ঢাকা ০৪:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পীরগঞ্জে ৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর চাপ, মেঝে-বারান্দায় চিকিৎসাসেবা বদলগাছীতে ছাত্রলীগের ২ কর্মীকে ধরে পুলিশে দিল ছাত্রদল মিয়ানমারের সঙ্গে ড্র শেষে এশিয়ান গেমস থেকে বিদায় বাংলাদেশ মলির ডেস্কেই আটকে রাজউকের ফাইল, অভিযোগের কেন্দ্রে দুই কর্মচারী স্বাস্থ্যখাতের ওপর সরকারের বড় সাফল্য নির্ভর করছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইমরান খানের তিন বোন আটক, উত্তপ্ত পাকিস্তানের রাজনীতি জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না: প্রতিমন্ত্রী লঘুচাপের প্রভাবে সারা দেশে ৫ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস সাতক্ষীরার এমপির সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর মূল হোতা শ্যালক ওবায়দুর: মরিয়মের বাবা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাংলাদেশি নৌ-সদস্যের মৃত্যু

মলির ডেস্কেই আটকে রাজউকের ফাইল, অভিযোগের কেন্দ্রে দুই কর্মচারী

রাজধানী ঢাকা ও তার চারপাশের পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বপ্ন যেখানে বোনা হওয়ার কথা, সেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যেন আজ এক গভীর অন্ধকার কুঠুরি।

প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন আর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এখন কেবল খাতার পাতায় বন্দি এক মরীচিকা। বাইরে বড় বড় সাইনবোর্ড আর কাচের দেওয়াল থাকলেও ভেতরে চলছে এক অদৃশ্য পুতুলনাচ।

এই নাটকের নেপথ্য কুশীলব কোনো শীর্ষ নীতিনির্ধারক নন; রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (অতিরিক্ত দায়িত্বে উচ্চমান সহকারী) ফাতেমা বেগম মলি এবং এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জাহিদুল ইসলাম সবুজ। তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারীরা বছরের পর বছর ধরে এক অদৃশ্য শেকড় ছড়িয়েছেন, যা পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘকাল একই চেয়ারে জেঁকে বসে তারা তৈরি করেছেন এক সমান্তরাল রাজত্ব। সেই রাজত্বে সাধারণ সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে নামিদামি ঠিকাদার—সবাই কেবল অসহায় শিকার। ফাইল আটকে রেখে বাধ্যতামূলক ঘুষ আদায়, নিজের পরিবারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বড় বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়া, সরকারি ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) বারোটা বাজিয়ে কমিশন বাণিজ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র গায়েব করে ফেলার মতো কর্মকাণ্ড সেখানে জলভাতের মতো স্বাভাবিক। প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিয়ে তারা রাজউকের বুকে সৃষ্টি করেছেন এক কৃত্রিম প্রশাসনিক স্থবিরতা। এক টেবিলে ফাইল আটকে থাকে মাসের পর মাস, ফাইল নড়ে না এক ইঞ্চিও, যেন ফাইলে পড়েছে অদৃশ্য লোহার তালা, যার চাবি লুকিয়ে আছে ফাতেমা বেগম মলির টেবিলে।

অভিযোগ উঠছে, মলির এই কারবার নিছক কোনো সাধারণ ঘুষ লেনদেন নয়, বরং তা এক নিখুঁত প্রাতিষ্ঠানিক ব্ল্যাকমেইল চক্র। এই দুর্নীতির জাল মূলত তিনটি ধারায় বিস্তৃত। প্রথমত, ফাইল জিম্মি করার কৌশল। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট, ঠিকাদারদের চুক্তি সম্পাদন, বোর্ড সভার কার্যপত্র, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন কিংবা ঠিকাদারদের রানিং ও ফাইনাল বিল—সবকিছুই এসে থামে মলির ডেস্কে। নগদ উৎকোচের অঙ্ক মিলে গেলে ফাইলের পথ মসৃণ, আর তা না হলে সেই নথিতে জুড়ে দেওয়া হয় অজস্র কৃত্রিম অসঙ্গতি। দিন গড়িয়ে মাস যায়, কিন্তু ফাইল আর আলোর মুখ দেখে না।

দ্বিতীয়ত, স্বজনতোষী সিন্ডিকেটের হাত ধরে ঘরের মানুষের ভাগ্য বদল। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফাতেমা বেগম মলি তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজুর মালিকানাধীন ‘রাজু ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রাজু প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপারস’-এর ঝুলিতে তুলে দেন একের পর এক কাজ। দরপত্র আহ্বানের আগেই ভেতরের গোপন তথ্য পাচার হয়ে যায় স্বামীর টেবিলে। তারপর দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়, যেন প্রতিযোগিতার মাঠে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই টিকতে না পারে।

তৃতীয়ত, রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখায় জাহিদুল ইসলাম সবুজের একচ্ছত্র আধিপত্য। তথ্য বলছে, রাজউক ভবনের ৪২১ নম্বর কক্ষটি পরিণত হয়েছিল এক প্রকাশ্য হাটবাজারে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের ফাইল, প্লট বরাদ্দপত্র, নামজারি কিংবা মালিকানা বদলের মতো স্পর্শকাতর নথির জন্য চলত প্যাকেজভিত্তিক ঘুষের দরদাম। ঘুষের বিনিময়ে একই প্লট একাধিক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়া, মূল নথি থেকে মালিকের ছবি বদলে ফেলা কিংবা রাতের আঁধারে আস্ত নথি গায়েব করে দেওয়া ছিল সেখানে নিত্যদিনের খেলা।

এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফাতেমা বেগম মলি শুধু একজন অফিস সহকারী নন, রাজউকের সাবেক সদস্যের সাবেক পিএ এবং শ্রমিক কর্মচারী লীগের স্বঘোষিত মহিলা বিষয়ক নেত্রী পরিচয়ে তিনি দাপিয়ে বেড়াতেন পুরো দপ্তর।

অন্যদিকে তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজু, যিনি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক পল্লী উন্নয়ন সম্পাদক, স্ত্রীর দাপ্তরিক ক্ষমতার ডানা মেলে নিয়ন্ত্রণ করতেন রাজউকের ঠিকাদারি অঙ্গন। তাঁদের সহযোগী জাহিদুল ইসলাম সবুজ (হেলাল উদ্দীন সবুজ), যিনি ১৯৯৮ সালে সংস্থায় যোগ দিয়ে শ্রমিক কর্মচারী লীগের কার্যকরী সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন, ৪২১ নম্বর কক্ষে বসে নিয়ন্ত্রণ করতেন এস্টেট জালিয়াতির কলকাঠি।

ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেহেদী হাসান এই দুর্নীতির চক্রব্যূহে পিষ্ট হয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক প্রবীর কুমার দাস মলির অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকলেও অদৃশ্য কারণে সেই ফাইলটিও কোনো এক ড্রয়ারে চাপা পড়ে থাকে।

সরকারি বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী একজন অফিস সহকারী বা উচ্চমান সহকারীর মাসিক বেতন সাকুল্যে ২৫ থেকে ৩২ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। অথচ এই সামান্য আয়ের আড়ালে তাঁদের সম্পদের বহর রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

তথ্য বলছে, ফাতেমা বেগম মলির রয়েছে ধানমন্ডি ও ঝিগাতলার ১৫/এ সড়কের এমসিটি ডার্লিং পয়েন্টের লেভেল ই-৫-এ ৩টি সুপরিসর বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১৭, ২২ ও ২৭ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠা আয়তনের মোট ৩টি প্লট। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদর, রূপগঞ্জ ও চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে অঢেল জমিজমা এবং ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৪৬১৮ নম্বরের একটি বিলাসবহুল নোয়া মাইক্রোবাস মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অধিক পুঞ্জীভূত সম্পদ।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের দখলে রয়েছে রাজধানীর সবুজবাগে ২,০০০ বর্গফুটের রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্ট, দক্ষিণ মাদারটেক কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে যৌথ অংশীদারিত্ব, গাজীপুরের ভবানীপুরে ‘রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলেজ’-এ বিনিয়োগ, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও বগুড়ার শেরপুরে একাধিক পাকা বাড়ি এবং ঢাকা মেট্রো-৫১৮৯৩৭ নম্বরের নোয়া মাইক্রোবাস—যার ড্রাইভার ও তেলের পেছনেই মাসে উড়ে যায় একজন সাধারণ কর্মচারীর পুরো মাসের বেতনের সমান অর্থ। শতকোটি টাকার এই সাম্রাজ্য কি কেবলই সরকারি চাকরির সঞ্চয়, নাকি জনতার ঘাম ঝরানো অর্থের ফসল?

দালিলিক প্রমাণ বলছে, ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেহেদী হাসান মলির ঝিগাতলার ফ্ল্যাট ও পূর্বাচলের প্লটসহ ঘুষ বাণিজ্যের বিবরণ দিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

সেই নথি রাজউকে এলেও তা ধামাচাপা পড়ে যায়। ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে সবুজের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক নিপীড়ন, ৪২১ নম্বর কক্ষের ঘুষের হাট ও রিসোর্টে বিনিয়োগের প্রমাণ দাখিল করা হয়। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় সবই দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়। এমনকি জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দমন-পীড়ন ও অর্থায়নের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শাহআলী থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় (সিআর নং ৯৯/২০২৫) ফাতেমা বেগম মলি ১৫৬ নম্বর এবং তাঁর স্বামী ১৬০ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি হওয়া সত্ত্বেও রাজউক কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করার সাহস দেখায়নি। হাইকোর্টের রিট পিটিশন ও বরাদ্দ নথিপত্র প্রমাণ করে, পূর্বাচলের প্লট আর ঝিগাতলার হোল্ডিং নথিতেও মলির পরিবারের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান।

প্রকল্পের বাস্তব কাজ কতটুকু হলো তা না দেখেই ঠিকাদারদের রানিং বিল ছাড় করিয়ে দিতে মলি নিতেন নির্দিষ্ট কমিশন। ফলে মানহীন কাজও কাগজে-কলমে নিখুঁত হিসেবে পাস হয়ে যেত, যার মাধ্যমে সরাসরি অপচয় হয়েছে রাষ্ট্রের অর্থ। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে স্বামীর সংস্থাকে একচ্ছত্র কাজ পাইয়ে দিয়ে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করা হয়েছে। আবার সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ তোয়াক্কা না করে হত্যা মামলার আসামিকে বহাল তবিয়তে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, এই সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর আসলে কোথায়? জানতে চেয়ে ফাতেমা বেগম মলির ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে প্রতিবারই এক অচেনা কণ্ঠ বলে ওঠে, এটি রং নম্বর এবং ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাঠানো হলেও তিনি মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সবকিছু অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি রাজউকে সততার সঙ্গে চাকরি করি। দাপ্তরিক কোনো কাজের বিনিময়ে আমি কারও কাছ থেকে কোনোদিন এক পয়সাও ঘুষ নিইনি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার সম্মানহানি করতে এবং আমাকে চাকরি থেকে সরানোর চক্রান্ত হিসেবে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ বিভিন্ন সংস্থায় ছড়াচ্ছে।’

রাজউক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল মহলের দাবি, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজউকের কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে কর্তৃপক্ষ তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে। কোনো একক ব্যক্তির অনৈতিক কাজের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নেবে না। উত্থাপিত সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একটি প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা যখন পুরো প্রশাসনকে জিম্মি করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস কেবল ভবনের দেওয়ালেই প্রতিধ্বনিত হয়। কেবল তদন্ত কমিটির নাটক নয়, হত্যা মামলার আসামিকে চাকরি থেকে অপসারণ, দুদক কর্তৃক মলির ৫০ কোটি টাকার সম্পদের ফরেনসিক অডিট এবং ম্যানুয়াল ফাইলিং বন্ধ করে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু না হলে রাজউকের এই অচলাবস্থা কাটবে না। নতুবা, দুর্নীতির এই বিষবৃক্ষের ছায়ায় একসময় হারিয়ে যাবে একটি গোটা নগরের স্বপ্ন ও প্রশাসনিক অস্তিত্ব।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পীরগঞ্জে ৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর চাপ, মেঝে-বারান্দায় চিকিৎসাসেবা

মলির ডেস্কেই আটকে রাজউকের ফাইল, অভিযোগের কেন্দ্রে দুই কর্মচারী

আপডেট সময় ০৩:৪৩:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানী ঢাকা ও তার চারপাশের পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বপ্ন যেখানে বোনা হওয়ার কথা, সেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যেন আজ এক গভীর অন্ধকার কুঠুরি।

প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন আর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এখন কেবল খাতার পাতায় বন্দি এক মরীচিকা। বাইরে বড় বড় সাইনবোর্ড আর কাচের দেওয়াল থাকলেও ভেতরে চলছে এক অদৃশ্য পুতুলনাচ।

এই নাটকের নেপথ্য কুশীলব কোনো শীর্ষ নীতিনির্ধারক নন; রাজউকের জোন-৫ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর প্রকল্প দপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (অতিরিক্ত দায়িত্বে উচ্চমান সহকারী) ফাতেমা বেগম মলি এবং এস্টেট ও ভূমি-২ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জাহিদুল ইসলাম সবুজ। তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারীরা বছরের পর বছর ধরে এক অদৃশ্য শেকড় ছড়িয়েছেন, যা পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘকাল একই চেয়ারে জেঁকে বসে তারা তৈরি করেছেন এক সমান্তরাল রাজত্ব। সেই রাজত্বে সাধারণ সেবাগ্রহীতা থেকে শুরু করে নামিদামি ঠিকাদার—সবাই কেবল অসহায় শিকার। ফাইল আটকে রেখে বাধ্যতামূলক ঘুষ আদায়, নিজের পরিবারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বড় বড় প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়া, সরকারি ক্রয় বিধিমালার (পিপিআর) বারোটা বাজিয়ে কমিশন বাণিজ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র গায়েব করে ফেলার মতো কর্মকাণ্ড সেখানে জলভাতের মতো স্বাভাবিক। প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিয়ে তারা রাজউকের বুকে সৃষ্টি করেছেন এক কৃত্রিম প্রশাসনিক স্থবিরতা। এক টেবিলে ফাইল আটকে থাকে মাসের পর মাস, ফাইল নড়ে না এক ইঞ্চিও, যেন ফাইলে পড়েছে অদৃশ্য লোহার তালা, যার চাবি লুকিয়ে আছে ফাতেমা বেগম মলির টেবিলে।

অভিযোগ উঠছে, মলির এই কারবার নিছক কোনো সাধারণ ঘুষ লেনদেন নয়, বরং তা এক নিখুঁত প্রাতিষ্ঠানিক ব্ল্যাকমেইল চক্র। এই দুর্নীতির জাল মূলত তিনটি ধারায় বিস্তৃত। প্রথমত, ফাইল জিম্মি করার কৌশল। উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট, ঠিকাদারদের চুক্তি সম্পাদন, বোর্ড সভার কার্যপত্র, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন কিংবা ঠিকাদারদের রানিং ও ফাইনাল বিল—সবকিছুই এসে থামে মলির ডেস্কে। নগদ উৎকোচের অঙ্ক মিলে গেলে ফাইলের পথ মসৃণ, আর তা না হলে সেই নথিতে জুড়ে দেওয়া হয় অজস্র কৃত্রিম অসঙ্গতি। দিন গড়িয়ে মাস যায়, কিন্তু ফাইল আর আলোর মুখ দেখে না।

দ্বিতীয়ত, স্বজনতোষী সিন্ডিকেটের হাত ধরে ঘরের মানুষের ভাগ্য বদল। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফাতেমা বেগম মলি তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজুর মালিকানাধীন ‘রাজু ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রাজু প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপারস’-এর ঝুলিতে তুলে দেন একের পর এক কাজ। দরপত্র আহ্বানের আগেই ভেতরের গোপন তথ্য পাচার হয়ে যায় স্বামীর টেবিলে। তারপর দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়, যেন প্রতিযোগিতার মাঠে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই টিকতে না পারে।

তৃতীয়ত, রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখায় জাহিদুল ইসলাম সবুজের একচ্ছত্র আধিপত্য। তথ্য বলছে, রাজউক ভবনের ৪২১ নম্বর কক্ষটি পরিণত হয়েছিল এক প্রকাশ্য হাটবাজারে। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের ফাইল, প্লট বরাদ্দপত্র, নামজারি কিংবা মালিকানা বদলের মতো স্পর্শকাতর নথির জন্য চলত প্যাকেজভিত্তিক ঘুষের দরদাম। ঘুষের বিনিময়ে একই প্লট একাধিক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ দেওয়া, মূল নথি থেকে মালিকের ছবি বদলে ফেলা কিংবা রাতের আঁধারে আস্ত নথি গায়েব করে দেওয়া ছিল সেখানে নিত্যদিনের খেলা।

এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফাতেমা বেগম মলি শুধু একজন অফিস সহকারী নন, রাজউকের সাবেক সদস্যের সাবেক পিএ এবং শ্রমিক কর্মচারী লীগের স্বঘোষিত মহিলা বিষয়ক নেত্রী পরিচয়ে তিনি দাপিয়ে বেড়াতেন পুরো দপ্তর।

অন্যদিকে তাঁর স্বামী আবুল ফজল রাজু, যিনি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক পল্লী উন্নয়ন সম্পাদক, স্ত্রীর দাপ্তরিক ক্ষমতার ডানা মেলে নিয়ন্ত্রণ করতেন রাজউকের ঠিকাদারি অঙ্গন। তাঁদের সহযোগী জাহিদুল ইসলাম সবুজ (হেলাল উদ্দীন সবুজ), যিনি ১৯৯৮ সালে সংস্থায় যোগ দিয়ে শ্রমিক কর্মচারী লীগের কার্যকরী সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন, ৪২১ নম্বর কক্ষে বসে নিয়ন্ত্রণ করতেন এস্টেট জালিয়াতির কলকাঠি।

ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেহেদী হাসান এই দুর্নীতির চক্রব্যূহে পিষ্ট হয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করেন। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক প্রবীর কুমার দাস মলির অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকলেও অদৃশ্য কারণে সেই ফাইলটিও কোনো এক ড্রয়ারে চাপা পড়ে থাকে।

সরকারি বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী একজন অফিস সহকারী বা উচ্চমান সহকারীর মাসিক বেতন সাকুল্যে ২৫ থেকে ৩২ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। অথচ এই সামান্য আয়ের আড়ালে তাঁদের সম্পদের বহর রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।

তথ্য বলছে, ফাতেমা বেগম মলির রয়েছে ধানমন্ডি ও ঝিগাতলার ১৫/এ সড়কের এমসিটি ডার্লিং পয়েন্টের লেভেল ই-৫-এ ৩টি সুপরিসর বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ১৭, ২২ ও ২৭ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠা আয়তনের মোট ৩টি প্লট। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদর, রূপগঞ্জ ও চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে অঢেল জমিজমা এবং ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৪৬১৮ নম্বরের একটি বিলাসবহুল নোয়া মাইক্রোবাস মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অধিক পুঞ্জীভূত সম্পদ।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের দখলে রয়েছে রাজধানীর সবুজবাগে ২,০০০ বর্গফুটের রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্ট, দক্ষিণ মাদারটেক কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে যৌথ অংশীদারিত্ব, গাজীপুরের ভবানীপুরে ‘রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলেজ’-এ বিনিয়োগ, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও বগুড়ার শেরপুরে একাধিক পাকা বাড়ি এবং ঢাকা মেট্রো-৫১৮৯৩৭ নম্বরের নোয়া মাইক্রোবাস—যার ড্রাইভার ও তেলের পেছনেই মাসে উড়ে যায় একজন সাধারণ কর্মচারীর পুরো মাসের বেতনের সমান অর্থ। শতকোটি টাকার এই সাম্রাজ্য কি কেবলই সরকারি চাকরির সঞ্চয়, নাকি জনতার ঘাম ঝরানো অর্থের ফসল?

দালিলিক প্রমাণ বলছে, ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেহেদী হাসান মলির ঝিগাতলার ফ্ল্যাট ও পূর্বাচলের প্লটসহ ঘুষ বাণিজ্যের বিবরণ দিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

সেই নথি রাজউকে এলেও তা ধামাচাপা পড়ে যায়। ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে সবুজের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক নিপীড়ন, ৪২১ নম্বর কক্ষের ঘুষের হাট ও রিসোর্টে বিনিয়োগের প্রমাণ দাখিল করা হয়। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় সবই দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়। এমনকি জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দমন-পীড়ন ও অর্থায়নের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শাহআলী থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় (সিআর নং ৯৯/২০২৫) ফাতেমা বেগম মলি ১৫৬ নম্বর এবং তাঁর স্বামী ১৬০ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি হওয়া সত্ত্বেও রাজউক কর্তৃপক্ষ তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করার সাহস দেখায়নি। হাইকোর্টের রিট পিটিশন ও বরাদ্দ নথিপত্র প্রমাণ করে, পূর্বাচলের প্লট আর ঝিগাতলার হোল্ডিং নথিতেও মলির পরিবারের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান।

প্রকল্পের বাস্তব কাজ কতটুকু হলো তা না দেখেই ঠিকাদারদের রানিং বিল ছাড় করিয়ে দিতে মলি নিতেন নির্দিষ্ট কমিশন। ফলে মানহীন কাজও কাগজে-কলমে নিখুঁত হিসেবে পাস হয়ে যেত, যার মাধ্যমে সরাসরি অপচয় হয়েছে রাষ্ট্রের অর্থ। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করে স্বামীর সংস্থাকে একচ্ছত্র কাজ পাইয়ে দিয়ে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করা হয়েছে। আবার সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ তোয়াক্কা না করে হত্যা মামলার আসামিকে বহাল তবিয়তে চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, এই সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর আসলে কোথায়? জানতে চেয়ে ফাতেমা বেগম মলির ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে প্রতিবারই এক অচেনা কণ্ঠ বলে ওঠে, এটি রং নম্বর এবং ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাঠানো হলেও তিনি মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন।

অন্যদিকে জাহিদুল ইসলাম সবুজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সবকিছু অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি রাজউকে সততার সঙ্গে চাকরি করি। দাপ্তরিক কোনো কাজের বিনিময়ে আমি কারও কাছ থেকে কোনোদিন এক পয়সাও ঘুষ নিইনি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল আমার সম্মানহানি করতে এবং আমাকে চাকরি থেকে সরানোর চক্রান্ত হিসেবে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ বিভিন্ন সংস্থায় ছড়াচ্ছে।’

রাজউক কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল মহলের দাবি, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজউকের কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে কর্তৃপক্ষ তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে। কোনো একক ব্যক্তির অনৈতিক কাজের দায় পুরো প্রতিষ্ঠান নেবে না। উত্থাপিত সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

একটি প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা যখন পুরো প্রশাসনকে জিম্মি করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস কেবল ভবনের দেওয়ালেই প্রতিধ্বনিত হয়। কেবল তদন্ত কমিটির নাটক নয়, হত্যা মামলার আসামিকে চাকরি থেকে অপসারণ, দুদক কর্তৃক মলির ৫০ কোটি টাকার সম্পদের ফরেনসিক অডিট এবং ম্যানুয়াল ফাইলিং বন্ধ করে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু না হলে রাজউকের এই অচলাবস্থা কাটবে না। নতুবা, দুর্নীতির এই বিষবৃক্ষের ছায়ায় একসময় হারিয়ে যাবে একটি গোটা নগরের স্বপ্ন ও প্রশাসনিক অস্তিত্ব।