ঢাকা ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আর কত দিন লাগবে, জানালেন জ্বালানি মন্ত্রী গ্যাসের দাম এক টাকাও বাড়ালে সরকার টিকতে পারবে না : নাহিদ ইসলাম শিবির করায় ববির এক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীকে ছাত্রদলের মারধর, অতঃপর চাকরিচ্যুত জুলাই দিবস পালন শেষে জাজিরা উপজেলা বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ১২ হাজার টাকার ঋণ, ১৩ লাখ টাকার মামলা; বালিয়াডাঙ্গীতে গ্রেপ্তার সুদ ব্যবসায়ী কুমিল্লায় সোহান হত্যা মামলায় বৃদ্ধ মিজানুর রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নওগাঁয় এআই কানেক্টেড ক্যামেরার সুফল: যশোরে স্পেশাল ড্রাইভে স্বর্ণ ছিনতাইকারী গ্রেফতার যুক্তরাষ্ট্রে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি’র সুযোগ পেলেন বেরোবি শিক্ষার্থী ইমন  রাজশাহীতে পুকুরে বিষ দিয়ে ১০ লাখ টাকার মাছ নিধন  পোশাকের আড়ালে ‘অসীম-গং’-এর মাদক ও ফিটিং বাণিজ্য!

৭৯৬ কোটি টাকার কর বিরোধে এনবিআর ও ইউনাইটেডের দুই প্রতিষ্ঠানের আইনি লড়াই

ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড থেকে লভ্যাংশের ওপর প্রায় ৭৯৬ কোটি টাকার কর পাওনা হয়েছে সরকারের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট বিষয়টি উদঘাটন করেছে। তবে কোম্পানি দুটি লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত দাবি করেছে। উদঘাটিত করের টাকা না দিয়ে ২০২৫ সালে তারা হাইকোর্টে মামলা করেছে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে কয়েকটি শুনানি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে পুনরায় শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আইনি লড়াইয়ে কার জয় হয়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

আয়কর অনুবিভাগের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সেপ্টেম্বরের শুনানিতে ইতিবাচক একটা ফল তারা পাবেন। বসে নেই কোম্পানি দুটির কর্মকর্তারাও। একটি সূত্রে জানা গেছে, বিপুল অংকের টাকা বাঁচাতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে তারা। সময়ক্ষেপণ তার একটি। প্রয়োজনে কোম্পানি দুটি অবসায়নও করতে পারে।

তবে ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক কুতুবউদ্দিন আকতার রশিদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘সময়ক্ষেপণের কোনো বিষয় নেই। আইনে জ্বালানি কোম্পানির আয়কে কর অব্যাহতি দেওয়া আছে।

ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড এতদিন কর অঞ্চল-৫ এর করদাতা ছিল। এখন তারা কর অঞ্চল -১৬ এর অধীনে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড আয়কর রিটার্নে ২০১৯-২০২০ থেকে ২০২৪-২০২৫ করবর্ষ পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৯৭৯ কোটি ৫৯ লাখ ১৯ হাজার ৪১৭ টাকা নগদ লভ্যাংশ আয় প্রদর্শন করেছে। ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড আয়কর রিটার্নে ২০১৮-২০১৯ থেকে ২০২৩-২০২৪ করবর্ষ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ৭৭ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭ টাকা নগদ লভ্যাংশ আয় প্রদর্শন করেছে।

কোম্পানি দুটি বিভিন্ন সহযোগী কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে বিনিয়োগের বিপরীতে ওই লভ্যাংশ আয় প্রাপ্ত হয়েছে। ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেডের এসব লভ্যাংশ আয়ের ওপর সরকারের কর পাওনা হয়েছে প্রায় ৭৯৬ কোটি টাকা।

তদন্তে যা পেলো আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট

এসআরও ১৮৮-আইন/আয়কর/২০০৯, তারিখ ১ জুলাই ২০০৯ মোতাবেক প্রদর্শিত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত দাবি করে আয়কর পরিশোধ করেনি কোম্পানি দুটি। এসআরওটি (নম্বর-১৮৮) পর্যালোচনা করেছে আয়কর গোয়েন্দা।

তদন্ত সংস্থাটির দাবি, যেসব প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০১২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শুরু হবে, সেসবের আয়ের ওপর তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ হতে পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসআরও ২৩৫-আইন/আয়কর/২০১১ তারিখ, ৬ জুলাই, ২০১১ খ্রিস্টাব্দের মাধ্যমে ২০১৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া কোম্পানির জন্য ওই কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হয়।

অর্থ্যাৎ এসআরও-১৮৮ এবং এসআরও-২৩৫ এর মাধ্যমে ৩০ জুন ২০১৩ তারিখের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে এমন কোম্পানির সব আয়কে কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা হয় ২০১৮ সালের ১৬ জুন। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগেই ২০১৩ সালের ১ জুলাই প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির আয়ের উপর কর অব্যাহতির বিষয়ে নতুন এসআরও-২১১-আইন/আয়কর/২০১৩ জারি করা হয়।

এসআরও-২১১ ও পরে সংশোধিত এসআরওগুলোর মাধ্যমে প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের উপর, বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ থেকে পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। করদাতা কোম্পানি ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০১৩ সালের ১ জুলাইয়ের পরে শুরু হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এসআরও ২১১-আইন/আয়কর/২০১৩ এর বিধান অনুযায়ী কর অব্যাহতি সুবিধা প্রাপ্য হবে।

এসআরও-২১১ অনুযায়ী কোম্পানির শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসার আয় ছাড়া আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ এর ধারা-২০ (বর্তমান আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ৩০) এ উল্লেখিত সব ধরনের আয়ের উপর আয়কর দিতে হবে।

আয়কর গোয়েন্দা বলছে, তদন্তকালে করযোগ্য ডিভিডেন্ড আয়কে কর মুক্ত হিসাবে দাবি করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে আইনানুগ ব্যাখ্যা, তথ্য-প্রমাণাদি দাখিলের জন্য আয়কর আইন, ২০২৩ এর ২০৪ ধারা অনুযায়ী লিখিত নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে করদাতা কোম্পানির চিফ একাউন্টস কন্ট্রোলার মো. সোহরাব আলী খান একটি লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেন।

এছাড়া বিভিন্ন তারিখে আয়কর গোয়েন্দার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে মৌখিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এ বিষয়ে কোম্পানির প্রতিনিধির মূল বক্তব্য হলো, ‘কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদান করা হয় তার মুনাফা বা লাভ থেকে। সে হিসাবে করদাতা কোম্পানি প্রাপ্ত লভ্যাংশের উপর কর দিতে দায়বদ্ধ নয়। কারণ কোম্পানির যে মুনাফা দিয়ে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়েছে, তা তার কর অব্যাহতি প্রাপ্ত ব্যবসা আয়ের মুনাফা।’

লিখিত ব্যাখ্যায় লভ্যাংশ আয়কে ব্যবসা আয় হিসেবে দাবি করা হয়েছে। করদাতা কোম্পানির প্রতিনিধির লিখিত ব্যাখ্যা আইনানুগ ও যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ ও আয়কর আইন -২০২৩ অনুযায়ী ব্যবসা আয় ও লভ্যাংশ আয় দুটি পৃথক খাতের আয় হিসেবে গণ্য। দুটি খাতের আয়ের উৎস, অনুমোদনযোগ্য খরচ ও নিট আয় পরিগণনা আইনের পৃথক ধারা দিয়ে অনুমোদন করা হয়। ফলে এক খাতের আয়কে অন্য খাতের আয় হিসাবে দাবি করার আইনানুগ সুযোগ নেই।

তদন্তকালে আয়কর গোয়েন্দা ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড যেসব সহযোগী কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ পেয়েছে, সেসব কোম্পানির ডিভিডেন্ড প্রদান ও উৎসে আয়কর কর্তন সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণাদি সংগ্রহ করে। সেসব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সহযোগী কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ইউপিজিডিসিএল), ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডকে লভ্যাংশ পরিশোধের সময় আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ (আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ১১৭) এর ৫৪ ধারার বিধান পরিপালন করা হয়নি।

কিন্তু অন্যান্য সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের কাছ থেকে আইনানুগভাবে প্রযোজ্য উৎসে আয়কর কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোম্পানির প্রতিনিধি মো. সোহরাব আলী খানের লিখিত জবাব এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অন্য প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার হোল্ডারদের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হয়।
এক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ নিজস্ব কোম্পানির ক্ষেত্রে আইনের অপব্যাখ্যা করে কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের থেকে বিধি মোতাবেক আয়কর কর্তন করা হয়েছে। করদাতা কোম্পানির অনুমোদিত প্রতিনিধির লিখিত ব্যাখ্যায় লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত ব্যবসা আয়ের অংশ হিসেবে দাবি যুক্তিযুক্ত এবং আইনানুগ হলে তা সব শেয়ার হোল্ডারদের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

সাধারণ অবস্থায় অর্থ্যাৎ কর অব্যাহতি সুবিধা না থাকলে যেকোনো কোম্পানিকে নিট আয়ের উপর প্রযোজ্য হারে আয়কর প্রদান করতে হয়। কর পরিশোধ পরবর্তী আয় থেকে ডিভিডেন্ড প্রদান করা হলে সেই লভ্যাংশের উপর শেয়ার হোল্ডারদের পৃথকভাবে কর প্রদান করতে হয়। কিন্তু কোম্পানি দুটির ক্ষেত্রে সরকার এসআরও দিয়ে কোম্পানির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা আয়ের উপর কর অব্যাহতি প্রদান করেছে। তবে কর পরিশোধ পরবর্তী আয় থেকে শেয়ার হোল্ডারদের প্রদত্ত লভ্যাংশ আয়কে কর অব্যাহতি প্রদান করেনি।

আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ৭৬ (আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৪৪(৪) (বি)) মোতাবেক বোর্ড, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোনো ব্যক্তিকে বা কোন শ্রেণির ব্যক্তিদের কর অব্যাহতি প্রদান করতে পারবে এবং যেকোনো কর অব্যাহতি বাতিল করতে পারবে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর অব্যাহতি প্রদান কিংবা বাতিলের ক্ষমতা প্রাপ্ত; বিধায় এসআরওতে যে ধরনের বিধান প্রদান করা হয়েছে সে মোতাবেক কর অব্যাহতি সুবিধা প্রাপ্ত হবে।

তদন্তকালে প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন সেক্টরের কয়েকটি কোম্পানির ডিভিডেন্ড আয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে দেখা যায়, ডরিন পাওয়ার লিমিটেড, বারাকা পাওয়ার লিমিটেড এবং শাহজী বাজার পাওয়ার লিমিটেড লভ্যাংশ বিতরণকালে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ধারা ৫৪ (আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ১১৭) অনুযায়ী প্রযোজ্য উৎসে আয়কর কর্তন করেছে এবং তাদের পরিচালকরা আয়কর আইন মোতাবেক লভ্যাংশের উপর আয়কর পরিশোধ করেছে।

এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার ও ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড বিদ্যমান এসআরও এবং আইনের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ প্রদেয় আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে গেছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আর কত দিন লাগবে, জানালেন জ্বালানি মন্ত্রী

৭৯৬ কোটি টাকার কর বিরোধে এনবিআর ও ইউনাইটেডের দুই প্রতিষ্ঠানের আইনি লড়াই

আপডেট সময় ০৩:০৯:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড থেকে লভ্যাংশের ওপর প্রায় ৭৯৬ কোটি টাকার কর পাওনা হয়েছে সরকারের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট বিষয়টি উদঘাটন করেছে। তবে কোম্পানি দুটি লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত দাবি করেছে। উদঘাটিত করের টাকা না দিয়ে ২০২৫ সালে তারা হাইকোর্টে মামলা করেছে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে কয়েকটি শুনানি হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে পুনরায় শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আইনি লড়াইয়ে কার জয় হয়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

আয়কর অনুবিভাগের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সেপ্টেম্বরের শুনানিতে ইতিবাচক একটা ফল তারা পাবেন। বসে নেই কোম্পানি দুটির কর্মকর্তারাও। একটি সূত্রে জানা গেছে, বিপুল অংকের টাকা বাঁচাতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে তারা। সময়ক্ষেপণ তার একটি। প্রয়োজনে কোম্পানি দুটি অবসায়নও করতে পারে।

তবে ইউনাইটেড গ্রুপের পরিচালক কুতুবউদ্দিন আকতার রশিদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘সময়ক্ষেপণের কোনো বিষয় নেই। আইনে জ্বালানি কোম্পানির আয়কে কর অব্যাহতি দেওয়া আছে।

ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড এতদিন কর অঞ্চল-৫ এর করদাতা ছিল। এখন তারা কর অঞ্চল -১৬ এর অধীনে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড আয়কর রিটার্নে ২০১৯-২০২০ থেকে ২০২৪-২০২৫ করবর্ষ পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৯৭৯ কোটি ৫৯ লাখ ১৯ হাজার ৪১৭ টাকা নগদ লভ্যাংশ আয় প্রদর্শন করেছে। ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড আয়কর রিটার্নে ২০১৮-২০১৯ থেকে ২০২৩-২০২৪ করবর্ষ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ৭৭ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭ টাকা নগদ লভ্যাংশ আয় প্রদর্শন করেছে।

কোম্পানি দুটি বিভিন্ন সহযোগী কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে বিনিয়োগের বিপরীতে ওই লভ্যাংশ আয় প্রাপ্ত হয়েছে। ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড এবং ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেডের এসব লভ্যাংশ আয়ের ওপর সরকারের কর পাওনা হয়েছে প্রায় ৭৯৬ কোটি টাকা।

তদন্তে যা পেলো আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট

এসআরও ১৮৮-আইন/আয়কর/২০০৯, তারিখ ১ জুলাই ২০০৯ মোতাবেক প্রদর্শিত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত দাবি করে আয়কর পরিশোধ করেনি কোম্পানি দুটি। এসআরওটি (নম্বর-১৮৮) পর্যালোচনা করেছে আয়কর গোয়েন্দা।

তদন্ত সংস্থাটির দাবি, যেসব প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০১২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শুরু হবে, সেসবের আয়ের ওপর তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ হতে পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসআরও ২৩৫-আইন/আয়কর/২০১১ তারিখ, ৬ জুলাই, ২০১১ খ্রিস্টাব্দের মাধ্যমে ২০১৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়া কোম্পানির জন্য ওই কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হয়।

অর্থ্যাৎ এসআরও-১৮৮ এবং এসআরও-২৩৫ এর মাধ্যমে ৩০ জুন ২০১৩ তারিখের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে এমন কোম্পানির সব আয়কে কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা হয় ২০১৮ সালের ১৬ জুন। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগেই ২০১৩ সালের ১ জুলাই প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির আয়ের উপর কর অব্যাহতির বিষয়ে নতুন এসআরও-২১১-আইন/আয়কর/২০১৩ জারি করা হয়।

এসআরও-২১১ ও পরে সংশোধিত এসআরওগুলোর মাধ্যমে প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের উপর, বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ থেকে পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। করদাতা কোম্পানি ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০১৩ সালের ১ জুলাইয়ের পরে শুরু হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এসআরও ২১১-আইন/আয়কর/২০১৩ এর বিধান অনুযায়ী কর অব্যাহতি সুবিধা প্রাপ্য হবে।

এসআরও-২১১ অনুযায়ী কোম্পানির শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসার আয় ছাড়া আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ এর ধারা-২০ (বর্তমান আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ৩০) এ উল্লেখিত সব ধরনের আয়ের উপর আয়কর দিতে হবে।

আয়কর গোয়েন্দা বলছে, তদন্তকালে করযোগ্য ডিভিডেন্ড আয়কে কর মুক্ত হিসাবে দাবি করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে আইনানুগ ব্যাখ্যা, তথ্য-প্রমাণাদি দাখিলের জন্য আয়কর আইন, ২০২৩ এর ২০৪ ধারা অনুযায়ী লিখিত নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে করদাতা কোম্পানির চিফ একাউন্টস কন্ট্রোলার মো. সোহরাব আলী খান একটি লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেন।

এছাড়া বিভিন্ন তারিখে আয়কর গোয়েন্দার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে মৌখিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এ বিষয়ে কোম্পানির প্রতিনিধির মূল বক্তব্য হলো, ‘কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদান করা হয় তার মুনাফা বা লাভ থেকে। সে হিসাবে করদাতা কোম্পানি প্রাপ্ত লভ্যাংশের উপর কর দিতে দায়বদ্ধ নয়। কারণ কোম্পানির যে মুনাফা দিয়ে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়েছে, তা তার কর অব্যাহতি প্রাপ্ত ব্যবসা আয়ের মুনাফা।’

লিখিত ব্যাখ্যায় লভ্যাংশ আয়কে ব্যবসা আয় হিসেবে দাবি করা হয়েছে। করদাতা কোম্পানির প্রতিনিধির লিখিত ব্যাখ্যা আইনানুগ ও যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ ও আয়কর আইন -২০২৩ অনুযায়ী ব্যবসা আয় ও লভ্যাংশ আয় দুটি পৃথক খাতের আয় হিসেবে গণ্য। দুটি খাতের আয়ের উৎস, অনুমোদনযোগ্য খরচ ও নিট আয় পরিগণনা আইনের পৃথক ধারা দিয়ে অনুমোদন করা হয়। ফলে এক খাতের আয়কে অন্য খাতের আয় হিসাবে দাবি করার আইনানুগ সুযোগ নেই।

তদন্তকালে আয়কর গোয়েন্দা ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড যেসব সহযোগী কোম্পানি থেকে লভ্যাংশ পেয়েছে, সেসব কোম্পানির ডিভিডেন্ড প্রদান ও উৎসে আয়কর কর্তন সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণাদি সংগ্রহ করে। সেসব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সহযোগী কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ইউপিজিডিসিএল), ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডকে লভ্যাংশ পরিশোধের সময় আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ (আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ১১৭) এর ৫৪ ধারার বিধান পরিপালন করা হয়নি।

কিন্তু অন্যান্য সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের কাছ থেকে আইনানুগভাবে প্রযোজ্য উৎসে আয়কর কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কোম্পানির প্রতিনিধি মো. সোহরাব আলী খানের লিখিত জবাব এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অন্য প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার হোল্ডারদের তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হয়।
এক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ নিজস্ব কোম্পানির ক্ষেত্রে আইনের অপব্যাখ্যা করে কর অব্যাহতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাধারণ শেয়ার হোল্ডারদের থেকে বিধি মোতাবেক আয়কর কর্তন করা হয়েছে। করদাতা কোম্পানির অনুমোদিত প্রতিনিধির লিখিত ব্যাখ্যায় লভ্যাংশ আয়কে করমুক্ত ব্যবসা আয়ের অংশ হিসেবে দাবি যুক্তিযুক্ত এবং আইনানুগ হলে তা সব শেয়ার হোল্ডারদের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

সাধারণ অবস্থায় অর্থ্যাৎ কর অব্যাহতি সুবিধা না থাকলে যেকোনো কোম্পানিকে নিট আয়ের উপর প্রযোজ্য হারে আয়কর প্রদান করতে হয়। কর পরিশোধ পরবর্তী আয় থেকে ডিভিডেন্ড প্রদান করা হলে সেই লভ্যাংশের উপর শেয়ার হোল্ডারদের পৃথকভাবে কর প্রদান করতে হয়। কিন্তু কোম্পানি দুটির ক্ষেত্রে সরকার এসআরও দিয়ে কোম্পানির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা আয়ের উপর কর অব্যাহতি প্রদান করেছে। তবে কর পরিশোধ পরবর্তী আয় থেকে শেয়ার হোল্ডারদের প্রদত্ত লভ্যাংশ আয়কে কর অব্যাহতি প্রদান করেনি।

আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ৭৬ (আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৪৪(৪) (বি)) মোতাবেক বোর্ড, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোনো ব্যক্তিকে বা কোন শ্রেণির ব্যক্তিদের কর অব্যাহতি প্রদান করতে পারবে এবং যেকোনো কর অব্যাহতি বাতিল করতে পারবে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর অব্যাহতি প্রদান কিংবা বাতিলের ক্ষমতা প্রাপ্ত; বিধায় এসআরওতে যে ধরনের বিধান প্রদান করা হয়েছে সে মোতাবেক কর অব্যাহতি সুবিধা প্রাপ্ত হবে।

তদন্তকালে প্রাইভেট পাওয়ার জেনারেশন সেক্টরের কয়েকটি কোম্পানির ডিভিডেন্ড আয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে দেখা যায়, ডরিন পাওয়ার লিমিটেড, বারাকা পাওয়ার লিমিটেড এবং শাহজী বাজার পাওয়ার লিমিটেড লভ্যাংশ বিতরণকালে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ধারা ৫৪ (আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ১১৭) অনুযায়ী প্রযোজ্য উৎসে আয়কর কর্তন করেছে এবং তাদের পরিচালকরা আয়কর আইন মোতাবেক লভ্যাংশের উপর আয়কর পরিশোধ করেছে।

এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার ও ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড বিদ্যমান এসআরও এবং আইনের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ প্রদেয় আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে গেছে।