ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক রথযাত্রার উদ্বোধনে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা দিলেন চীফ হুইপ ফ্যাসিস্ট আমলে শাহিন চেয়ারম্যানের সহযোগী হয়ে কেরানীগঞ্জে ব্যাপক ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে : পবিপ্রবি উপাচার্য বড়লেখায় জমি বিরোধ মামলা তুলে নিতে হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ রঞ্জু মিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ধামইরহাটে ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় গাছের ডাল থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফুটবলার মেসি-কেইন কেন ওমর সানিকে চাবুক মারতেন মৌসুমী?

এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয়

প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুকে পোস্ট করা, ইনস্টাগ্রামে রিল তৈরি করা কিংবা টুইটারে টুইট করার কোনো অভ্যাস আমার নেই। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিছু কথা বলার তাগিদ অনুভব করছি।

আপনারা কি জানেন, বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি কেন হচ্ছে না? কারণ আমাদের দেশের মানুষ নিজেই নিজের প্রকৃত উন্নয়ন চায় না। আজ “অধিকাংশ” শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকই চান তাদের সন্তান জিপিএ-৫ বা এ-প্লাস পাক। কিন্তু এই “অধিকাংশ” বাবা-মায়েরই তাদের সন্তান আসলেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করছে কিনা, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা বা উদ্বেগ নেই।

আমি এ কথা কেন বলছি? বলছি এই কারণে যে, বর্তমানে মানুষের—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের—মানসিকতাই এক ধরণের অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে ওয়ানশট ক্লাস (পরীক্ষার ঠিক আগে পুরো সিলেবাস বা বড় একটি অংশ একটিমাত্র দীর্ঘ ক্লাসের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে শেষ করার প্রক্রিয়া), বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু অংশ দাগিয়ে পড়া এবং গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার ওপর ভর করে পরীক্ষায় এ-প্লাস এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই শর্টকাট বা সহজ পথ খোঁজার অভ্যাসটি এখনও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে তারা পরীক্ষার আগে বেছে বেছে তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পড়ে যায় এবং হুবহু প্রশ্ন কমন পড়ার আশায় থাকে। আর যখন পরীক্ষায় সেই প্রশ্ন কমন আসে না, তখনই তাদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন একটু কঠিন কিংবা সামান্য ঘুরিয়ে করলেই শিক্ষার্থীদের মেজাজ গরম হয়ে যায়। বিগত কয়েক বছরে গতানুগতিক পড়াশোনা করে বিপুল সংখ্যক এ-প্লাস পাওয়া গেলেও, শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ডে সেই এ-প্লাসের যোগ্যতা কতটুকু, তা আসুন আমরা একটু পর্যবেক্ষণ করি।

বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা একটি কাল্পনিক চরিত্র বেছে নিই, যার নাম রাজু। রাজু নবম ও দশম শ্রেণিতে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে। এই দুই বছর সে মূল বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়েছে, নিজের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছে [বেসিক স্ট্রং করেছে], প্রতিটি বিষয় বুঝে বুঝে আয়ত্ত করেছে এবং নিজের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য অসংখ্য গাণিতিক ও যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করেছে। অন্যদিকে সেজু নামের আরেকজন শিক্ষার্থী ছিল, যে পড়াশোনায় অতটা মনোযোগী ছিল না। সে সারা বছর পড়াশোনার চেয়ে নিজের বিনোদন ও অন্যান্য কাজেই বেশি সময় ব্যয় করেছে। সে শুধু পরীক্ষার আগে নির্দিষ্ট কিছু অংশ দাগিয়ে পড়া এবং ওয়ানশট ক্লাস করেছে। উভয়েই যখন মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল, তখন দেখা গেল এক অদ্ভুত ফল। সেজু, যে কিনা শুধু পরীক্ষার আগে দাগানো পড়া আর ওয়ানশট ক্লাস করেছিল, সে সারা বছর মন দিয়ে পড়া রাজুর চেয়েও ভালো ফলাফল অর্জন করেছে! এই দৃশ্য দেখে রাজুর মন ভেঙে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তার চেয়ে তুলনামূলক দুর্বল ও কম পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার আগে কমন পড়ার ওপর নির্ভর করে তার চেয়েও ভালো ফল নিয়ে এলো!

এরপর দেশে राजनीतिक পটপরিবর্তন ও সরকারের পতন হলো। এলো নতুন সরকার এবং সেই সাথে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর প্রাপ্ত দুই মাস ছুটির মধ্যে রাজু এক মাস মানসিক প্রশান্তির জন্য বিশ্রাম নিল এবং বাকি এক মাস একটি ভালো কলেজে ভর্তির জন্য কঠোর পরিশ্রম করল। ফলশ্রুতিতে সে তার কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়ে গেল। এবার সে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার জন্য নিজেকে সব ধরনের বিভ্রান্তি ও বিনোদন থেকে দূরে সরিয়ে রেখে টানা দুই বছর শুধু পড়াশোনায় আত্মনিয়োগ করল; তার ইচ্ছা ছিল মাধ্যমিকের চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে আরও ভালো ফলাফল করা। কিন্তু সেই সেজু আবারও তার পুরনো অভ্যাসমতো পরীক্ষার আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও গতানুগতিক সাজেশনের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে লাগল।

অবশেষে এলো সেই পরীক্ষার দিন। আজ পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত প্রতিকূল; অতিবৃষ্টির কারণে চারিদিকে বন্যা দেখা দিয়েছে। রাজু ও সেজু দুজনেই বন্যার কবলে পড়লেও অনেক কষ্ট করে যথাসময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হলো এবং পরীক্ষা দিয়ে বের হলো। কিন্তু সেজু পরীক্ষায় কিছুই লিখতে না পারায় তীব্র হতাশায় ভুগছিল। পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর সাংবাদিকরা পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে সে তার পরীক্ষা খারাপ হওয়ার সব ক্ষোভ ও রাগ প্রতিকূল পরিবেশ, কঠিন প্রশ্ন এবং সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর ওপর ঝাড়তে লাগল। অন্যদিকে, রাজুর পরীক্ষা অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। সাংবাদিকরা যখন তাকে পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করল, সে শুধু হাসিমুখে বলল যে, সে পুরো বই পড়ে এসেছে এবং তার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। সাংবাদিকরা যখন তাকে এই প্রতিকূল ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার যৌক্তিকতা এবং এই নিয়ে তার কোনো ক্ষোভ আছে কিনা জিজ্ঞেস করল, সে অকপটে উত্তর দিল—না, তার কোনো ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ আসলে তাদেরই আছে, যাদের প্রস্তুতি ভালো ছিল না এবং পরীক্ষা খারাপ হয়েছে।

রাজু এবং সেজু দুজনেই কিন্তু একই প্রতিকূল পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছে এবং তাদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও অভিন্ন ছিল। অথচ একজনের মনে শিক্ষামন্ত্রী ও এই বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, আর অন্যজনের মনে কোনো ক্ষোভই নেই। এর অর্থ কী? এই ক্ষোভ কি সত্যিই পরিবেশ বা শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ লুকিয়ে আছে?

বাস্তব সত্য হলো, এই ক্ষোভের একমাত্র মূল কারণ হচ্ছে নিজের প্রস্তুতি পরীক্ষায় এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ পাওয়ার মতো উপযুক্ত না হওয়া।

নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পারছেন আমি ঠিক কোন স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি।

বর্তমানে আমাদের দেশের একদল শিক্ষার্থী ক্ষুব্ধ হয়ে আছে মূলত একটিমাত্র কারণে—তা হলো তাদের পরীক্ষা আশানুরূপ ভালো না হওয়া। আমি জানি, আমার এই স্পষ্ট কথার সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন, অনেকে হয়তো ক্ষুব্ধও হবেন। কিন্তু আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, যেসব শিক্ষার্থী এখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে, তাদের প্রত্যেককে যদি একটি করে এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ নিশ্চিত করে দেওয়া হয়, তবে তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই আন্দোলন বন্ধ করে ঘরে ফিরে যাবে। এমনকি, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি তাদের যে তীব্র ক্ষোভ ও রাগ রয়েছে, তা মুহূর্তে অশেষ ভালোবাসায় রূপান্তরিত হবে।

আমার এই বক্তব্য যদি কারও কাছে ভুল মনে হয়, তবে তাদের উদ্দেশ্যে আমি কিছু অতীত উদাহরণ দিতে চাই। ২০২২ এবং ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী ঠিক এবারের মতোই চরম কষ্ট ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। ২০২২ সালের বন্যায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের এবং ২০২৪ সালের প্রবল বন্যায় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষায় চরম ব্যাঘাত ঘটেছিল এবং তারা নানামুখী সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ কিংবা ২০২৪ সালে তো কোনো শিক্ষার্থীকে এভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে দেখা যায়নি, কারও মনে এমন তীব্র ক্ষোভও ছিল না। তাহলে আজ হঠাৎ কেন এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ?

এর একমাত্র কারণ হলো, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের বন্যায় পরীক্ষা দিয়েও শিক্ষার্থীরা মনে মনে নিশ্চিত ছিল যে তাদের এ-প্লাস চলে আসবে; কারণ এটাই ছিল বিগতসি ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের প্রশ্ন ফাঁসের কিংবা খাতা মূল্যায়নে শৈথিল্য দেখানোর প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রকৃত কারণ হলো, তারা দীর্ঘ বছর পর এবার আসলেই একটি প্রকৃত ও মানসম্মত পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে এবং এতেই তারা ক্ষুব্ধ। তারা প্রকৃতপক্ষে এ-প্লাস পাওয়ার মতো মেধা ও যোগ্যতা অর্জন করেনি। আর যারা সত্যিই মেধাবী ও পরিশ্রমী, তাদের মনে এই পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষোভ নেই।

আমি জানি, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর জন্য এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ বিগত বছরগুলোতে আমাদের সমাজের মানুষের মানসিকতায় এক নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, দেশের সামগ্রিক পরিবেশ বদলে গেছে। এই পরিবর্তিত মানসিকতার সাথে লড়াই করে শিক্ষার প্রকৃত মানকে এগিয়ে নেওয়া সত্যিই এক জটিল চ্যালেঞ্জ। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ হয়তো তাকে সহজে গ্রহণ করতে চাইবে না, আবার তিনিও পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের ওপর আর প্রয়োগ করতে পারবেন না—বাস্তবতায় তা করতে দেওয়াও হবে না। বর্তমান প্রজন্ম এমন একজনকে খোঁজে, যার আমলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হবে অত্যন্ত সহজ, আর পাসের হার হবে আকাশচুম্বী। তবে কৃত্রিম উপায়ে বাড়ানো এই পাসের হার দিয়ে বাংলাদেশ আগামী একশ বছরেও প্রকৃত উন্নতির আলো দেখতে পাবে না। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষ এটাই চায়। তারা চায় আবারও ঘরে ঘরে তথাকথিত এ-প্লাসের বন্যা বয়ে যাক, ঘরে ঘরে তৈরি হোক সেজুর মতো ফাঁকিবাজ ও সুবিধাবাদী ছেলেমেয়ে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই এটা উপলব্ধি করতে চায় না যে, এই সেজুর মতো সস্তা ডিগ্রিধারীদের ভিড়ে আমরা রাজুর মতো প্রকৃত মেধাবীদের হারিয়ে ফেলছি। রাজুর মতো যোগ্য ছেলেরা যখন নিজেদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন পায় না, তখন তারা হতাশ হয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমায়।

তাই আমাদের এখন থেকেই দৃঢ়ভাবে মনে রাখতে হবে—শুধু এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ নামক একটি কাগুজে সনদের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে, আমাদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পেছনে ছুটতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বছর দেশে অনেক রাজুর মতো মেধাবী জন্ম নিলেও, সঠিক মূল্যায়নের অভাবে আমরা প্রতি বছরই এমন হাজারো অমূল্য রতনকে চিরতরে হারিয়ে ফেলব।

লেখক: তাফিফ আহসান
শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয়

এ-প্লাসের মরীচিকা বনাম প্রকৃত শিক্ষা: আমাদের মানসিকতার অবক্ষয়

আপডেট সময় ১২:৫৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুকে পোস্ট করা, ইনস্টাগ্রামে রিল তৈরি করা কিংবা টুইটারে টুইট করার কোনো অভ্যাস আমার নেই। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিছু কথা বলার তাগিদ অনুভব করছি।

আপনারা কি জানেন, বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি কেন হচ্ছে না? কারণ আমাদের দেশের মানুষ নিজেই নিজের প্রকৃত উন্নয়ন চায় না। আজ “অধিকাংশ” শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকই চান তাদের সন্তান জিপিএ-৫ বা এ-প্লাস পাক। কিন্তু এই “অধিকাংশ” বাবা-মায়েরই তাদের সন্তান আসলেই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করছে কিনা, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা বা উদ্বেগ নেই।

আমি এ কথা কেন বলছি? বলছি এই কারণে যে, বর্তমানে মানুষের—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের—মানসিকতাই এক ধরণের অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে ওয়ানশট ক্লাস (পরীক্ষার ঠিক আগে পুরো সিলেবাস বা বড় একটি অংশ একটিমাত্র দীর্ঘ ক্লাসের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে শেষ করার প্রক্রিয়া), বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু অংশ দাগিয়ে পড়া এবং গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার ওপর ভর করে পরীক্ষায় এ-প্লাস এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই শর্টকাট বা সহজ পথ খোঁজার অভ্যাসটি এখনও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে তারা পরীক্ষার আগে বেছে বেছে তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পড়ে যায় এবং হুবহু প্রশ্ন কমন পড়ার আশায় থাকে। আর যখন পরীক্ষায় সেই প্রশ্ন কমন আসে না, তখনই তাদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন একটু কঠিন কিংবা সামান্য ঘুরিয়ে করলেই শিক্ষার্থীদের মেজাজ গরম হয়ে যায়। বিগত কয়েক বছরে গতানুগতিক পড়াশোনা করে বিপুল সংখ্যক এ-প্লাস পাওয়া গেলেও, শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ডে সেই এ-প্লাসের যোগ্যতা কতটুকু, তা আসুন আমরা একটু পর্যবেক্ষণ করি।

বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা একটি কাল্পনিক চরিত্র বেছে নিই, যার নাম রাজু। রাজু নবম ও দশম শ্রেণিতে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে। এই দুই বছর সে মূল বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়েছে, নিজের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছে [বেসিক স্ট্রং করেছে], প্রতিটি বিষয় বুঝে বুঝে আয়ত্ত করেছে এবং নিজের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য অসংখ্য গাণিতিক ও যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করেছে। অন্যদিকে সেজু নামের আরেকজন শিক্ষার্থী ছিল, যে পড়াশোনায় অতটা মনোযোগী ছিল না। সে সারা বছর পড়াশোনার চেয়ে নিজের বিনোদন ও অন্যান্য কাজেই বেশি সময় ব্যয় করেছে। সে শুধু পরীক্ষার আগে নির্দিষ্ট কিছু অংশ দাগিয়ে পড়া এবং ওয়ানশট ক্লাস করেছে। উভয়েই যখন মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল, তখন দেখা গেল এক অদ্ভুত ফল। সেজু, যে কিনা শুধু পরীক্ষার আগে দাগানো পড়া আর ওয়ানশট ক্লাস করেছিল, সে সারা বছর মন দিয়ে পড়া রাজুর চেয়েও ভালো ফলাফল অর্জন করেছে! এই দৃশ্য দেখে রাজুর মন ভেঙে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তার চেয়ে তুলনামূলক দুর্বল ও কম পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার আগে কমন পড়ার ওপর নির্ভর করে তার চেয়েও ভালো ফল নিয়ে এলো!

এরপর দেশে राजनीतिक পটপরিবর্তন ও সরকারের পতন হলো। এলো নতুন সরকার এবং সেই সাথে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর প্রাপ্ত দুই মাস ছুটির মধ্যে রাজু এক মাস মানসিক প্রশান্তির জন্য বিশ্রাম নিল এবং বাকি এক মাস একটি ভালো কলেজে ভর্তির জন্য কঠোর পরিশ্রম করল। ফলশ্রুতিতে সে তার কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তির সুযোগও পেয়ে গেল। এবার সে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার জন্য নিজেকে সব ধরনের বিভ্রান্তি ও বিনোদন থেকে দূরে সরিয়ে রেখে টানা দুই বছর শুধু পড়াশোনায় আত্মনিয়োগ করল; তার ইচ্ছা ছিল মাধ্যমিকের চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে আরও ভালো ফলাফল করা। কিন্তু সেই সেজু আবারও তার পুরনো অভ্যাসমতো পরীক্ষার আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও গতানুগতিক সাজেশনের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে লাগল।

অবশেষে এলো সেই পরীক্ষার দিন। আজ পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত প্রতিকূল; অতিবৃষ্টির কারণে চারিদিকে বন্যা দেখা দিয়েছে। রাজু ও সেজু দুজনেই বন্যার কবলে পড়লেও অনেক কষ্ট করে যথাসময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হলো এবং পরীক্ষা দিয়ে বের হলো। কিন্তু সেজু পরীক্ষায় কিছুই লিখতে না পারায় তীব্র হতাশায় ভুগছিল। পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর সাংবাদিকরা পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে সে তার পরীক্ষা খারাপ হওয়ার সব ক্ষোভ ও রাগ প্রতিকূল পরিবেশ, কঠিন প্রশ্ন এবং সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর ওপর ঝাড়তে লাগল। অন্যদিকে, রাজুর পরীক্ষা অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। সাংবাদিকরা যখন তাকে পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করল, সে শুধু হাসিমুখে বলল যে, সে পুরো বই পড়ে এসেছে এবং তার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। সাংবাদিকরা যখন তাকে এই প্রতিকূল ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার যৌক্তিকতা এবং এই নিয়ে তার কোনো ক্ষোভ আছে কিনা জিজ্ঞেস করল, সে অকপটে উত্তর দিল—না, তার কোনো ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ আসলে তাদেরই আছে, যাদের প্রস্তুতি ভালো ছিল না এবং পরীক্ষা খারাপ হয়েছে।

রাজু এবং সেজু দুজনেই কিন্তু একই প্রতিকূল পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছে এবং তাদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও অভিন্ন ছিল। অথচ একজনের মনে শিক্ষামন্ত্রী ও এই বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ, আর অন্যজনের মনে কোনো ক্ষোভই নেই। এর অর্থ কী? এই ক্ষোভ কি সত্যিই পরিবেশ বা শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ লুকিয়ে আছে?

বাস্তব সত্য হলো, এই ক্ষোভের একমাত্র মূল কারণ হচ্ছে নিজের প্রস্তুতি পরীক্ষায় এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ পাওয়ার মতো উপযুক্ত না হওয়া।

নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পারছেন আমি ঠিক কোন স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি।

বর্তমানে আমাদের দেশের একদল শিক্ষার্থী ক্ষুব্ধ হয়ে আছে মূলত একটিমাত্র কারণে—তা হলো তাদের পরীক্ষা আশানুরূপ ভালো না হওয়া। আমি জানি, আমার এই স্পষ্ট কথার সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন, অনেকে হয়তো ক্ষুব্ধও হবেন। কিন্তু আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, যেসব শিক্ষার্থী এখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে, তাদের প্রত্যেককে যদি একটি করে এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ নিশ্চিত করে দেওয়া হয়, তবে তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই আন্দোলন বন্ধ করে ঘরে ফিরে যাবে। এমনকি, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি তাদের যে তীব্র ক্ষোভ ও রাগ রয়েছে, তা মুহূর্তে অশেষ ভালোবাসায় রূপান্তরিত হবে।

আমার এই বক্তব্য যদি কারও কাছে ভুল মনে হয়, তবে তাদের উদ্দেশ্যে আমি কিছু অতীত উদাহরণ দিতে চাই। ২০২২ এবং ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী ঠিক এবারের মতোই চরম কষ্ট ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। ২০২২ সালের বন্যায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের এবং ২০২৪ সালের প্রবল বন্যায় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষায় চরম ব্যাঘাত ঘটেছিল এবং তারা নানামুখী সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ কিংবা ২০২৪ সালে তো কোনো শিক্ষার্থীকে এভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে দেখা যায়নি, কারও মনে এমন তীব্র ক্ষোভও ছিল না। তাহলে আজ হঠাৎ কেন এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ?

এর একমাত্র কারণ হলো, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের বন্যায় পরীক্ষা দিয়েও শিক্ষার্থীরা মনে মনে নিশ্চিত ছিল যে তাদের এ-প্লাস চলে আসবে; কারণ এটাই ছিল বিগতসি ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের প্রশ্ন ফাঁসের কিংবা খাতা মূল্যায়নে শৈথিল্য দেখানোর প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রকৃত কারণ হলো, তারা দীর্ঘ বছর পর এবার আসলেই একটি প্রকৃত ও মানসম্মত পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে এবং এতেই তারা ক্ষুব্ধ। তারা প্রকৃতপক্ষে এ-প্লাস পাওয়ার মতো মেধা ও যোগ্যতা অর্জন করেনি। আর যারা সত্যিই মেধাবী ও পরিশ্রমী, তাদের মনে এই পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষোভ নেই।

আমি জানি, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর জন্য এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ বিগত বছরগুলোতে আমাদের সমাজের মানুষের মানসিকতায় এক নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, দেশের সামগ্রিক পরিবেশ বদলে গেছে। এই পরিবর্তিত মানসিকতার সাথে লড়াই করে শিক্ষার প্রকৃত মানকে এগিয়ে নেওয়া সত্যিই এক জটিল চ্যালেঞ্জ। বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ হয়তো তাকে সহজে গ্রহণ করতে চাইবে না, আবার তিনিও পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের ওপর আর প্রয়োগ করতে পারবেন না—বাস্তবতায় তা করতে দেওয়াও হবে না। বর্তমান প্রজন্ম এমন একজনকে খোঁজে, যার আমলে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হবে অত্যন্ত সহজ, আর পাসের হার হবে আকাশচুম্বী। তবে কৃত্রিম উপায়ে বাড়ানো এই পাসের হার দিয়ে বাংলাদেশ আগামী একশ বছরেও প্রকৃত উন্নতির আলো দেখতে পাবে না। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষ এটাই চায়। তারা চায় আবারও ঘরে ঘরে তথাকথিত এ-প্লাসের বন্যা বয়ে যাক, ঘরে ঘরে তৈরি হোক সেজুর মতো ফাঁকিবাজ ও সুবিধাবাদী ছেলেমেয়ে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই এটা উপলব্ধি করতে চায় না যে, এই সেজুর মতো সস্তা ডিগ্রিধারীদের ভিড়ে আমরা রাজুর মতো প্রকৃত মেধাবীদের হারিয়ে ফেলছি। রাজুর মতো যোগ্য ছেলেরা যখন নিজেদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন পায় না, তখন তারা হতাশ হয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমায়।

তাই আমাদের এখন থেকেই দৃঢ়ভাবে মনে রাখতে হবে—শুধু এ-প্লাস বা জিপিএ-৫ নামক একটি কাগুজে সনদের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে, আমাদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পেছনে ছুটতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বছর দেশে অনেক রাজুর মতো মেধাবী জন্ম নিলেও, সঠিক মূল্যায়নের অভাবে আমরা প্রতি বছরই এমন হাজারো অমূল্য রতনকে চিরতরে হারিয়ে ফেলব।

লেখক: তাফিফ আহসান
শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি