স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জামালপুরে ২০১৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার হাতে নিয়েছিল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রায় শেষে হলেও নানা জটিলতায় এখনো শুরু হয়নি হাসপাতালের মূল ভবনের নির্মাণকাজ। অত্যন্ত প্রত্যাশিত এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে বেশ আগ্রহ। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, জটিলতা কেটে গেছে, খুব দ্রুতই ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হবে।
জামালপুরে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে জামালপুর ছাড়াও পার্শবর্তী জেলা শেরপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বেশ কিছু উপজেলার মানুষ এখানে আসেন স্বাস্থ্যসেবা নিতে। এই হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন করতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।
২০১৬ সালে শহরের মনিরাজপুর এলাকায় ৩০ একর কৃষি জমি অধিগ্রহণ করে শুরু হয় মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের কাজ। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এটার নাম দেওয়া হয় জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ইতোমধ্যে প্রকল্পে থাকা মেডিকেল কলেজের অ্যাকাডেমিক ভবন, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা আবাসিক ভবন, চিকিৎসকদের জন্য আলাদা আলাদা ডরমেটরি, স্টাফ নার্স ডরমেটরি, মর্গ, ইমারজেন্সি স্টাফ ডরমেটরি, নার্সিং কলেজের অ্যাকাডেমিক ভবন ও আবাসিক ভবন, মসজিদ, বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, চারটি রেসিডেন্সিয়াল অ্যাকোমোডেশন, অধ্যক্ষ ও পরিচালকের বাসভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। কিন্তু প্রশাসনিক নানা জটিলতায় এখনো শুরুই হয়নি হাসপাতালের মূল ভবনের নির্মাণকাজ। যে ভবনে থাকবে রোগীদের ওয়ার্ড, কেবিন, অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজিসহ অন্যান্য সুবিধা।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯শ ৫০ কোটি টাকা, যার মধ্যে হাসপাতালের মূল ভবন নির্মাণে খরচ হবে ২শ ৭১ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। হাসপাতালের সব অবকাঠামো নির্মাণ গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চলামান থাকায় এবং এত দীর্ঘসূত্রিতার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সুচিকিৎসা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে। একদিকে বর্তমানে জেনারেল হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপে চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে, অপরদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের ময়মনসিংহ মেডিকেল বা ঢাকায় রেফার্ড করা হচ্ছে। এতে ভোগান্তি যেমন রয়েছে তেমনি চিকিৎসা ব্যায় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। তা ছাড়া, অনেকেই মৃত্যুবরণ করছেন চিকিৎসা না পেয়ে। তাই জেলার ২৬ লাখ মানুষসহ আশপাশের জেলার মানুষও তাকিয়ে আছে জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রত্যাশিত সেবার দিকে।
মেলান্দহ থেকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আব্দুল কুদ্দুস (৪০) বলেন, আমরা বহু বছর আগেই শুনেছি আমাদের জেলাই একটি ৫০০ শয্যা হাসপাতাল হবে। হাসপাতালটি হলে আমাদের আর ময়মনসিংহ যেতে হবে না। কিন্তু কই? এখনো তো হলো না। এখনো আমদের এই হাসপাতালেই কত কষ্ট করে চিকিৎসা নিতে হয়। আর উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ হাসপাতালে যেতে হয়। যদি ৫০০ শয্যা হাসপাতাল চালু হয় তবে আমাদের কষ্ট অনেক কমে যাবে।
হামের চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর মা বলেন, এখানে আমরা অনেক কষ্টে বাচ্চা নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার মতো কোনো পরিবেশ নেই। ৫০০ শয্যার নতুন হাসপাতাল হবে এটা তো অনেক বছর আগেই শুনেছি। তবে এটা কি আগামী ৫০ বছরেও বাস্তবায়িত হবে?
ছোটঘর এলাকার মনোহারী দোকান মালিক জনি মিয়া (৩৫) বলেন, যখন শুনেছি এখানে হাসপাতাল হবে। তখনই এখানে ব্যবসা ভালো হবে ভেবে দোকানটা দিয়েছি। কিন্তু ১০ বছরেও এটা চালু হলো না। ১০ বছর থেকে আশায় আছি যে এখানে হাসপাতাল চালু হবে আর আমাদের ব্যবসাও ভালো হবে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন জামালপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ শেষ হলেও ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এতে জামালপুরবাসী আশাহত হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমরা যেন খুব দ্রুত মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পাই।
এ বিষয়ে জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. আবু সাঈদ মাহবুব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইতোমধ্যে মোট প্রকল্পের ৬৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে এখনো হাসপাতাল ভবনের কাজ শুরু হয়নি। কিছু জটিলতা ছিল কিন্তু এখন আর কোনো জটিলতা নেই। আশা করি, খুব দ্রুত হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হবে।
সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই নির্মিত হবে হাসপাতালের মূল ভবন, যাত্রা শুরু করবে জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, আর কাঙ্খিত সেবা পাবে রোগীরা, এখনো এমন স্বপ্নই দেখছেন জামালপুর ও আশেপাশের জেলার বাসিন্দারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















