জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রশাসন থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন থামছে না। এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়ানোর অভিযোগ থাকলেও, পটপরিবর্তনের পর খোলস পাল্টে তিনি এখন বাগিয়ে নিয়েছেন সচিব পদ। সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে মাত্র তিন মাসের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে রেকর্ড পরিমাণ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। আর সেই অবৈধ অর্থের জোরেই তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিতর্কিত অতীত ও ছাত্রলীগী রাজনীতির অনুসারী: চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বেপরোয়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তাঁর ব্যাচমেটদের অনেকেই বারবার বদলি, পদায়ন ও নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি সিনিয়র সহকারী সচিব পদেই চাকরি শেষ করতে হয়েছে অনেকের। অথচ আবুল হাছানাতরা কারণে-অকারণে দলবেঁধে টুঙ্গীপাড়ায় গিয়ে শেখ মুজিবের মাজারে হাজিরা দিয়েছেন এবং শেখ হাসিনাকে খুশি রেখে দফায় দফায় পদোন্নতি ও আকর্ষণীয় পদায়ন ভোগ করেছেন। বিরোধীদল দমনের বিভিন্ন কলাকৌশল প্রয়োগ করে ফ্যাসিবাদের শিকড় মজবুত করতে তারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
খাদ্য অধিদপ্তর ও পরিবহন পুলে হরিলুট: ৫ আগস্টের পর রাতারাতি নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন সরকারের প্রভাবশালী মহলে ভিড়ে যান এই কর্মকর্তারা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আবুল হাছানাত প্রথম পদায়ন পান খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে। সেখানে ১১ মাসের মেয়াদে তিনি প্রায় শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তখনকার সরকারের এক প্রভাবশালী উপদেষ্টার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হতো। চার হাজার কোটি টাকার মডার্ন ফুড স্টোরেজ প্রকল্পের লুটপাটেও তার নাম আসে। তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, ডিপিপি সংশোধন না করেই মহেশ্বরপাশা সাইলোর ব্যয় ভেরিয়েশনের অবৈধ প্রস্তাব অনুমোদনে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। অনিয়ম ফাঁস হওয়ার পর বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে তিনি বিএমইটিতে বদলি হন। এর আগে ২০২২ সাল থেকে তিনি সরকারি পরিবহন পুলের কমিশনারের দায়িত্বেও ছিলেন। সেখানেও কেনাকাটার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপে তিন মাসের বেপরোয়া চাঁদাবাজি: খাদ্য অধিদপ্তর ও বিএমইটির পর গত ১৬ জুলাই মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে যোগ দেন। সেখানে মাত্র তিন মাস দায়িত্ব পালনকালেই তিনি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। অধিদপ্তরে গুঞ্জন ছিল, ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হুমায়ুন কবীর অচিরেই সচিব হবেন। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি দেশজুড়ে বিশ্বস্ত দালাল চক্র গড়ে তোলেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পদায়নের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দেওয়া হতো যে, চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে শাস্তিমূলক বদলি করা হবে এবং বেনামী অভিযোগ তৈরি করে দুদকে মামলা দেওয়া হবে। এই চাঁদাবাজির অর্জিত অর্থ দিয়েই সচিব পদটি তিনি ‘কিনে নিয়েছেন’ বলে প্রশাসনের অন্দরে তীব্র আলোচনা চলছে।
বঞ্চিতদের দীর্ঘশ্বাস ও প্রশাসনের অভ্যন্তরে ক্ষোভ: ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে সচিব করার মতো স্বাভাবিক যোগ্যতা বা জ্যেষ্ঠতা কোনোটিই এখন ছিল না, যেখানে ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের তালিকাও শেষের পথে। অতীতে তার গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগের কারণে সচিব পদের প্রস্তাব বারবার ফেরত এলেও শেষ পর্যন্ত সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি পদটি দখল করেছেন। এদিকে ১৭ বছর ধরে বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং জিয়া-খালেদা জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তারা যখন এই দৃশ্য দেখছেন, তখন তারা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে প্রশাসনকে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি: অভিজ্ঞমহলের মতে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতীত কর্মজীবন ও রাজনৈতিক পরিচয়ের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। পরিবহন কমিশনারের কেনাকাটা, খাদ্য অধিদপ্তর, বিএমইটি এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে তাঁর তিন মাসের কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়া। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা যদি নতুন পরিচয়ে অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্রভাব ধরে রাখেন, তবে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই অবিলম্বে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জোর দাবি উঠেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















