কৃষি উন্নয়ন ও মানসম্মত বীজ সরবরাহের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে বাস্তবায়িত একাধিক প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, দরপত্র কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল এবং কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলম।
ইব্রাহিম খলিলের দায়িত্বাধীন প্রায় ২৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নির্বাচন, সিড ড্রায়ার কেনাকাটা এবং উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে অনিয়ম হয়েছে। অন্যদিকে, মাহমুদুল আলমের সাবেক দায়িত্বাধীন প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পে অন্তত ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ধরন ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পৃথক হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি এবং তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
বিএডিসির বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার।অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে অনেক যোগ্য প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণে বাধার মুখে পড়ে। বিপরীতে, প্রকল্প পরিচালকের পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এছাড়া কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কার্যাদেশের বিনিময়ে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন।
এছাড়াও ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সিড ড্রায়ার সরবরাহসংক্রান্ত দুটি দরপত্রে অনিয়ম। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, Tender ID: 1178841 (MIEF/GD-19.01) এবং Tender ID: 1178840 (MIEF/GD-19.02)—এই দুটি দরপত্রের মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে কারসাজি করা হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সেগুলোকে ‘নন-রেসপন্সিভ’ দেখানো হয়। অন্যদিকে, Consent Merchant নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যদিও প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতির কারিগরি বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সংশ্লিষ্ট কার্যাদেশ বাতিল এবং দরপত্র মূল্যায়ন পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত Master Climate Solutions-এর BV 691TR মডেলের হিট এক্সচেঞ্জার নিয়েও আপত্তি তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, যন্ত্রটির হিটার ও ব্লোয়ারের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ধরনের অসংগতি থাকলে বীজ শুকানোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বীজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁরা যন্ত্রটির প্রকৃত সক্ষমতা ও দরপত্রের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করতে স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা, প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর দাবি জানিয়েছেন।
ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দরপত্রে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের কাজ পাওয়া, বিল অনুমোদন এবং ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়েছে। অভিযোগকারীরা এই প্রক্রিয়াকে একটি কথিত ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, ইব্রাহিম খলিলের দায়িত্বাধীন প্রকল্পে কয়েক মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের শতাধিক দরপত্র চলমান রাখার অভিযোগও উঠেছে। বিপুলসংখ্যক দরপত্র একযোগে আহ্বান করায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত, ব্যাংকসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন এবং কারিগরি প্রস্তাব তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে সাধারণ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে দরপত্রের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করা হলেও তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। অভিযোগকারীদের মতে, দরপত্রের সময়সূচি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং কার্যাদেশের তথ্য পর্যালোচনা করলে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
এছাড়াও ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে প্রকল্পের কেনাকাটা ও অবকাঠামোগত সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে সংস্কার বা নির্মাণকাজ দেখিয়ে বিল-ভাউচার প্রস্তুত করা হয়েছে, অথচ বাস্তবে কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।
ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে বিএডিসির আঞ্চলিক বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোতে বীজ আত্মসাৎ ও আর্থিক ক্ষতির ঘটনা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আটজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকার হাইব্রিড ধান ও গমের বীজ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এসব ঘটনার সঙ্গে প্রকল্প পর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের যোগসাজশের দাবিও করেছেন।
ইব্রাহিম খলিলের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও ক্রয়সংক্রান্ত যোগ্যতার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। এ বিষয়ে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা এবং বিভাগীয় তদন্তের তথ্য পর্যালোচনা করা দরকার।
এসব বিষয়ে ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে প্রকল্পের দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিএডিসির চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট দরপত্রের কার্যাদেশ পর্যালোচনা, আর্থিক নিরীক্ষা, কারিগরি পরীক্ষা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ সকল বিষয় জানতে প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিলের বক্তব্য জানতে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোন মতামত পাওয়া যায়নি।
মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
বিএডিসির কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলম প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি কথিত সিন্ডিকেট অন্তত ১২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, কমিশন বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম এবং নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত কমিশন বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র। ঠিকাদারদের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল দ্রুত ছাড় এবং অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের বিনিময়ে অর্থ আদায় করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে।
মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের একটি কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পের কাজ ও অর্থ বরাদ্দে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে বলে সূত্রে জানা জায়।
এছাড়াও মাহমুদুল আলমের দায়িত্বাধীন কৃষি বীজ বিপণন প্রকল্পে নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সরঞ্জামের গুণগত মান, ক্রয়মূল্য এবং কাজের বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে অসংগতি ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর মাহমুদুল আলমকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা বা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন।
বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগে দায়িত্ব পালন করলেও অতীতের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক অঙ্গনে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ অডিট ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া প্রকৃত দুর্নীতির চিত্র সামনে আসবে না। অভিযোগকারীদের মতে, প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকলেও তাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় না। প্রকল্পের ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব পালনকালে গৃহীত সিদ্ধান্তের স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তাঁর দায়িত্ব পালনকালের আয়, সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সূত্রে জানা যায় অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার এবং পরিবারসহ দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাহমুদুল আলম।
বিএডিসির প্রকল্পগুলো কৃষি উৎপাদন, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এসব প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা জরুরি।
সচেতন মহলের প্রত্যাশা, ইব্রাহিম খলিল ও মাহমুদুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করবে। দরপত্রের মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, সরঞ্জামের মান, প্রকল্পের ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক: 
























