লীগের দাপুটে দুর্নীতির ডন হিসেবে পরিচিত এবং তালুকদার আব্দুল খালেকের ভাতিজা—এমন পরিচয়ে আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোন অদৃশ্য শক্তির বলে তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন—এমন প্রশ্ন উঠেছে। বিগত স্বৈরাচারী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী নিয়াজ তানভীর তাঁর নেতৃত্বে গড়ে তোলা সিন্ডিকেট বাহিনীর মাধ্যমে গণপূর্ত বিভাগে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পর্দার আড়ালে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলম। গণপূর্ত বিভাগ ই/এম-৪ ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, আওয়ামী লীগ নেতাকে ভুয়া পিতা বানিয়ে প্রভাব খাটানো এবং অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগসহ নানা অভিযোগ থাকলেও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর নীরবতা নিয়ে সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সামনে আসার পরও তিনি কখনো শাস্তির আওতায় পড়েননি; বরং বারবার পুরস্কৃত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, কোন ক্ষমতার প্রভাবে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন? এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও তিনি কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন—তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, খুলনা সদরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াপাড়া নতুন রাস্তা এলাকার তালুকদার আব্দুল খালেক ও আখতারুন নেছার ছেলে হিসেবে নিয়াজ তানভীর আলমের পরিচয় উল্লেখ করা হয়। ২০০৯ সালে ২৮তম বিসিএস ক্যাডারে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
নিয়াজ তানভীর আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে তাঁর পারিবারিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে, পতিত লীগ সরকারের খুলনার রামপাল-মোংলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার আব্দুল খালেকের নাম ও তাঁর পিতার নাম একই হওয়ায় তিনি বিভিন্ন সময় নিজেকে তালুকদার আব্দুল খালেকের পুত্র হিসেবে পরিচয় দিতেন। আবার কোথাও তাঁকে ভাতিজা হিসেবেও পরিচয় দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শুধু লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য নিজের প্রকৃত পিতৃপরিচয় গোপন করে একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিজের বাবা হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। এর মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য ও কমিশনসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে আরও জানা যায়, ৪০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৭ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই তদন্তে ৩৭ জন প্রকৌশলীকে দায়ী করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে; তাঁদের মধ্যে নিয়াজ তানভীর আলমও ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
২০১৯ সালে মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে ৬৮টি লিফট স্থাপনের ক্ষেত্রে ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
গণপূর্ত ই/এম-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে কার পার্কিং শেড নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পওবিপ্র) মোঃ শফিকুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়াজ তানভীর আলমকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল—এমন দাবিও করা হয়েছে। এত অভিযোগের পরও তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
ই/এম-৩ থেকে বদলি হয়ে সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সচিবালয়ে নিম্নমানের ইলেকট্রনিক্স পণ্য ও সামগ্রী সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নিম্নমানের মালামালের কারণে আগুনের সূত্রপাতের বিষয়টি উঠে আসে এবং সেখানেও নিয়াজ তানভীরের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠে বলে দাবি করা হয়েছে।
২০০৯ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর আওয়ামী লীগের পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দ্রুত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান—এমন অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গভবনে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থের বিনিময়ে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিগত সময়ে একাধিক ঠিকাদার তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ এনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই কার্যকরভাবে তদন্তের মুখ দেখেনি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াতের তকমা লাগিয়ে অনেক প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে হয়রানি ও হেনস্তা করার অভিযোগও রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক বিতর্কিত প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ই/এম-৩ থেকে তাঁকে বদলি করার পর সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে প্রায় এক মাস দুই জায়গায় দায়িত্ব পালন করার অভিযোগও রয়েছে, যা সরকারি চাকরির বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গঠিত কথিত সিন্ডিকেটের অনেক সদস্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন শাস্তির আওতায় পড়লেও নিয়াজ তানভীর এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেশ কয়েকটি কাজেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী, সচিব ও নজরুল ইসলামের আশীর্বাদে তিনি বিভিন্ন সময় প্রভাব বিস্তার করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। একাধিক অভিযোগ ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো পর্দার আড়ালে রয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। টেন্ডারে অনিয়ম, কারচুপি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি এখনো ঘুষ ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে, চাকরিজীবনের আগে তাঁর পরিবারের তেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুসারে, তিনি বিলাসী জীবনযাপন করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে যে বেতন-ভাতা পান, তার তুলনায় তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, রাজধানীর সেগুনবাগিচার ৫ নম্বর কনকর্ড টাওয়ারের ৬/এ ফ্ল্যাটটি কয়েক কোটি টাকা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছে। তবে ভবনের কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বললে তিনি দাবি করেন, ‘স্যার’ সেখানে ভাড়া থাকেন এবং মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ভাড়া দেন। ফ্ল্যাটটি তাঁর নিজের না হলেও একজন নির্বাহী প্রকৌশলী কীভাবে মাসে ৭০ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে সেখানে বসবাস করেন—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
পরিবারের সদস্যদের চলাচলের জন্য তাঁর স্ত্রী শাকিলা ইসলামের নামে একটি দামি গাড়ি কেনার অভিযোগ রয়েছে। খুলনা শহরে একাধিক বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ জমি এবং রাজধানী ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তাঁর ছেলে আহনাফ তানভীর ও মেয়ে আইজা তানভীরের নামে এবং বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আইনের চোখ এড়ানোর জন্য তাঁর অধিকাংশ সম্পদ পিতা তালুকদার আব্দুল খালেক, মাতা আখতারুন নেছা, স্ত্রী শাকিলা ইসলাম, ছেলে আহনাফ তানভীর, মেয়ে আইজা তানভীর, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে বেনামে ক্রয় করা হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর নিজের স্বার্থে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য প্রভাব খাটিয়েছেন। তাঁদের দাবি, একজন ব্যক্তি যদি নিজের স্বার্থে নিজের পিতৃপরিচয় নিয়ে বিতর্কিত পরিচয় ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে ভোল পাল্টে বিএনপিপন্থী দাবি করে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। নিয়াজ তানভীরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মরত সাধারণ কর্মকর্তারা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















