ঢাকা ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জামালপুরে ১০ বছরেও শুরু হয়নি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ নেত্রকোণায় দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নারী নিহত, আহত ২০ জঙ্গলে ২৭ বছর কাটিয়ে দেশে ফিরলেন নি‌খোঁজ মালয়েশিয়া প্রবাসী উল্টো পথে আসা পিকআপে অটোরিকশায় ধাক্কা, অন্তঃসত্ত্বাসহ আহত ৭ এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’ সদস্য হলেন ২ এমপি গুম-নির্যাতের পেছনে দায়ী শেখ হাসিনা : জেরায় সাক্ষী পটুয়াখালীতে এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় ৫৩৩ জন অনুপস্থিত বাংলাদেশি জাহাজকে কেন হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান? অপতথ্যের বিস্তার রোধে ইউনেস্কোর সহযোগিতা চাইলেন তথ্যমন্ত্রী ঢাকায় মা‌র্কিন রাষ্ট্রদূ‌তের ১০০ দিন : বাণিজ্য চুক্তিকে বললেন ‘ঐতিহাসিক’

৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ এনবিআর সদস্য বেলাল হোসাইনের

জ্ঞাত আয়-উৎসের বাইরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বর্তমান সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) এবং কাস্টমস বিভাগের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, “দুদক দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অনুসন্ধান করছিল। সেই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এনবিআরের সদস্য বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।”
দুদক সূত্র জানিয়েছে, বেলাল হোসাইন চৌধুরী সরকারি চাকরিতে থেকে দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ উপায়ে সম্পদ গড়ে তোলেন। তার নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যাংক আমানত এবং শেয়ার বিনিয়োগসহ মোট প্রায় ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার ঘোষিত আয়-উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত বেলাল হোসাইন চৌধুরী ২০০৫ সাল থেকে এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন।
দুদক বলেছে, তদন্তে দেখা গেছে, তিনি ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নিজের নামে এবং স্ত্রীর নামে একাধিক ব্যাংকে কোটি টাকার আমানত রাখেন, দামি গাড়ি ক্রয় করেন এবং রাজধানীর উত্তরা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দুইটি ফ্ল্যাটের মালিক হন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আসে। দুদকের ‘গোপন অভিযোগ সেল’-এ তার বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়ে- যেখানে বলা হয়, তিনি কাস্টমস ক্লিয়ারিং ও ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নিতেন এবং বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানি ক্লিয়ারেন্সে প্রভাব খাটাতেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুদকের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। তদন্তে তার ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, শেয়ার অ্যাকাউন্ট ও আয়কর রিটার্ন পর্যালোচনা করা হয়। অনুসন্ধান শেষে দেখা যায়, ঘোষিত আয়ের তুলনায় তার সম্পদ অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেড়ে গেছে।
দুদকের একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তার পদে থেকে যেভাবে সম্পদ অর্জন হয়েছে, তাতে ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট। শুধু নিজের নয়, পরিবারের সদস্যদের নামেও সম্পদ অর্জন করা হয়েছে, যা সাধারণত অর্থপাচারের একটি রুটিন কৌশল।”
এ ঘটনায় এনবিআরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দুদকের মামলার পর এনবিআরের ভেতরে চরম অস্বস্তি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
একজন অতিরিক্ত সদস্য বলেন, “এনবিআরে গত এক দশকে যারা উচ্চপদে ছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ এসেছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা হলো— এটি বড় বিষয়।”
আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, দুদকের মামলার পর অভ্যন্তরীণভাবে এনবিআরের চেয়ারম্যান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। শিগগিরই অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হতে পারে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী ১৯৯০ সালে কাস্টমস ক্যাডারে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন— যেমন কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রাম; কাস্টমস হাউস, ঢাকা; এবং এনবিআরের নীতি বিভাগ।
২০২৩ সালে তাকে সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিনি এনবিআরের ডিজিটাল ভ্যাট সিস্টেম (মূসক-২.০) বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি বৃত্তান্তে তাকে প্রযুক্তি-নির্ভর করব্যবস্থাপনার একজন “অভিজ্ঞ প্রশাসক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদোন্নতি পরবর্তী সময়ে তার সম্পদের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। এই সময়েই তিনি রাজধানীতে দুটি ফ্ল্যাট এবং একাধিক গাড়ি কেনেন বলে জানা গেছে।
দুদক সম্প্রতি রাজস্ব ও প্রশাসনিক সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দুদক এনবিআরের এক সাবেক সদস্য ও কাস্টমস কমিশনার মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ-এর বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগে মামলা করে। সেই মামলার তদন্ত এখনো চলমান। দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত) মো. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি রোধ করা দুদকের অগ্রাধিকার। আমরা এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চাই, যারা জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেন।” তিনি আরও বলেন, “এনবিআর হলো রাজস্ব সংগ্রহের মূল প্রতিষ্ঠান। এখানকার দুর্নীতি মানে দেশের রাজস্ব কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া। তাই এই খাতের দুর্নীতি রোধে কমিশন বিশেষ নজরদারিতে আছে।”
দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলমান। প্রাথমিকভাবে বেলাল হোসাইনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তদন্তে সম্পদের উৎসের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। দুদকের এক পরিচালক বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে তথ্য চেয়েছি। প্রমাণ পেলে তার সম্পদ জব্দের আবেদন করা হবে।” অন্যদিকে, সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা দুদকের মামলায় অভিযুক্ত হলে প্রশাসনিকভাবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, “মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে।”
করদাতা ও ব্যবসায়ী মহলে এই মামলার ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের এক পরিচালক বলেন, “এনবিআর কর্মকর্তা যদি নিজের কর-জবাবদিহিতা লঙ্ঘন করেন, তাহলে সাধারণ করদাতার ওপর কীভাবে ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে? এ ধরনের মামলা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।” অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, “দুদকের এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়, তবে শুধু মামলা নয়— আদালতে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির শিকড় দুর্বল করে। আমরা চাই, অভিযুক্তদের সম্পদ পুনরুদ্ধার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।”
গত কয়েক বছরে দুদক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে। বিশেষ করে, জুলাই ২০২৫ সালের পর থেকে সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনে জবাবদিহিতা জোরদারের উদ্যোগ শুরু হয়।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী যথাযথভাবে যাচাই করা হবে এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য দেখা গেলে দুদক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বেলাল হোসাইনের মামলাটি প্রশাসনের জন্য একটি ‘টেস্ট কেস’, কারণ এটি সরকারি উচ্চপদস্থ এক সদস্যের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য মামলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, “এই মামলা প্রমাণ করে, দুর্নীতি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়— প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এখন বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়, সেটিই দেখার বিষয়।”
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই মামলার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করেছেন— কর আদায়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার নিজস্ব সম্পদ অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
একজন করদাতা লিখেছেন, “আমরা কর দিই রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য, কিন্তু যারা সেই কর ব্যবস্থাপনা করেন, তারা যদি নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তবে এটি জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।”
দুদকের এই মামলাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পরই বোঝা যাবে, এনবিআরের এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা টেকসই।
তবে সরকারি দপ্তর, বিশেষ করে রাজস্ব বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এই মামলাটি একটি নজিরবহুল পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে— জনগণ, করদাতা ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে জবাবদিহিতা ও সততার সংস্কৃতি দৃঢ় হবে, এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জামালপুরে ১০ বছরেও শুরু হয়নি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ

৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ এনবিআর সদস্য বেলাল হোসাইনের

আপডেট সময় ০৮:২৩:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫

জ্ঞাত আয়-উৎসের বাইরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বর্তমান সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) এবং কাস্টমস বিভাগের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, “দুদক দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অনুসন্ধান করছিল। সেই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এনবিআরের সদস্য বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।”
দুদক সূত্র জানিয়েছে, বেলাল হোসাইন চৌধুরী সরকারি চাকরিতে থেকে দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ উপায়ে সম্পদ গড়ে তোলেন। তার নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, ব্যাংক আমানত এবং শেয়ার বিনিয়োগসহ মোট প্রায় ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার ঘোষিত আয়-উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত বেলাল হোসাইন চৌধুরী ২০০৫ সাল থেকে এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন।
দুদক বলেছে, তদন্তে দেখা গেছে, তিনি ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নিজের নামে এবং স্ত্রীর নামে একাধিক ব্যাংকে কোটি টাকার আমানত রাখেন, দামি গাড়ি ক্রয় করেন এবং রাজধানীর উত্তরা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দুইটি ফ্ল্যাটের মালিক হন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আসে। দুদকের ‘গোপন অভিযোগ সেল’-এ তার বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়ে- যেখানে বলা হয়, তিনি কাস্টমস ক্লিয়ারিং ও ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নিতেন এবং বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানি ক্লিয়ারেন্সে প্রভাব খাটাতেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুদকের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। তদন্তে তার ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, শেয়ার অ্যাকাউন্ট ও আয়কর রিটার্ন পর্যালোচনা করা হয়। অনুসন্ধান শেষে দেখা যায়, ঘোষিত আয়ের তুলনায় তার সম্পদ অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেড়ে গেছে।
দুদকের একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তার পদে থেকে যেভাবে সম্পদ অর্জন হয়েছে, তাতে ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট। শুধু নিজের নয়, পরিবারের সদস্যদের নামেও সম্পদ অর্জন করা হয়েছে, যা সাধারণত অর্থপাচারের একটি রুটিন কৌশল।”
এ ঘটনায় এনবিআরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দুদকের মামলার পর এনবিআরের ভেতরে চরম অস্বস্তি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
একজন অতিরিক্ত সদস্য বলেন, “এনবিআরে গত এক দশকে যারা উচ্চপদে ছিলেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ এসেছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা হলো— এটি বড় বিষয়।”
আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, দুদকের মামলার পর অভ্যন্তরীণভাবে এনবিআরের চেয়ারম্যান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। শিগগিরই অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হতে পারে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী ১৯৯০ সালে কাস্টমস ক্যাডারে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন— যেমন কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রাম; কাস্টমস হাউস, ঢাকা; এবং এনবিআরের নীতি বিভাগ।
২০২৩ সালে তাকে সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিনি এনবিআরের ডিজিটাল ভ্যাট সিস্টেম (মূসক-২.০) বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি বৃত্তান্তে তাকে প্রযুক্তি-নির্ভর করব্যবস্থাপনার একজন “অভিজ্ঞ প্রশাসক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদোন্নতি পরবর্তী সময়ে তার সম্পদের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। এই সময়েই তিনি রাজধানীতে দুটি ফ্ল্যাট এবং একাধিক গাড়ি কেনেন বলে জানা গেছে।
দুদক সম্প্রতি রাজস্ব ও প্রশাসনিক সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দুদক এনবিআরের এক সাবেক সদস্য ও কাস্টমস কমিশনার মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ-এর বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগে মামলা করে। সেই মামলার তদন্ত এখনো চলমান। দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত) মো. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি রোধ করা দুদকের অগ্রাধিকার। আমরা এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চাই, যারা জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেন।” তিনি আরও বলেন, “এনবিআর হলো রাজস্ব সংগ্রহের মূল প্রতিষ্ঠান। এখানকার দুর্নীতি মানে দেশের রাজস্ব কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া। তাই এই খাতের দুর্নীতি রোধে কমিশন বিশেষ নজরদারিতে আছে।”
দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলমান। প্রাথমিকভাবে বেলাল হোসাইনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তদন্তে সম্পদের উৎসের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। দুদকের এক পরিচালক বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে তথ্য চেয়েছি। প্রমাণ পেলে তার সম্পদ জব্দের আবেদন করা হবে।” অন্যদিকে, সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা দুদকের মামলায় অভিযুক্ত হলে প্রশাসনিকভাবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, “মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে।”
করদাতা ও ব্যবসায়ী মহলে এই মামলার ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের এক পরিচালক বলেন, “এনবিআর কর্মকর্তা যদি নিজের কর-জবাবদিহিতা লঙ্ঘন করেন, তাহলে সাধারণ করদাতার ওপর কীভাবে ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে? এ ধরনের মামলা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।” অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, “দুদকের এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়, তবে শুধু মামলা নয়— আদালতে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির শিকড় দুর্বল করে। আমরা চাই, অভিযুক্তদের সম্পদ পুনরুদ্ধার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।”
গত কয়েক বছরে দুদক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে। বিশেষ করে, জুলাই ২০২৫ সালের পর থেকে সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনে জবাবদিহিতা জোরদারের উদ্যোগ শুরু হয়।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী যথাযথভাবে যাচাই করা হবে এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য দেখা গেলে দুদক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বেলাল হোসাইনের মামলাটি প্রশাসনের জন্য একটি ‘টেস্ট কেস’, কারণ এটি সরকারি উচ্চপদস্থ এক সদস্যের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য মামলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, “এই মামলা প্রমাণ করে, দুর্নীতি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়— প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এখন বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়, সেটিই দেখার বিষয়।”
সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই মামলার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করেছেন— কর আদায়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার নিজস্ব সম্পদ অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
একজন করদাতা লিখেছেন, “আমরা কর দিই রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য, কিন্তু যারা সেই কর ব্যবস্থাপনা করেন, তারা যদি নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তবে এটি জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।”
দুদকের এই মামলাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পরই বোঝা যাবে, এনবিআরের এই শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা টেকসই।
তবে সরকারি দপ্তর, বিশেষ করে রাজস্ব বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এই মামলাটি একটি নজিরবহুল পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে— জনগণ, করদাতা ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে জবাবদিহিতা ও সততার সংস্কৃতি দৃঢ় হবে, এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।