ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে বন্দিদের খাবারের নিম্নমান এবং অভ্যন্তরীণ ও বাইরের ক্যান্টিন ঘিরে কোটি কোটি টাকার লুটপাটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের ভেতরের কয়েদি ও হাজতিদের সরকারি বরাদ্দকৃত নিম্নমানের খাবার গ্রহণে বাধ্য করে উচ্চমূল্যে ক্যান্টিনের খাবার কিনতে প্ররোচিত করা হয়।
এই ক্যান্টিনগুলোতে দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল কিংবা ভ্যাট-ট্যাক্সের কোনো রকম ব্যবসায়িক পুঁজি জেল কর্তৃপক্ষের না থাকা সত্ত্বেও বাজারে প্রচলিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারাগারের অভ্যন্তরে বিক্রি হওয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যের দাম সাধারণ বাজারমূল্য থেকে বহুগুণ বেশি, যা দেখার যেন কেউ নেই।
অভিযোগের সত্যতা জানতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন তেল ছাড়া শক্ত, ছোট সাইজের পরোটা ১০ টাকা, পুরি ২০ টাকা, রং চা ১০ টাকা, ডিমের ঝোল এক পিস ৫০ টাকা, নলা মাছ ছোট এক পিস, শিং মাছ দুই পিস ছোট, কৈ মাছ এক পিস, পাবদা মাছ দুই পিস ১২০ টাকা করে, ব্রয়লার মুরগি ছোট এক টুকরো ১২০ টাকা, লেয়ার মুরগি এক পিস ১৬০ টাকা, গরুর মাংস তিন পিস ২০০ টাকা, বিড়ি এক প্যাকেট ৩৫ টাকা, লাল মেহেদির গায়ে মূল্য ২০ টাকা থাকলেও বিক্রি হয় ৫০ টাকায়, কালো মেহেদির মূল্য ১৮ টাকা হলেও বিক্রি হয় ৩০ টাকায়, দুই লিটার ফ্রেশ পানি ৫০ টাকা, লুঙ্গি এক পিস ৪৫০ টাকা, স্যান্ডেল এক জোড়া ১৫০ টাকা, নরমাল মেলামাইনের প্লেট ১০০ থেকে ১৫০ টাকা—এমন বিভিন্ন পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনেক হাজতির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভেতরে বিক্রি হওয়া বেশির ভাগ পণ্যই মানহীন ও নিম্নমানের নকল পণ্য। বিগত দিনে বিড়ির ভেতরে কাঠের গুঁড়া ধরা পড়ার বিভিন্ন ঘটনাও রয়েছে। আর এসব কারণে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় হাজতি ও বন্দিদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা যায়। জেলখানায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্যান্টিনের প্রতি মাসের আয়ের লভ্যাংশের হিসাব ‘দরবার’-এ সব কারারক্ষীকে জানানোর কথা থাকলেও তা করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোটি টাকার লভ্যাংশ আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধানে জানা যায়, দুটি ক্যান্টিন থেকে দৈনিক বিক্রি ও লভ্যাংশ দাঁড়ায় প্রায় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি মাসে লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়ায় অর্ধকোটি টাকার কাছাকাছি। কারাবিধি অনুযায়ী, বন্দিদের পুঁজিতে পরিচালিত এই ব্যবসার লভ্যাংশের একটি অংশ অসহায় বন্দিদের ওষুধ, আইনি সহায়তা, জামিন ও পোশাক কেনায় ব্যয় করার কথা। এ ছাড়া লভ্যাংশের অপর একটি অংশ দায়িত্ব পালনকারী কারারক্ষীদের মধ্যে বণ্টন এবং প্রতি মাসের আয়ের হিসাব ‘দরবারে’ প্রকাশের নিয়ম রয়েছে।
তবে বাস্তবে এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে জেলার ও তাঁর অনুগত একটি গোষ্ঠী নামমাত্র লাভ দেখিয়ে সিংহভাগ অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে কারারক্ষী ও বন্দিদের পক্ষ থেকে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।
কারাগারের এই অনিয়ম ও অনৈতিক বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কারাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত এহসান মুরাদ জানান, বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং তিনি দ্রুত তদন্ত করে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























