রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় গৌড় সাহা বারুণী মেলার ইজারার ৫০ হাজার টাকা পাঁচ মাসেও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মো. পারভেজের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার মিলনপুর ইউনিয়নে দীর্ঘ চারশ বছরের স্থানীয় হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ইজারার মাধ্যমে গৌড় সাহা বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
চলতি বছরের পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। মেলার আগে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মেলা ডাকের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। মেলায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ৫০ হাজার টাকায় ইজারা গ্রহণ করেন মিলনপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আকমল হোসেন। এরপর ১৪ ও ১৫ এপ্রিল দুই দিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলা চলাকালে ইজারার ৫০ হাজার টাকা আদায় করেন মিঠাপুকুর ইউএনও মো. পারভেজ। এরপর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেলার ইজারার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেননি তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমানের মাধ্যমে মেলার ইজারার ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।
মিঠাপুকুর উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে মিঠাপুকুর উপজেলায় রংপুর জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে সরকারি দরপত্রের মাধ্যমে বুড়াইল মেলা ও মিলনপুর ইউনিয়নের গৌড় সাহা বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই দুই মেলার ডাকের অর্থ সরকারি ট্যাক্সবহির্ভূত আয় খাতে এসিল্যান্ড অফিসে ডিসিআরের মাধ্যমে জমা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালেও চৌধুরী গোপালপুর মেলার পুরো অর্থ ভ্যাট-ট্যাক্সসহ এসিল্যান্ড অফিসের মাধ্যমে সরকারি ট্যাক্সবহির্ভূত আয় খাতে জমা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালে এসিল্যান্ড অফিস জেলা প্রশাসকের অনুমতি না পাওয়ায় এই মেলার আয়োজন করেনি।
অপরদিকে, মিঠাপুকুর ইউএনও কার্যালয় এবার মেলাটির আয়োজন করে। ডাকের টাকা আদায়ের পাঁচ মাস পরও সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, “এই মেলায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে স্থানীয় আকমল হোসেন ৫০ হাজার টাকায় ইজারা লাভ করেন। আমাদের কাছে মেলা ইজারা দেওয়ার সব কাগজপত্র আছে। টাকাটা অফিসে জমা আছে। তবে এখনো সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এ অর্থবছরের মধ্যে জমা হবে।”
জানা গেছে, মেলাটি পূর্ববর্তী অর্থবছর (২০২৫-২৬)-এর। গত অর্থবছর শেষ হওয়ার পরও কেন সরকারি কোষাগারে টাকাটা জমা হলো না—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ডাকের টাকা জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। আমরা যেকোনো সময় জমা করতে পারি।”
এ বিষয়ে ইউএনও মো. পারভেজ বলেন, “মেলার টাকা আমাদের উপজেলা রাজস্ব তহবিলে জমা হয়।” মেলার ডাকের টাকা কতদিনের মধ্যে জমা হয়—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। এই মেলার টাকাটা জমা হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। আমি এ বিষয়ে খোঁজ নেব।”
হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, ধর্মীয় বা অন্য কোনো বিশেষ উৎসব উপলক্ষে স্বল্পমেয়াদি কোনো হাট ও বাজারের ইজারালব্ধ অর্থ (ভ্যাট ও আয়কর ব্যতীত) ইজারা প্রদানের ৭ কার্যদিবসের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ অর্থ সালামি হিসেবে সরকারকে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কোডের চালানের মাধ্যমে জমা প্রদান করতে হবে এবং অবশিষ্ট ৮০ ভাগ অর্থ উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা রাজস্ব তহবিলে জমা প্রদান করতে হবে। ইজারার টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী সরকারের অর্থ আত্মসাৎ করা অসদাচরণ ও দুর্নীতির শামিল। সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে মামলা দায়ের করতে পারে।
মিঠাপুকুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশিক জামান বলেন, “চৌধুরী গোপালপুরের মেলাটি ২০২৫ সালে ডাক আমাদের অফিস থেকে পরিচালিত হয়েছিল এবং সেটি আমরা চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়েছি। এই বছরে প্রথমে বৈশাখের বুড়াইল মেলা আয়োজনের জন্য আমরা আবেদন করি। ইউএনও অফিসের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রেরণ করার পরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে অনুমতি মেলেনি। এরপরই মিলনপুর ইউনিয়নের গৌড় সাহা বারুণী মেলার বিষয়ে আমরা কোনো প্রস্তাবনা প্রেরণ করিনি। যেহেতু এ বছর এই মেলা আমাদের এখান থেকে আয়োজন করা হয়নি। এ মেলার ডাকের সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম না। এজন্য এই মেলার ইজারার অর্থ কালেকশনের বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।”
আশিক জামান বলেন, “এই মেলার তো আমরা কোনো প্রস্তাবই প্রেরণ করিনি। এ বিষয়ে আমি আজকে আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারলাম। টাকা কীভাবে আদায় হয়েছে, জমা কীভাবে হয়েছে, আমি অবগত নই। এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, “মেলা হোক, ডাক হোক, এখানে পদ্ধতি দুটি। একটা ওপেন ডাক, আরেকটা গোপন বাক্সের মাধ্যমে ডাক। ডাকে যে সর্বোচ্চ দরদাতা হবে, তাকে মেলার বিষয়টি ইউএনও বা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় সরকারি পদ্ধতিতে। এই ডাকের টাকাটা সরাসরি হাতে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চেকের মাধ্যমে বা ড্রাফটের মাধ্যমে এটি সরাসরি সরকারি কোষাগারে চলে যাবে। যদি কোনো কারণে চেক বা ড্রাফট দিতে না পারে, সে ক্ষেত্রে ইউএনও সর্বোচ্চ ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটা রাষ্ট্রের টাকা। এপ্রিল থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এতদিন এই টাকাটা যেহেতু সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি, সে ক্ষেত্রে তিনি একজন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্বে গাফিলতি করেছেন। এই দায়ভার তিনি কোনোভাবে এড়াতে পারেন না।”
তিনি আরও বলেন, “যেখানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কাজ করবেন, তাঁদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে জবাবদিহি থাকতে হবে, স্বচ্ছতা থাকতে হবে, সুশাসন থাকতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থ দায়বদ্ধতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। যেহেতু তিনি এটি করেননি, এজন্য জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি করে জেলা প্রশাসক রংপুরকে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।”
রংপুর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, “এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আমার কার্যালয়ের অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে তদন্ত করে ইউএনওর কাছে ব্যাখ্যা চাইবে। কোনো অনিয়ম হলে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















