রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর একটি জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম আধুনিকায়ন প্রকল্পকে ঘিরে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের বিস্তৃত অভিযোগ। প্রায় ৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নামে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন গণপূর্ত অধিদফতরের ইএম ডিভিশন-৭ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামছুল আলম। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি প্রকল্পের কারিগরি বাস্তবায়নের বাইরে গিয়ে ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিল প্রণয়নসহ প্রায় সবকিছুতেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সংসদের অডিও ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, যাতে সংসদীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালিত হতে পারে এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রকল্পের শুরু থেকেই কারিগরি মান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দেওয়া নকশা ও সুপারিশগুলোকে পাশ কাটিয়ে শামছুল আলম নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ পরিচালনা করেন, যা প্রকল্পের গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়। শামছুল আলম এই ক্ষেত্রে মূল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিলেন। তিনি একদিকে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন, অন্যদিকে ঠিকাদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এই সিন্ডিকেটই প্রকল্পের কাজ বণ্টন, সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিল অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করত।
অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়ায় যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা অজুহাতে বাদ দিয়ে অদক্ষ ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মানের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও কাগজে-কলমে তাদেরকে উচ্চমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর পেছনে শামছুল আলমের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের দিকটি আরও উদ্বেগজনক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণ মানের হেডফোন, মাইক্রোফোন এবং অন্যান্য অডিও যন্ত্রপাতির দাম বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে বিল করা হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে যে পণ্য বাজারে কয়েক হাজার টাকায় পাওয়া যায়, তা প্রকল্পে কয়েকগুণ বেশি দামে দেখানো হয়েছে। এতে করে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, শামছুল আলম নিজেই অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বাজার থেকে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে প্রকল্পে সরবরাহ করতেন। এসব পণ্যকে কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে দেখানো হতো, যাতে উচ্চমূল্য আদায় করা যায়। এতে প্রকল্পের মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয় হয়েছে ব্যাপকভাবে।
এই অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে সংসদে সাউন্ড সিস্টেমে প্রতিনিয়ত ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। স্পিকারের মাইক্রোফোন, সংসদ সদস্যদের আসনের অডিও প্যানেলসহ বিভিন্ন জায়গায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যার ফলে বক্তব্য স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে না এবং যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটছে।
গত কয়েকটি অধিবেশনে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্পিকার একাধিকবার অধিবেশন মুলতবি করতে বাধ্য হন। এতে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও আলোচনায় বিলম্ব ঘটছে। সংসদ সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং তারা এই সমস্যার দ্রুত সমাধান দাবি করেছেন।
গণপূর্ত অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী হয়েও শামছুল আলম যেভাবে প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তার পেছনে শক্তিশালী একটি প্রভাবশালী মহলের সমর্থন রয়েছে বলেই তিনি এতদিন ধরেই এসব অনিয়ম করে পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, শামছুল আলমের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখলেই এই দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করা হলে বড় ধরনের একটি দুর্নীতি চক্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শামছুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে এই ঘটনায় গণপূর্ত অধিদফতরের অভ্যন্তরে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী মনে করছেন, এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এত বড় ধরনের অনিয়ম রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, শুধু বিভাগীয় তদন্তই নয়, প্রয়োজনে বিচারবিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমেও পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। এতে করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা যাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাতীয় সংসদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এখানে কোনো ধরনের আপস বা অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম আধুনিকায়ন প্রকল্পটি এখন এক বড় ধরনের দুর্নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শামছুল আলমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং নিম্নমানের কাজের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব আরও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহল এখন তাকিয়ে আছে—এই ঘটনায় আদৌ কোনো কার্যকর তদন্ত হবে কি না, এবং দোষীরা আইনের আওতায় আসবে কি না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















