ঢাকা ০৪:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কমলনগরে এক রাতে দুই বাড়িতে ডাকাতি, টিনের চাল কেটে তিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চুরি কালিহাতীতে প্রটেকটিভ ইসলামী লাইফ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে: রাষ্ট্রপতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যে তেমন প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী রংপুর গণপূর্তে দুর্নীতির অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিককে হুমকি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা গ্রেপ্তার চট্টগ্রাম কারাগারে ‘মুক্তি বাণিজ্যর’ অভিযোগ ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে দেশ ও জনগণের স্বার্থে যত আন্দোলন হয়েছে, তার বিরোধিতা করেছে জামায়াত: রিজভী আমদানি পণ্য আনলোডের নামে বছরে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ কূপ খনন করবে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা

রংপুর গণপূর্তে দুর্নীতির অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিককে হুমকি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৩:২২:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১৪ বার পড়া হয়েছে

রংপুর গণপূর্ত বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে বিভাগটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিককে হামলার চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগের তীর উঠেছে গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের দিকেও।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। রংপুরেও সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যে চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। একই সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের সঙ্গে সাংবাদিকদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের কারণে অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু সাংবাদিক সংবাদ সম্মেলন বা বিজ্ঞাপনের কথা বলে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বিরুদ্ধে এক নারী কর্মকর্তাকে ৭ লাখ টাকার একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগটির পেছনের কারণ খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে চেক বা লেনদেনের কোনো নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গণমাধ্যমে ‘একই জায়গায় বারবার গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রংপুর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয় বলে জানা গেছে।

রংপুরের সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষে করা ওই আবেদনে তামিম ইকবাল, আতিকুর রহমান আতিক, ফরিদা, আরমান, আব্দুর রশীদ মিয়া, সুজন মিয়া ও আলমগীরসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের দাবি, অভিযোগ দাখিলের প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।

সাংবাদিককে হামলার চেষ্টা ও হুমকির অভিযোগ

গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের কার্যালয়ে সাংবাদিক আতিকুর রহমান আতিক গেলে ঠিকাদার আবু বকর সিদ্দিক মিঠু তার ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আতিকুর রহমানের অভিযোগ, এ সময় তাকে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এর আগে একই ঠিকাদার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে শহিদুল ইসলাম, মোশারফ হোসেন, ফেরদৌসি আক্তার এবং সাংবাদিক ও এনসিপি নেতা রুস্তম আলী সরকার ছিলেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর সাংবাদিক আতিকুর রহমান আতিক রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

রংপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

অভিযোগ রয়েছে, হাজীরহাটে নভোথিয়েটারের প্রায় ১৫০ কোটি টাকার কাজে অনিয়ম হয়েছে। এ ছাড়া নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডেকোরেশন বাবদ প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাজ টেন্ডার ছাড়াই দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদার মিঠু চক্রের বিরুদ্ধে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বৈদ্যুতিক, সাউন্ড সিস্টেম, এসি সরবরাহ ও সিভিল কাজসহ বিটা প্রকল্পের প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন টেন্ডারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের সমন্বয়ে অনিয়ম করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকার প্রশ্ন

অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলম ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কীভাবে একই দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন এবং এর মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, নিজস্ব পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে টেন্ডার ছাড়াই বিভিন্ন কাজ করানো হয়েছে। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সাফিউল মন্ডলের বিরুদ্ধেও টেন্ডার ছাড়াই কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চললেও অনেক প্রকল্পে যথাযথ সাইনবোর্ড না থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদার ও কাজের সময়সীমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রিজার্ভার নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ

রংপুর মেডিকেল কলেজের পেছনে রিজার্ভার নির্মাণকাজ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজ যথাযথভাবে না করায় পাশের ভবন ও আশপাশের রাস্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের জন্য খনন করা মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া, পুরোনো ইট ব্যবহার এবং নির্ধারিতসংখ্যক ট্যাংক স্থাপন না করার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রকল্পের কাজের মান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া ২০২০-২১ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাজিয়া সুলতানা নামে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অডিটের কথা বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে এক ঠিকাদার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

ঠিকাদারদের বৈষম্যের অভিযোগ

রংপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, কাজের ভাগ-বাটোয়ারা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনৈতিক অর্থ দাবি করা হয়। ই-জিপি ও ওটিএম পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগপন্থী ও বিএনপিপন্থী—বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহারিয়া আরেফিনের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন রংপুরে কর্মরত থাকার সুযোগে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, আরএফকিউ ও কোটেশনের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের বিভিন্ন কাজ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অল্প সময়ে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি প্রকাশ্যে আসেনি।

এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। পরে বদলি হয়ে আবার রংপুরে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

ক্যান্সার হাসপাতালের কাজ নিয়ে প্রশ্ন

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এখনো শেষ হয়নি।

কাজটি কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন ক্যান্সার রোগী ও সচেতন নাগরিকরা।

এ ছাড়া জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন পাঁচতলা রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের কাজও বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতাল পরিচালক বলেন, তার জানা মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প পরিচালক রংপুরে আসেননি। এর কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তদন্তের দাবি

রংপুর গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈষম্য এবং সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা।

তাদের দাবি, সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি দাবি করেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মিজানুর রহমানকে অর্থ দিতে হয় এবং এ কারণেই কাজ শেষ করতে তাকে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়।

তবে তার এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে অভিযুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বক্তব্যও পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কমলনগরে এক রাতে দুই বাড়িতে ডাকাতি, টিনের চাল কেটে তিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চুরি

রংপুর গণপূর্তে দুর্নীতির অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিককে হুমকি

আপডেট সময় ০৩:২২:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রংপুর গণপূর্ত বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঠিকাদারি কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে বিভাগটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিককে হামলার চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগের তীর উঠেছে গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের দিকেও।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। রংপুরেও সাংবাদিকদের একটি অংশের মধ্যে চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। একই সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের সঙ্গে সাংবাদিকদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের কারণে অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু সাংবাদিক সংবাদ সম্মেলন বা বিজ্ঞাপনের কথা বলে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বিরুদ্ধে এক নারী কর্মকর্তাকে ৭ লাখ টাকার একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগটির পেছনের কারণ খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে চেক বা লেনদেনের কোনো নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গণমাধ্যমে ‘একই জায়গায় বারবার গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রংপুর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয় বলে জানা গেছে।

রংপুরের সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষে করা ওই আবেদনে তামিম ইকবাল, আতিকুর রহমান আতিক, ফরিদা, আরমান, আব্দুর রশীদ মিয়া, সুজন মিয়া ও আলমগীরসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের দাবি, অভিযোগ দাখিলের প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।

সাংবাদিককে হামলার চেষ্টা ও হুমকির অভিযোগ

গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের কার্যালয়ে সাংবাদিক আতিকুর রহমান আতিক গেলে ঠিকাদার আবু বকর সিদ্দিক মিঠু তার ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আতিকুর রহমানের অভিযোগ, এ সময় তাকে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এর আগে একই ঠিকাদার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে শহিদুল ইসলাম, মোশারফ হোসেন, ফেরদৌসি আক্তার এবং সাংবাদিক ও এনসিপি নেতা রুস্তম আলী সরকার ছিলেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর সাংবাদিক আতিকুর রহমান আতিক রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

রংপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

অভিযোগ রয়েছে, হাজীরহাটে নভোথিয়েটারের প্রায় ১৫০ কোটি টাকার কাজে অনিয়ম হয়েছে। এ ছাড়া নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডেকোরেশন বাবদ প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাজ টেন্ডার ছাড়াই দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদার মিঠু চক্রের বিরুদ্ধে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বৈদ্যুতিক, সাউন্ড সিস্টেম, এসি সরবরাহ ও সিভিল কাজসহ বিটা প্রকল্পের প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন টেন্ডারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের সমন্বয়ে অনিয়ম করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকার প্রশ্ন

অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলম ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কীভাবে একই দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন এবং এর মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, নিজস্ব পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে টেন্ডার ছাড়াই বিভিন্ন কাজ করানো হয়েছে। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সাফিউল মন্ডলের বিরুদ্ধেও টেন্ডার ছাড়াই কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চললেও অনেক প্রকল্পে যথাযথ সাইনবোর্ড না থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদার ও কাজের সময়সীমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রিজার্ভার নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ

রংপুর মেডিকেল কলেজের পেছনে রিজার্ভার নির্মাণকাজ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজ যথাযথভাবে না করায় পাশের ভবন ও আশপাশের রাস্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের জন্য খনন করা মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া, পুরোনো ইট ব্যবহার এবং নির্ধারিতসংখ্যক ট্যাংক স্থাপন না করার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রকল্পের কাজের মান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া ২০২০-২১ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাজিয়া সুলতানা নামে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অডিটের কথা বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে এক ঠিকাদার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

ঠিকাদারদের বৈষম্যের অভিযোগ

রংপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, কাজের ভাগ-বাটোয়ারা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনৈতিক অর্থ দাবি করা হয়। ই-জিপি ও ওটিএম পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগপন্থী ও বিএনপিপন্থী—বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহারিয়া আরেফিনের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন রংপুরে কর্মরত থাকার সুযোগে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, আরএফকিউ ও কোটেশনের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের বিভিন্ন কাজ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অল্প সময়ে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি প্রকাশ্যে আসেনি।

এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। পরে বদলি হয়ে আবার রংপুরে দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

ক্যান্সার হাসপাতালের কাজ নিয়ে প্রশ্ন

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এখনো শেষ হয়নি।

কাজটি কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছেন ক্যান্সার রোগী ও সচেতন নাগরিকরা।

এ ছাড়া জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন পাঁচতলা রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের কাজও বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতাল পরিচালক বলেন, তার জানা মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প পরিচালক রংপুরে আসেননি। এর কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তদন্তের দাবি

রংপুর গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি, ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈষম্য এবং সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা।

তাদের দাবি, সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি দাবি করেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মিজানুর রহমানকে অর্থ দিতে হয় এবং এ কারণেই কাজ শেষ করতে তাকে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়।

তবে তার এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে অভিযুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বক্তব্যও পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।