিযোগগুলোর স্বাধীন প্রমাণ সেখানে উপস্থাপন করা হয়নি।
অর্থাৎ, অভিযোগগুলো একেবারে নতুন নয়; কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথি ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের আরও যাচাই প্রয়োজন।
২. ভুক্তভোগীর বক্তব্য: ফাইল কেন আটকে থাকে?
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আসে সেবা নিতে যাওয়া ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।
তাঁদের অভিযোগ, একটি ফাইলের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও কখনো সেটি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর নতুন আপত্তি বা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়। এরপর অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে কাজটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।
কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেছেন, জমি তদন্ত কিংবা কমিশনের কাজে তাঁদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, রাজউকে হাজিরা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া এসব বক্তব্যের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পরিচয়, তাঁদের ফাইল নম্বর, অর্থ প্রদানের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কেউ অভিযোগ করলেই সেটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়।
এ কারণে এই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট ফাইল, চিঠি, নোটশিট এবং অনুমোদনের সময়কাল মিলিয়ে দেখা জরুরি।
৩. নথিপত্র: অভিযোগের সঙ্গে কী মেলে?
সরকারি নথিতে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত করা যায়—নাদিয়া আহমেদ টুম্পা রাজউকের সহকারী পরিচালক (নিরীক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজউকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের তালিকায় তাঁর নাম ও পদবি রয়েছে।
কিন্তু অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ঘুষ গ্রহণ, ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায় কিংবা ‘সিন্ডিকেট’ পরিচালনা—এসবের পক্ষে কোনো বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন, অডিট আপত্তি, শাস্তির আদেশ বা আদালতের নথি অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
এখানেই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন:
যেসব ফাইল নিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে, সেসব ফাইলের নোটশিটে কী আছে?
একই কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পর কত দিন ফাইল পড়ে ছিল, কখন আপত্তি দেওয়া হয়েছে, কখন তা নিষ্পত্তি হয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে অভিযোগের একটি নথিভিত্তিক চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
একইভাবে ভুল তথ্যসংবলিত চিঠি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট চিঠির কপি এবং পরে সংশোধিত চিঠি পাশাপাশি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৪. রাজউকের জবাব: তদন্ত হয়েছে কি?
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছে—নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আগে কখনো লিখিতভাবে করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না।
এ ছাড়া জানতে হবে—
- তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ রয়েছে কি না;
- কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল কি না;
- কোনো অডিট আপত্তি বা প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ আছে কি না;
- অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে কখনো দায়িত্ব থেকে সরানো বা বদলি করা হয়েছিল কি না;
- তাঁর অধীনে নিষ্পত্তি হওয়া ফাইলের কোনো নমুনা অডিট করা হয়েছে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের গুরুত্ব ও বাস্তব ভিত্তি অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
এদিকে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে। ফোনে যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এই অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন।
৫. টাকার প্রবাহ: কোটি টাকার দাবির ভিত্তি কোথায়?
অভিযোগের সবচেয়ে বড় দাবি হলো—এই চক্রের মাধ্যমে মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থের লেনদেন হয়।
কিন্তু এখানেই অনুসন্ধানের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে:
এই কোটি টাকা কোথা থেকে আসে এবং কোথায় যায়?
ডেভেলপারদের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়—এমন দাবি সত্য হলে প্রথমে শনাক্ত করতে হবে কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত অর্থ দেয়। এরপর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইলের সংখ্যা, নিষ্পত্তির সময়, কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ প্রদানের ধরন যাচাই করতে হবে।
একইভাবে জমি তদন্ত বা কমিশনের নামে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং হাজিরার নামে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেই অর্থের কোনো রসিদ, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য, মধ্যস্থতাকারীর যোগাযোগ বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য আছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।
শুধু ‘কোটি টাকা লেনদেন হয়’—এমন সূত্রের বক্তব্য দিয়ে অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করা যায় না। অর্থের প্রবাহ প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন লেনদেনের প্রমাণ, একাধিক স্বাধীন সূত্র এবং নথির সঙ্গে তথ্যের মিল।
এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
নাদিয়া আহমেদ টুম্পার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের আগে পাঁচটি বিষয়ে নথিভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন—
১. কোন কোন ফাইল অর্থের বিনিময়ে আটকে রাখা বা ছাড়ার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত?
২. অভিযোগ করা ভুক্তভোগীরা কি তাঁদের ফাইল নম্বর ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ দিতে পারবেন?
৩. রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা অডিটে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েছে কি না?
৪. অভিযোগের বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষ আগে কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
৫. মাসে কোটি টাকা লেনদেনের দাবির পক্ষে আর্থিক বা নথিগত প্রমাণ কোথায়?
বর্তমানে সরকারি নথিতে নাদিয়া আহমেদ টুম্পার পদ ও কর্মস্থলের তথ্য নিশ্চিত করা গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষ ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো পর্যাপ্ত স্বাধীন নথি পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে রাজউকের নথি, ভুক্তভোগীদের প্রত্যক্ষ বক্তব্য, আর্থিক লেনদেন এবং কর্তৃপক্ষের তদন্ত—সবগুলো একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে এবং রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাব মিললে অনুসন্ধানের চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















