ঢাকার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশপথ-মিরপুর, গাবতলী ও সাভার—এলাকার অসংখ্য আবাসিক হোটেল এখন কেবল রাতযাপনের স্থান নয়, বরং ভয়ঙ্কর এক অন্ধকার জগতের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
দেহব্যবসা, মাদক কারবার, জিম্মি বানিয়ে অর্থ আদায়, প্রতারণা—সব মিলিয়ে এই হোটেলগুলো এখন রাজধানীর অপরাধচক্রের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও মূল হোতারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং কিছু অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তার যোগসাজশে এ ব্যবসা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিচের হোটেলগুলো সরাসরি অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত
হোটেল আল মামুন, মিরপুর-১, মালিক: মামুন
হোটেল গোল্ডেন, মাজার রোড, মিরপুর-১- মালিক: সোহেল, জুলহাস
হোটেল প্রজাপতি, মিরপুর-১ মালিক: বাদশা, হারুন, জুলহাস, সোহেল
হোটেল নিউ লন্ডন প্যালেস আবাসিক, মিরপুর-১, মালিক: মারুফ
হোটেল গার্ডেন ভিউ, মিরপুর-১, মালিক: আজাদ
হোটেল পপুলার আবাসিক, গাবতলী মাজার রোড, মালিক: জসিম, জুলহাস, হারুন
হোটেল আল-বারাকা, গাবতলী মাজার রোড, নিয়ন্ত্রণে একই সিন্ডিকেট
হোটেল সিটি মহল, গাবতলী মাজার রোড, মালিক: বাদশা, জসিম, মুরাদ, জুলহাস
হোটেল জম জম, গাবতলী মাজার রোড, মালিক: সোহাগ, বকুল
আকাশ ছোঁয়া গেস্ট হাউজ, সাভার, মালিক: মো. জুলহাস, সবুজ মাহমুদ, আল-আমিন (বাদল)
রাজমহল গেস্ট হাউজ, সাভার, নিয়ন্ত্রণে একই সিন্ডিকেট
দিনের বেলায় কিছুটা নিস্তব্ধ থাকলেও রাত নামলেই এসব হোটেলে শুরু হয় অবৈধ লেনদেনের উৎসব।
প্রতিটি হোটেলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নির্দিষ্ট দালাল দল। তারা গাবতলী বাস টার্মিনাল, মিরপুরের সড়ক এবং সাভারের বাজার এলাকা থেকে গ্রাহক সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। ঘণ্টাভিত্তিক রুম ভাড়া ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে, তবে গোপনে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ও চলে।
অধিকাংশ নারীকে গ্রামের অসহায় পরিবার থেকে চাকরির প্রলোভনে এনে জোরপূর্বক নামানো হয় দেহব্যবসায়। কেউ কেউ দারিদ্র্যের কারণে যুক্ত হলেও তাদেরও সিন্ডিকেটের ভাগ দিতে হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো-অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের ব্যবহার। অনেকে কাজের প্রতিশ্রুতি পেয়ে ঢাকায় এসে পড়ে ভয়ংকর ফাঁদে।
এসব হোটেল শুধু যৌন ব্যবসার আড়াল নয়; বরং ইয়াবা, আইস, ফেনসিডিল ও গাঁজার পাইকারি ও খুচরা বাজার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা হোটেল মালিকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে এবং প্রতিদিনের আয় থেকে নির্দিষ্ট কমিশন দেয়।
আরেক ভয়াবহ কৌশল হলো অতিথিদের জিম্মি করা। দালালরা প্রথমে প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে হোটেলে নেয়, এরপর আপত্তিকর অবস্থায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদ অর্থ, মোবাইল ও ব্যাংক কার্ড ছিনিয়ে নেয়। অনেকে আটক হয়ে আত্মীয়স্বজনকে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ আদায়ে বাধ্য হন।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “গাবতলীতে নামার পর এক লোক হোটেলে নিয়ে যায়। হঠাৎ কয়েকজন ঢুকে পড়ে ছবি তোলে। পরে আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়। না দিলে ছবি ভাইরাল করার হুমকি দেয়।”
অভিযোগ রয়েছে, এসব হোটেল থেকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, এবং কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যের হাতে পৌঁছে।
ফলে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো অভিযান চালানো হলেও ধরা পড়ে কেবল নারী বা দালালরা—মূল হোতারা রয়ে যায় অক্ষত।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমাদের এলাকায় রাতে বের হওয়া ভয় লাগে। হোটেলের ভেতর থেকে অশ্লীল শব্দ, ঝগড়া, মাদকাসক্তদের চিৎকার শোনা যায়। পুলিশ জানে, তবু কিছু করে না।”
এসআই আমির হোসেনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন- স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—বারবার সংবাদ প্রকাশ, অভিযোগ ও তথ্য সরবরাহের পরও মিরপুর ও গাবতলী অঞ্চলের দায়িত্বরত এসআই আমির হোসেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি অভিযুক্ত হোটেল মালিকদের গ্রেপ্তার না করে রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—এই অপরাধচক্রকে রক্ষা করছে কারা?
মাদকাসক্তি ও দেহব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বহু তরুণের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হচ্ছে। আশপাশের এলাকায় নারীদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, শ্রমিক ও চাকরিজীবীরা প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে অস্ত্র কেনা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
রাজধানীর প্রবেশপথে অবস্থিত এই আবাসিক হোটেলগুলো এখন দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় হুমকি। দেহব্যবসা, মাদক কারবার ও জিম্মি বানিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধ বন্ধে প্রশাসনের আন্তরিক পদক্ষেপ, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের বিচারের আওতায় আনা এবং সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলনই পারে এ অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে।
সংবাদ শিরোনাম ::
রাজধানীতে অপরাধের নিরাপদ জায়গা আবাসিক হোটেল
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৪:৩৬:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
- ৯৬৯ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ


























