ঢাকা ০৪:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খাড়া মোশাঘনিষ্ঠ শরিয়ত উল্লাহর নেতৃত্বে গ্রীন টিভির ক্যামেরাম্যানের ওপর হামলা ৪৫ হাজার টাকা বেতনের পাসপোর্ট কর্মকর্তার ৫৯ কোটির সম্পদ নওগাঁর সকল ফিলিং স্টেশনে অ্যাপে মিলছে জ্বালানী তেল রবি আজিয়াটার আর্থিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অনিয়ম তদন্ত করবে বিএসইসি হাজতখানায় শিরীন শারমিন, এজলাসে আইনজীবীদের ফটোসেশন একদিনে ইরানকে তছনছ করার হুমকি ট্রাম্পের, আদৌ কি সম্ভব? ব্রাহ্মণপাড়ায় সরকারি বাজারে উচ্ছেদ অভিযান, সরিয়ে দেওয়া হলো অবৈধ স্থাপনা, রাজউক এর ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোমিনের সম্পদের পাহাড় মাত্র সাত বছরে শতকোটি টাকার মালিক রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মনিরুজ্জামান এক উপাচার্যের ৫৪৭ দিনে ৪২৫ নিয়োগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এক উপাচার্যের ৫৪৭ দিনে ৪২৫ নিয়োগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ৫৪৭ দিন উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এই সময়ে ৪২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেকর্ড গড়েছেন সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এই ভিসির আমলে পাঁচটি সিন্ডিকেট বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয় এসব নিয়োগ।

প্রতিটি সিন্ডিকেট গড়ে ৮৫ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৬০ বছরে দায়িত্ব পালন করা অন্য ২০ উপাচার্যের কেউই অল্প সময়ে এত বেশি সংখ্যক নিয়োগ দেননি। জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উপাচার্য ভেঙেছেন প্রথাও। সিন্ডিকেটের বৈঠক ডেকেছেন শুক্রবার। সর্বশেষ বৈঠক করেছেন তিনি একুশে ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় বন্ধের দিনেও।

একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে একাধিকবার চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে অভিযান পরিচালনা করে। এতে নেতৃত্ব দেওয়া দুদক চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম বলেন, ‘আমরা কমিশন বরাবর রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে উপাচার্য প্রথমবারের মতো চবিতে চালু করেছিলেন নতুন এক ধারা। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি উপস্থাপনার দক্ষতাকেও যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় এনেছিলেন। তদবির কমাতে লিখিত, মৌখিক ও উপস্থাপনার সব ধাপ একই দিন সম্পন্ন করতেন। তাঁর শুরুটা এমন চমকপ্রদ হলেও শেষটা ছিল বিতর্কিত।

বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ১৬ মার্চ চবির নতুন উপাচার্য হন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। নিয়োগে অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত উপাচার্যের আমলে অনেক নিয়োগ হয়েছে। সে সব নিয়োগে বাস্তব প্রয়োজন কতটুকু ছিল তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার বলেন, ‘সব নিয়োগ দিয়েছি যোগ্যতার ভিত্তিতে। আমরা কোনো দলীয়করণ বা স্বজনপ্রীতি করিনি। নতুন দুটি হল চালু হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিয়োগ বেশি দিতে হয়েছে।’

নিয়োগের রেকর্ড 
অধ্যাপক ইয়াহ্‌ইয়া আখতার ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। চবির  রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন এ শিক্ষক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান গত ১৬ মার্চ। এই অল্প সময়ে তিনি রেকর্ড ৪২৫ জন নিয়োগ দেন।

তাঁর মতো নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে দায়িত্ব পালন করা অন্য ছয় উপাচার্যের বিরুদ্ধেও। কিন্তু তাদের আমলেও এত বেশি সংখ্যক নিয়োগ হয়নি।
২০০৯-১০ সালে আবু ইউসুফের আমলে ২১ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ পান ৮৮ জন। ২০১১-১৫ সালে আনোয়ারুল আজিমের আমল ছিল চার বছর। তখন নিয়োগ পান ৫৯৯ জন। ২০১৫-১৯ সালে উপাচার্য ছিলেন ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। তিনিও চার বছরে নিয়োগ দেন ৫৩২ জনকে। ২০১৯-২৪ সালে শিরীণ আখতারের আমলে সোয়া চার বছরে নিয়োগ পান ৩১৬ জন।

রেকর্ড নিয়োগে কারা কতজন
৪২৫ জনের মধ্যে শিক্ষক ১২২ জন, যা মোট নিয়োগের ২৯ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন শিক্ষক ৮১ জন, চবির স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১০ জন। বাকি ৩১ জনকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কর্মকর্তা নিয়োগ ২২ জন, ৫ শতাংশ। এদের সবাইকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ ২৮১ জন, মোট নিয়োগের ৬৬ শতাংশ।
চবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ১৮ মাসে ৪২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। জামায়াত-শিবিরের লোক দিয়ে দল ভারী করতেই এই আয়োজন করা হয়েছে।

স্বজন নিয়োগ
সম্প্রতি চবি ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ হয়েছেন মো. আবদুল কাইয়ুম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ভাই। একইভাবে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীমকে ফিন্যান্স বিভাগে, আরবি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিনের জামাতা নাইমুর হককে একই বিভাগে, শহীদ আব্দুর রব হলের প্রভোস্ট ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক একেএম আরিফুল হক সিদ্দিকীর স্ত্রী আফরোজ তাজিন একই বিভাগে এবং শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক বেগম ইসমত আরা হকের ছেলে হাসান মো. রাফি ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বুদ্ধিজীবী দিবসের একটি বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি হলে তাঁর পক্ষে জামায়াতপন্থি সাদা দল সংশ্লিষ্ট ১০১ জন শিক্ষক যে বিবৃতি দেন সেখানে বেগম ইসমত আরা হক, মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ও আরিফুল হক সিদ্দিকীর নামও উল্লেখ রয়েছে।
নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হাসান মো. রাফি বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা, প্রেজেন্টেশন দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছি। আমার নিয়োগ বোর্ডে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা কেউই জানতেন না আমার মা শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট।’

পছন্দের ব্যক্তি দিয়ে নিয়োগ বোর্ড
উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীম ফাইন্যান্স বিভাগে অস্থায়ীভাবে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ একাধিক বঞ্চিত প্রার্থী বলছেন, উপ-উপাচার্যের মেয়ে মেধা তালিকায় অনেক পেছনে ছিলেন। স্নাতক পর্যায়ে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৮০। কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সিজিপিএধারী প্রার্থী ছিলেন ১১ জন। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯৫, ৩ দশমিক ৯০, ৩ দশমিক ৮৯, ৩ দশমিক ৮৪, ৩ দশমিক ৮২ প্রাপ্ত আবেদনকারীও ছিলেন। এর পরও পছন্দের লোক দিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করায় শিক্ষক হয়েছেন মাহিরা।

এই নিয়োগে যে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ সদস্য ছিল সাদা দলের জামায়াতপন্থি শিক্ষক। এই বোর্ডের প্রধান ছিলেন উপাচার্য ইয়াহ্‌ইয়া নিজেই। বাকি সদস্যরা সবাই ছিলেন উপ-উপাচার্যের ফাইন্যান্স বিভাগের। আবার উপাচার্য ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের জন্য গঠন করেছেন অন্যরকম বোর্ড। সেখানে ফার্সি বিভাগের কোনো শিক্ষককে না রেখে চবির অন্য বিভাগ ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে নিয়োগ বোর্ডে রাখেন।

ফার্সি বিভাগের নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী মো. আকিব তখন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দের ব্যক্তিকে শিক্ষক করতেই এমন অপকৌশল নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৯ জনের মধ্যে চবির যে ১৩ জন প্রার্থী ছিলেন; তাদের সবাইকেই লিখিত পরীক্ষায় পাস করানো হয়নি।

উপ-উপাচার্যের মেয়ে মাহিরা শামীম বলেন, ‘আমার নিয়োগ বোর্ডে যারা ছিলেন, তারা কোন দলের তা আমার জানা নেই। আমি তাদের শিক্ষক হিসেবেই চিনি। তবে নিয়োগ বোর্ডে আমার বাবার প্রভাব ছিল না এবং সুপারিশও ছিল না।’
মাহিরা শামীমের বাবা ড. শামীম উদ্দিন বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ডে কি আওয়ামীপন্থি শিক্ষক থাকবে? জুলাই আন্দোলনের পরে সব বিশ্ববিদ্যালয়েই সাদা দলের শিক্ষকরা নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন। আমি সেই নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ছিলাম না। আর আমি প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকলে আমার মেয়ে কি নিয়োগ পেতে পারে না?’

পরিবর্তন আনা হয় নীতিমালায়
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আহমদ ইমরানুল আজিজ তালুকদার। ২০০৬-০৭ সেশনে তিনি শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হলে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক বলেন, আগে আবেদনের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ৩ দশমিক ৫০ গ্রেড পয়েন্ট দরকার হতো। এবার সেটি কমিয়ে করা হয়েছে ৩ দশমিক ৪০। নিয়োগ পাওয়া আহমদ ইমরানুলের রেজাল্ট ছিল ৩ দশমিক ৪২।
তবে আহমদ ইমরানুল বলেন, ‘আমার নিয়োগ নীতিমালা মেনেই হয়েছে। এটা ঠিক যে, নিয়োগের যোগ্যতা শিথিল করার পর আবেদন করেছি।’

নিয়োগের ১০ শতাংশ নোয়াখালীর
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৪২ জনের বাড়ি নোয়াখালী। এটা মোট নিয়োগের প্রায় ১০ শতাংশ। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. কামাল উদ্দিনের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। আরেক উপ-উপাচার্য  ড. শামীম উদ্দিনের বাড়িও সেনবাগে। এর প্রভাব পড়েছে চবির নিয়োগ কার্যক্রমেও। বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. নূর নবী, ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সাইদুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বাড়ি সুবর্ণচরে।

শিক্ষক হলেন উপ-উপাচার্যের সহগবেষক
প্রশ্ন উঠেছে ক্রিমিনোলজি বিভাগে আরিফ উল্লাহর নিয়োগ নিয়েও। তাঁর পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীনই নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ও উপ-উপাচার্য কামাল উদ্দিনের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করেন আরিফ। গত বছর ১৮ মার্চ তাদের যৌথ গবেষণা জমা হয়। ২৮ অক্টোবর তাদের গবেষণাপত্রটি ‘টেলর ও ফ্রান্সিস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।
কিন্তু এর ২২ দিন আগেই ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিয়োগ বোর্ডে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত থেকে নিজের সহগবেষককে শিক্ষক হিসেবে বেছে নেন কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি নিয়োগ বোর্ডে ছিলাম। সে আমার ছাত্র; তার সঙ্গে গবেষণা করা তো দোষের কিছু না।’

আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ডে উপ-উপাচার্য স্যার উপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁর কাছ থেকে আমি কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা পাইনি।’

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ক্রিমিনোলজির শিক্ষক
ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছিল, তাদের নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন নেই। এর পরও দল ভারী করতে সাইদুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয় ক্রিমিনোলজি বিভাগে। ওই বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের বিভাগে চার বছরে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে কোর্স মাত্র ৫০ মার্কের। এই ৫০ মার্কের কোর্সের জন্য একজন পূর্ণাঙ্গ শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। তবুও এক উপ-উপাচার্যের পছন্দের ব্যক্তি থাকায় তাঁকে নিয়োগ দিয়ে গেছেন সদ্য বিদায়ী উপাচার্য।’
নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক সাঈদুর রহমান বলেন, ‘আমার আর উপ-উপাচার্য কামাল স্যারের বাড়ি একই এলাকায়। আমার নিয়োগ বোর্ডে তিনি উপস্থিত ছিলেন। তবে কোনো প্রকার বিশেষ সুবিধা প্রদান করেননি।’

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি হলেন অধ্যক্ষ
সদ্য বিদায়ী উপাচার্যের সময়ে চবির ল্যাবরেটরি স্কুলে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নাম আব্দুল কাইয়ুম। দুর্নীতি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অভিভাবক কমিটির তৎকালীন নির্বাহী সদস্য মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল জানান, ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে কর্মরত অবস্থায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাইয়ুমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবুও রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের ভাই হওয়ার সুবাদে নিয়োগ পেয়েছেন।
অধ্যক্ষ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘সে সময় আমি সৌদির ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম। এ জন্য পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। নির্দোষ থাকায় আমাকে তারা গ্রেপ্তার করেনি। আমার বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা অপপ্রচার।’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই যেদিন আবেদন করেছিল, আমি সেদিনই বোর্ডের সভাপতির কাছে পদত্যাগ চাই। নিয়োগের দিন আমি উপস্থিত ছিলাম না।’

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খাড়া মোশাঘনিষ্ঠ শরিয়ত উল্লাহর নেতৃত্বে গ্রীন টিভির ক্যামেরাম্যানের ওপর হামলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এক উপাচার্যের ৫৪৭ দিনে ৪২৫ নিয়োগ

আপডেট সময় ০২:২৩:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ৫৪৭ দিন উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এই সময়ে ৪২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেকর্ড গড়েছেন সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এই ভিসির আমলে পাঁচটি সিন্ডিকেট বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয় এসব নিয়োগ।

প্রতিটি সিন্ডিকেট গড়ে ৮৫ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৬০ বছরে দায়িত্ব পালন করা অন্য ২০ উপাচার্যের কেউই অল্প সময়ে এত বেশি সংখ্যক নিয়োগ দেননি। জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উপাচার্য ভেঙেছেন প্রথাও। সিন্ডিকেটের বৈঠক ডেকেছেন শুক্রবার। সর্বশেষ বৈঠক করেছেন তিনি একুশে ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় বন্ধের দিনেও।

একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে একাধিকবার চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে অভিযান পরিচালনা করে। এতে নেতৃত্ব দেওয়া দুদক চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম বলেন, ‘আমরা কমিশন বরাবর রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে উপাচার্য প্রথমবারের মতো চবিতে চালু করেছিলেন নতুন এক ধারা। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি উপস্থাপনার দক্ষতাকেও যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনায় এনেছিলেন। তদবির কমাতে লিখিত, মৌখিক ও উপস্থাপনার সব ধাপ একই দিন সম্পন্ন করতেন। তাঁর শুরুটা এমন চমকপ্রদ হলেও শেষটা ছিল বিতর্কিত।

বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ১৬ মার্চ চবির নতুন উপাচার্য হন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। নিয়োগে অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত উপাচার্যের আমলে অনেক নিয়োগ হয়েছে। সে সব নিয়োগে বাস্তব প্রয়োজন কতটুকু ছিল তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার বলেন, ‘সব নিয়োগ দিয়েছি যোগ্যতার ভিত্তিতে। আমরা কোনো দলীয়করণ বা স্বজনপ্রীতি করিনি। নতুন দুটি হল চালু হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিয়োগ বেশি দিতে হয়েছে।’

নিয়োগের রেকর্ড 
অধ্যাপক ইয়াহ্‌ইয়া আখতার ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। চবির  রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন এ শিক্ষক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান গত ১৬ মার্চ। এই অল্প সময়ে তিনি রেকর্ড ৪২৫ জন নিয়োগ দেন।

তাঁর মতো নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে দায়িত্ব পালন করা অন্য ছয় উপাচার্যের বিরুদ্ধেও। কিন্তু তাদের আমলেও এত বেশি সংখ্যক নিয়োগ হয়নি।
২০০৯-১০ সালে আবু ইউসুফের আমলে ২১ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ পান ৮৮ জন। ২০১১-১৫ সালে আনোয়ারুল আজিমের আমল ছিল চার বছর। তখন নিয়োগ পান ৫৯৯ জন। ২০১৫-১৯ সালে উপাচার্য ছিলেন ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। তিনিও চার বছরে নিয়োগ দেন ৫৩২ জনকে। ২০১৯-২৪ সালে শিরীণ আখতারের আমলে সোয়া চার বছরে নিয়োগ পান ৩১৬ জন।

রেকর্ড নিয়োগে কারা কতজন
৪২৫ জনের মধ্যে শিক্ষক ১২২ জন, যা মোট নিয়োগের ২৯ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন শিক্ষক ৮১ জন, চবির স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১০ জন। বাকি ৩১ জনকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কর্মকর্তা নিয়োগ ২২ জন, ৫ শতাংশ। এদের সবাইকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ ২৮১ জন, মোট নিয়োগের ৬৬ শতাংশ।
চবি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ১৮ মাসে ৪২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। জামায়াত-শিবিরের লোক দিয়ে দল ভারী করতেই এই আয়োজন করা হয়েছে।

স্বজন নিয়োগ
সম্প্রতি চবি ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ হয়েছেন মো. আবদুল কাইয়ুম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ভাই। একইভাবে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীমকে ফিন্যান্স বিভাগে, আরবি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিনের জামাতা নাইমুর হককে একই বিভাগে, শহীদ আব্দুর রব হলের প্রভোস্ট ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক একেএম আরিফুল হক সিদ্দিকীর স্ত্রী আফরোজ তাজিন একই বিভাগে এবং শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক বেগম ইসমত আরা হকের ছেলে হাসান মো. রাফি ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বুদ্ধিজীবী দিবসের একটি বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি হলে তাঁর পক্ষে জামায়াতপন্থি সাদা দল সংশ্লিষ্ট ১০১ জন শিক্ষক যে বিবৃতি দেন সেখানে বেগম ইসমত আরা হক, মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ও আরিফুল হক সিদ্দিকীর নামও উল্লেখ রয়েছে।
নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হাসান মো. রাফি বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা, প্রেজেন্টেশন দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছি। আমার নিয়োগ বোর্ডে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা কেউই জানতেন না আমার মা শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট।’

পছন্দের ব্যক্তি দিয়ে নিয়োগ বোর্ড
উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের কন্যা মাহিরা শামীম ফাইন্যান্স বিভাগে অস্থায়ীভাবে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ একাধিক বঞ্চিত প্রার্থী বলছেন, উপ-উপাচার্যের মেয়ে মেধা তালিকায় অনেক পেছনে ছিলেন। স্নাতক পর্যায়ে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৮০। কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সিজিপিএধারী প্রার্থী ছিলেন ১১ জন। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯৫, ৩ দশমিক ৯০, ৩ দশমিক ৮৯, ৩ দশমিক ৮৪, ৩ দশমিক ৮২ প্রাপ্ত আবেদনকারীও ছিলেন। এর পরও পছন্দের লোক দিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করায় শিক্ষক হয়েছেন মাহিরা।

এই নিয়োগে যে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ সদস্য ছিল সাদা দলের জামায়াতপন্থি শিক্ষক। এই বোর্ডের প্রধান ছিলেন উপাচার্য ইয়াহ্‌ইয়া নিজেই। বাকি সদস্যরা সবাই ছিলেন উপ-উপাচার্যের ফাইন্যান্স বিভাগের। আবার উপাচার্য ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের জন্য গঠন করেছেন অন্যরকম বোর্ড। সেখানে ফার্সি বিভাগের কোনো শিক্ষককে না রেখে চবির অন্য বিভাগ ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে নিয়োগ বোর্ডে রাখেন।

ফার্সি বিভাগের নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী মো. আকিব তখন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দের ব্যক্তিকে শিক্ষক করতেই এমন অপকৌশল নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৯ জনের মধ্যে চবির যে ১৩ জন প্রার্থী ছিলেন; তাদের সবাইকেই লিখিত পরীক্ষায় পাস করানো হয়নি।

উপ-উপাচার্যের মেয়ে মাহিরা শামীম বলেন, ‘আমার নিয়োগ বোর্ডে যারা ছিলেন, তারা কোন দলের তা আমার জানা নেই। আমি তাদের শিক্ষক হিসেবেই চিনি। তবে নিয়োগ বোর্ডে আমার বাবার প্রভাব ছিল না এবং সুপারিশও ছিল না।’
মাহিরা শামীমের বাবা ড. শামীম উদ্দিন বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ডে কি আওয়ামীপন্থি শিক্ষক থাকবে? জুলাই আন্দোলনের পরে সব বিশ্ববিদ্যালয়েই সাদা দলের শিক্ষকরা নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন। আমি সেই নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ছিলাম না। আর আমি প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকলে আমার মেয়ে কি নিয়োগ পেতে পারে না?’

পরিবর্তন আনা হয় নীতিমালায়
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আহমদ ইমরানুল আজিজ তালুকদার। ২০০৬-০৭ সেশনে তিনি শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হলে সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক বলেন, আগে আবেদনের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ৩ দশমিক ৫০ গ্রেড পয়েন্ট দরকার হতো। এবার সেটি কমিয়ে করা হয়েছে ৩ দশমিক ৪০। নিয়োগ পাওয়া আহমদ ইমরানুলের রেজাল্ট ছিল ৩ দশমিক ৪২।
তবে আহমদ ইমরানুল বলেন, ‘আমার নিয়োগ নীতিমালা মেনেই হয়েছে। এটা ঠিক যে, নিয়োগের যোগ্যতা শিথিল করার পর আবেদন করেছি।’

নিয়োগের ১০ শতাংশ নোয়াখালীর
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৪২ জনের বাড়ি নোয়াখালী। এটা মোট নিয়োগের প্রায় ১০ শতাংশ। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. কামাল উদ্দিনের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। আরেক উপ-উপাচার্য  ড. শামীম উদ্দিনের বাড়িও সেনবাগে। এর প্রভাব পড়েছে চবির নিয়োগ কার্যক্রমেও। বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. নূর নবী, ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সাইদুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বাড়ি সুবর্ণচরে।

শিক্ষক হলেন উপ-উপাচার্যের সহগবেষক
প্রশ্ন উঠেছে ক্রিমিনোলজি বিভাগে আরিফ উল্লাহর নিয়োগ নিয়েও। তাঁর পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীনই নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ও উপ-উপাচার্য কামাল উদ্দিনের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করেন আরিফ। গত বছর ১৮ মার্চ তাদের যৌথ গবেষণা জমা হয়। ২৮ অক্টোবর তাদের গবেষণাপত্রটি ‘টেলর ও ফ্রান্সিস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।
কিন্তু এর ২২ দিন আগেই ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিয়োগ বোর্ডে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত থেকে নিজের সহগবেষককে শিক্ষক হিসেবে বেছে নেন কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি নিয়োগ বোর্ডে ছিলাম। সে আমার ছাত্র; তার সঙ্গে গবেষণা করা তো দোষের কিছু না।’

আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘নিয়োগ বোর্ডে উপ-উপাচার্য স্যার উপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁর কাছ থেকে আমি কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা পাইনি।’

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ক্রিমিনোলজির শিক্ষক
ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছিল, তাদের নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন নেই। এর পরও দল ভারী করতে সাইদুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয় ক্রিমিনোলজি বিভাগে। ওই বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের বিভাগে চার বছরে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে কোর্স মাত্র ৫০ মার্কের। এই ৫০ মার্কের কোর্সের জন্য একজন পূর্ণাঙ্গ শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। তবুও এক উপ-উপাচার্যের পছন্দের ব্যক্তি থাকায় তাঁকে নিয়োগ দিয়ে গেছেন সদ্য বিদায়ী উপাচার্য।’
নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক সাঈদুর রহমান বলেন, ‘আমার আর উপ-উপাচার্য কামাল স্যারের বাড়ি একই এলাকায়। আমার নিয়োগ বোর্ডে তিনি উপস্থিত ছিলেন। তবে কোনো প্রকার বিশেষ সুবিধা প্রদান করেননি।’

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি হলেন অধ্যক্ষ
সদ্য বিদায়ী উপাচার্যের সময়ে চবির ল্যাবরেটরি স্কুলে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নাম আব্দুল কাইয়ুম। দুর্নীতি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অভিভাবক কমিটির তৎকালীন নির্বাহী সদস্য মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল জানান, ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে কর্মরত অবস্থায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাইয়ুমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবুও রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের ভাই হওয়ার সুবাদে নিয়োগ পেয়েছেন।
অধ্যক্ষ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘সে সময় আমি সৌদির ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম। এ জন্য পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। নির্দোষ থাকায় আমাকে তারা গ্রেপ্তার করেনি। আমার বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা অপপ্রচার।’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই যেদিন আবেদন করেছিল, আমি সেদিনই বোর্ডের সভাপতির কাছে পদত্যাগ চাই। নিয়োগের দিন আমি উপস্থিত ছিলাম না।’