পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দনের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান পানি। আমাদের এই গ্রহের প্রায় ৭০ শতাংশজুড়ে আছে সাগর-নদী-হ্রদসহ পানির অসংখ্য উৎস। আর তাদের আছে নানা বিচিত্র রূপ। এর মধ্যে একটি রহস্যময় জায়গা আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার ন্যাট্রন লেক।
লাল পানির এই হ্রদ ‘জীবন্ত মমি’তে পরিণত করতে পারে প্রাণীদের।
অনেক জলাশয়কে ঐতিহাসিকভাবে পবিত্র মনে করে মানুষ—যেমন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গঙ্গা, যমুনা ও নর্মদা নদীকে পূজা করেন। তিব্বতের মানসসরোবর হ্রদ এবং গুজরাটের বিন্দু সরোবরকেও তারা পবিত্র মনে করেন। একইভাবে, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে পবিত্র জর্ডান নদী।
কলম্বিয়ার লেক গুয়াটাভিতা তো একধাপ এগিয়ে। লোকশ্রুতিতে পাওয়া যায় এখানে ‘এল ডোরাডো’ নামের এক সোনার শহর আছে। আর এই সব পবিত্র জলাশয়ের মাঝেই রয়েছে মারাত্মক প্রাণঘাতী তানজানিয়ার ন্যাট্রন লেক।
এর চোখধাঁধানো লাল রঙ এবং অতিক্ষারীয় পানি হ্রদের সংস্পর্শে আসা সবকিছুকে পাথরের মতো করে তোলে।
পূর্ব আফ্রিকার দুটি ক্ষারীয় হ্রদের একটি উত্তর তানজানিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এই ন্যাট্রন লেক। এর অদ্ভুত রঙ হাজার হাজার ফুট ওপর থেকেও দেখা যায়।
ভ্রমণ বিষয়ক পোর্টাল ব্র্যাডট গাইডসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগে এই জলাশয়ের জন্ম। বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূ-টেকটোনিক কার্যকলাপ শুধু এই হ্রদই নয়, এর ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত ‘ওল ডোইনিও লেঙ্গাই’ বা ‘ঈশ্বরের পাহাড়’ সৃষ্টি করেছে।
এই প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে হ্রদটিতে ক্যালসিয়াম বাইকার্বোনেট ও সোডিয়াম কার্বোনেটের মাত্রা অত্যন্ত বেশি। যা প্রাণীদের জন্য অভিশাপের মতো কাজ করছে।
বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক পোর্টাল লাইভ সাইন্স জানায়, আশপাশের পাহাড় থেকে এখনো লবণ ও খনিজ পদার্থ হ্রদে প্রবেশ করে। ‘হট স্প্রিং’ বা আগ্নেয়গিরির কাছে থাকা ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহের মাধ্যমে এই উপাদানগুলো হ্রদে মিশে যায়।
মজার বিষয় হলো, লেক ন্যাট্রন একা নয়, ‘লেক বাহি নামে’-এর একটি ভাইও আছে । এই দুটি ক্ষারীয় হ্রদই কোনো নদী বা সাগরে গিয়ে মেশে না। অর্থাৎ এগুলো ‘টার্মিনাল লেক’।
ছোট নদী ও ‘হট স্প্রিং’-এর মাধ্যমে পানির যোগান পাওয়া এই অগভীর হ্রদগুলোর তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে ৪১ সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।
যেভাবে ন্যাট্রন লেক প্রাণীদের পাথরে পরিণত করে
ফটোগ্রাফার নিক ব্র্যান্ডট ‘অ্যাক্রস দ্যা রেভেজড ল্যান্ড’ নামে ২০১৩ সালে প্রকাশিত বইয়ে ন্যাট্রন লেকের তীরে পাওয়া মৃত প্রাণীদের ছবি তুলে ধরেন। পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাওয়া এই প্রাণীগুলো যেন হঠাৎই কোনো দৈবশক্তিতে জমে গেছে।
ব্র্যান্ডট মৃত প্রাণীগুলোর যে ছবি তুলেছিলেন, তা দেখে মনে হয় তাদের জীবন্ত সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আসলে ন্যাট্রন লেকের লবণ ও খনিজসমৃদ্ধ পানির সংস্পর্শে এলে প্রাণীদের দেহ শুকিয়ে ‘প্রাকৃতিক মমিতে’ পরিণত হয়। এতে তাদের মাংস ও পালক শক্ত হয়ে পাথরের মতো দেখায়।
মৃত প্রাণীদের বিষয়ে ব্র্যান্ডট লিখেছেন, ‘আমি অপ্রত্যাশিতভাবে নানা ধরনের পাখি ও বাদুড়কে ন্যাট্রন লেকের তীরে ভেসে থাকতে দেখেছি। ঠিক কিভাবে বা কেন তারা মারা যায়, তা নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না।’
মৃত্যুর সঠিক কারণ না জানলেও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলে, ন্যাট্রন লেকের পানির পিএইচ মাত্রা ১০.৫— যা এই পরিবেশে অভিযোজিত নয় এমন প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি চোখ ও চামড়ায় জ্বালা সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণীদের মেরে ফেলে।
কেন মৃত প্রাণীরা পচে না?
হ্রদের পানিতে থাকা সোডিয়াম কার্বোনেটের আধিক্যের কারণে মৃত প্রাণীগুলো পচে না বরং পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক সংরক্ষণকারী হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন মিশরে মৃতদেহ সংরক্ষণের কাজে সোডিয়াম কার্বোনেট ব্যবহার করা হতো।
তবে প্রতিবেদনে বলা হলেও, ন্যাট্রন লেকের পানিতে পড়ামাত্র প্রাণীরা মারা যায় না। বরং এই পানি তাদের শরীরের চর্বি ও আর্দ্রতা শোষণ করে নেয়। ফলে তারা ধীরে ধীরে পানিশূন্য হয়ে মারা যায়। এরপর তাদের দেহ শক্ত হয়ে হ্রদের তীরে পড়ে থাকে।
প্রাণঘাতী কিন্তু প্রাণহীন নয়
লবণ ও খনিজ পদার্থের কারণেই মূলত হ্রদটি লাল রঙ ধারণ করে, কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ নয়। লবণপ্রিয় অণুজীব— হ্যালোআর্কিয়া এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়াও এই লাল রঙের জন্যও দায়ী। এই শৈবালই আবার লেসার ফ্লেমিংগো পাখিদের প্রধান খাদ্য।
এই সুন্দর গোলাপি রঙের পাখিরা অফুরন্ত খাদ্যভাণ্ডারের কারণে ন্যাট্রন লেককে তাদের প্রজননক্ষেত্র বানিয়েছে। এটি প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর কিন্তু চতুর কৌশল। ফ্লেমিংগোর পায়ের শক্ত আবরণ ও পালক এই লেকের পানিতে তাদের শরীর পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
অপরদিকে, হ্রদটি অন্য প্রাণীদের জন্য প্রাণঘাতী হওয়ায় ফ্লেমিংগোদের শিকার করার জন্য এখানে কেউ নেই। প্রজনন মৌসুমে লক্ষ লক্ষ ফ্লেমিংগো এই লাল হ্রদকে গোলাপি ও গাঢ় লাল রঙে রাঙিয়ে তোলে। পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ ফ্লেমিংগোর জন্ম হয় এই লেকের তীরে।
নিক ব্র্যান্ডটের ছবিতে ঈগল ও কবুতরও ছিল। তবে তারা এই লাল হ্রদে বসবাস বা খাদ্য সংগ্রহ করে না, বরং আশপাশের মিঠা বা লবণাক্ত জলাভূমিতে বসবাস করে। এই অঞ্চলে উইলডিবিস্ট, উটপাখি, পেলিকানসহ আরো অন্যান প্রাণীও দেখতে পাওয়া যায়।
অনলাইন ডেস্ক 

























