গোপালগঞ্জের বিমান কর্মকর্তা মাসুদা খানম, পি#৩৬৫০০, সহকারী ব্যবস্থাপক, গ্রাউন্ড সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট। বৃহত্তর ফরিদপুর-গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগের প্রতাপশালী দোসর মাসুদা খানম বর্তমানে বিএনপি সরকারের আমলে এখন দ্বিগুণ প্রভাব বিস্তার করে চলছে। নিজেকে বিএনপির একনিষ্ঠ মতাদর্শী বলে দাবি করছে। বিমানের গ্রাহক সেবা ডিপার্টমেন্টে গোপালগঞ্জের মাসুদা খানম শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ডা. এস এ মালেকের সুপারিশে ১৯৯৯ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগদান করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগের সময় সে সুধা সদনে যাতায়াতের বিষয়ে সহকর্মীদের গর্ব করে বলত। শেখ হাসিনা নাকি তাকে ‘মিনা’ বলে ডাকত। পুতুলের শ্বশুর, শেখ হাসিনার বেয়াই খন্দকার মোশাররফের ভাগ্নি হিসেবে সর্বত্র পরিচয় দিত মাসুদা খানম।
বিমানের গ্রাহক সেবা বিভাগের ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদানের মানদণ্ড ছিল এসএসসি, এইচএসসি ও ডিগ্রিতে যেকোনো একটিতে প্রথম বিভাগ এবং তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না। এবং নির্ধারিত বয়সের মধ্যে আবেদন করার যোগ্যতা থাকতে হবে। শোনা যায় যে, মাসুদা খানমের বিমানে চাকরির আবেদন করার বয়স ছিল না। মাসুদা তার এসএসসির সার্টিফিকেটে জন্মতারিখ জালিয়াতি করেছে। সেখানেও সে তার সার্টিফিকেট জালিয়াতি করে বয়স কম দেখিয়ে বিমানে আবেদন করেছে। মাসুদা খানমের শিক্ষাগত সনদ পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু জালিয়াতি লক্ষ্য করা যায়। এসএসসি সনদে হাতের লেখা দুই রকমের। জন্মতারিখ ঘষামাজা। ফরিদপুরের একটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় হতে ১৯৮৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল। এইচএসসি পরীক্ষার সনদটি বেশ রহস্যজনক।
যেহেতু এসএসসি পাস করেছে ১৯৮৫ সালে, সুতরাং ১৯৮৭ সালে এইচএসসি পাস করার কথা। দেখা যায়, দীর্ঘদিন গ্যাপের পর বিজ্ঞান বিভাগ হতে এইচএসসি পাস করেছে নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালে, বান্দরবানের লামা কলেজ হতে বিজ্ঞান শাখায় ‘প্রথম বিভাগে’ এবং সনদে ‘নিয়মিত’ বানানটি ভুল ও সনদের নিচে ১৯৯১ সাল লেখাটি ঘষামাজা! ১৯৮৫ সালে এসএসসি, কিন্তু ১৯৯১ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে নিয়মিত ডিক্লারেশন রহস্যজনক। দীর্ঘ ৬ বছর পর এসএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী এইচএসসিতে বিজ্ঞান শাখা থেকে প্রথম বিভাগ প্রাপ্তি খুবই রহস্যজনক এবং রোল নম্বরের আগে ‘ম’ লেখা থাকে, মাসুদার এইচএসসি সার্টিফিকেটে সেটাও দেখা যায়নি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সম্মানের স্বার্থে তদন্তের দাবি রয়েছে। উক্ত সনদে হাতের লেখা তিন রকমের। ফরিদপুর হতে বান্দরবানের লামায় গিয়ে একজন ছাত্রী কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে নাকি।
বিমানে চাকরির জন্য সবগুলো সার্টিফিকেটে বয়স, নিজের নাম এবং বাবার নাম টেম্পারিং করে ম্যানেজ করে প্রথম বিভাগের সনদ সংগ্রহ করেছে—বিমান কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। ডিগ্রি পাসের সনদেও ঘষামাজা পরিলক্ষিত হয়। এবং সার্টিফিকেটের বাংলা লেখাগুলোর কোনো সৌন্দর্য এবং ভালো হাতের লেখার ছন্দ পরিলক্ষিত হয়নি। মাসুদা খানম ১৯৯৯ সালে ট্রাফিক শাখার গ্রাহক সেবায় মাত্র ১/২ বছর কাজ করেছেন।
বাকি প্রায় পুরো সময় উক্ত শাখার হোটেল বিল সেকশনে ডিউটি করে। বিমান শ্রমিক লীগের চাকরিচ্যুত সভাপতি মশিকুর রহমানের আড্ডা এবং পরামর্শের স্থান ছিল মাসুদা খানমের কক্ষটি। মাসুদা ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি হতে নভেম্বর ২০২২ সাল পর্যন্ত বিমান শ্রমিক লীগে পে-স্লিপের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা প্রদান করেছেন। ডিসেম্বর ২০২২ সালে মাসুদা খানম সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। পদোন্নতিপরবর্তী ঢাকার বাইরে বদলি ও শেরাটনে হোটেল বিল বাবদ ৩০ লাখ টাকা পরিশোধের জটিলতা দুদক পর্যন্ত গড়ালে সে ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে স্বেচ্ছায় বদলি হয়। ২০২৪-এর ১৪ আগস্ট এয়ারপোর্টে যেদিন তৎকালীন তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক আটক হন, সেদিন তার ডিউটি ট্রাফিক শাখায় না থাকা সত্ত্বেও মুখে মাস্ক পরে ফ্লাইট অপারেশন শাখা হতে চলে আসে।
সঙ্গে তার দ্বিতীয় স্বামী (তিনি সিভিল এভিয়েশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) টার্মিনালে আসেন। জুনাইদ পলক মাসুদার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়, ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে পলককে দেশত্যাগে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার জন্য এসেছিল। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এয়ারপোর্টে পলককে এয়ারপোর্ট থেকে আটক করে। গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদা এবং তার স্বামী ওই ভোরবেলা এয়ারপোর্টে আগমনের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেনি।
গোয়েন্দাদের জেরায় যুক্তিযুক্ত বক্তব্য স্পষ্ট করতে না পারায় দ্রুত সটকে পড়ে। পরবর্তীতে মাসুদার স্বামী তার ক্ষমতাবলে এয়ারপোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ওই দিনের সমস্ত তথ্য ডিলিট করে ফেলে। পলককে এয়ারপোর্ট পার করার বিনিময়ে উক্ত দম্পতির সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থবিনিময়ের কথা বিমান এবং সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবাই জানত। মাসুদা এবং ওর স্বামীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারে না। কথায় কথায় CAAB Pass ব্লক করে দেওয়ার হুমকি দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের খোলস পাল্টিয়ে বিএনপির অনুকম্পায় মাসুদা খানম পুনরায় গ্রাহক সেবা বিভাগে ফিরে আসে। মাসুদা কোনোদিন শিফটিং ডিউটি করত না এবং সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য কোনো শাখার কাজ সে জানে না। শুধুমাত্র হোটেল বিলিং সেকশনের কাজ করে যাচ্ছে। মাসুদাকে পুনরায় হোটেল বিলিং শাখায় পদায়নের জন্য সদ্য চাকরি হতে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া বিমান শ্রমিক নেতার চাপ ছিল।
হোটেল বিলিং সেকশনে পদায়ন না করা হলে সে আত্মহত্যার হুমকি ওই শ্রমিক নেতার মাধ্যমে। একপ্রকার অফিস অর্ডার না মেনে জোর করে সে হোটেল বিল শাখায় যোগদান করে কোনো চিঠি/রোস্টার ব্যতীত। জানা যায় যে, মাসুদার জন্মতারিখ সনদে ঘষামাজা রয়েছে। এনআইডিতে জন্মসাল এক রকম, মাসুদার স্বামীর সিভিল এভিয়েশনের পারিবারিক ডিক্লারেশনে জন্মতারিখ আরেকটা দেওয়া আছে। এখানেও রহস্যজনক দুই রকমের জন্মতারিখ। অথচ বিমান এবং সিভিল এভিয়েশন একই মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। মাসুদা খানমের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর তথ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে, যা বিমানবন্দর ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
মাসুদা তার পরিচালক স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরে স্পর্শকাতর এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ হলুদ সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেয়। ICAO Audit HSIA একটি KPI area। দীর্ঘদিন ধরে অডিট এবং সিকিউরিটি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পর ICAO মানদণ্ডে ঢাকা এয়ারপোর্ট ক্যাটাগরি-৩ মানদণ্ড থেকে ক্যাটাগরি-২ মানদণ্ডে এসেছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সিসিটিভি ফুটেজগুলো দিয়ে ICAO রিজিওনাল অফিসে কমপ্লেইন করে, তখন ঢাকা এয়ারপোর্টের ICAO সিকিউরিটির মানদণ্ডের অবস্থা কতটা ভয়ংকর হতে পারে? এই মুহূর্তেই ঢাকা বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকার নিরাপত্তা এবং সিসিটিভির বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষের নজরে নিয়ে আসা উচিত!
প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং স্বজনপ্রীতির প্রভাবে, যত্রতত্র সিসিটিভি ফুটেজগুলো এয়ারপোর্ট অথরিটির অনুমতি ছাড়া হলুদ সাংবাদিকদের কাছে হস্তান্তর আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নিরাপত্তার বিষয়গুলো সকলের নজরে নিয়ে আসা উচিত। মাসুদা খানম তার স্বামীর ক্ষমতার দাপটে বিমান স্টাফদের CAAB পাস কেড়ে নেওয়া ও ব্লক করার হুমকি দেয়। সরকার, প্রশাসন, দুদকে তার ক্ষমতাধর আত্মীয়স্বজন আছে—এ কথা বলে বেড়ায়। সর্বক্ষণ এয়ারপোর্টে বিশাল অদৃশ্য কালো হাতের প্রভাব বিস্তার করছে। গোপালগঞ্জের আওয়ামী দোসর, ফ্যাসিস্ট মাসুদা খানম এখন বিএনপি আমলেও বেশ দাপট দেখিয়ে চলছে।
ভুয়া, টেম্পারিং, জাল সার্টিফিকেট দিয়ে গত ২৭ বছর ধরে দাপটের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো বেকারসমৃদ্ধ দেশে ভালো, উচ্চমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ মানুষ সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়, অথচ মাসুদা খানমের মতো অযোগ্য, অশিক্ষিত, ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে চাকরি করে যাচ্ছে। মাসুদা খানমের সকল জালিয়াতি ও অপকর্মের সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















