ঢাকা ১১:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জনগণের প্রতিটি পয়সা দেশের স্বার্থে ব্যয় করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে দিল্লি যাচ্ছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোরহানউদ্দিনে যানজটে আটকে ফায়ার সার্ভিস, জরুরি সেবা নিয়ে শঙ্কা-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দুর্গাপূজায় টানা ৩ দিন বন্ধ ব্যাংক, শনিবার খোলা সার-বিদ্যুতের সংকট তুলে ধরে প্রতিপক্ষকে জামায়াত প্রার্থীর প্রশ্ন এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর সঙ্গে রাশেদ খানের সৌজন্য সাক্ষাৎ মাগুরায় রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হলো কৃষকের ১ হাজার কলাগাছ ধামরাইয়ে দুই অবৈধ ইটভাটায় অভিযান, দেড় লাখ টাকা জরিমানা না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন ষাটের দশকের অভিনেত্রী নাসিমা খান ওমরাহ করতে গিয়ে ফেরা হলো না, রিয়াদে হামলায় নিহত বাংলাদেশি শিক্ষক

অবিচার ছাপিয়ে সত্যের জয়: বঞ্চনার ১৭ বছর পর জনপ্রশাসন সচিব হলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী

ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দীর্ঘ আঁধার আর টানা সতেরো বছর ধরে বয়ে চলা দমবন্ধ করা এক বঞ্চনার নাম-মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের এই মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তা জীবনভর সততার মূল্য দিতে গিয়ে যেভাবে সহ্য করেছেন অবিচারের স্টিমরোলার, তা কেবল একজন মানুষের সংগ্রাম নয়; এটি রাষ্ট্রের এক দীপ্তিমান প্রদীপের তিলে তিলে নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েও কুয়াশা ভেদ করে ফের জ্বলে ওঠার এক অবর্ণনীয় ইতিহাস।

নোয়াখালীর উর্বর মাটি, নোয়াখালী জিলা স্কুল ও নোয়াখালী সরকারি কলেজের পাঠ চুকিয়ে যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রেখেছিলেন, তারুণ্যে তাঁর দীপ্তি ছিল অন্যরকম। শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সবুজ ঘাসের মাঠে ফুটবলের জাদুকরি পায়ে নোয়াখালী জেলা দল এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে মাঠ কাঁপানো এক অদম্য তরুণ ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রমাণ করেছিলেন জনবান্ধব প্রশাসন কাকে বলে। কিন্তু এরপরই জীবনের গতিপথ পাল্টে যায় এক রাজনৈতিক ঝড়ে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুর রহমান বাবরের পিএস হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এবং বিএনপির রাজনীতির আদর্শ ধারণ করার ‘অপরাধে’ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার তাঁর ওপর নেমে আসে খড়্গহস্ত হয়ে।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডি। টানা ১৭টি বছর তাঁকে আটকে রাখা হয় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) নামক এক রাজনৈতিক বন্দিশালায়। যে বয়সে একজন দক্ষ কর্মকর্তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখার কথা, সে বয়সে ফাইল তো দূরের কথা, তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল নিদারুণ অবহেলায়। কিন্তু এই দীর্ঘ ১৭ বছরের অপমান, হতাশা আর গুমোট অন্ধকারের মাঝেও কামরুজ্জামান চৌধুরীর মেরুদণ্ড একটুও নোয়ানো যায়নি। ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিএনপির দুর্দিনে, রাজপথের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে—বিশেষ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অন্যায় গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে ও মুক্তির দাবিতে রাজপথের সোচ্চার কণ্ঠগুলোর অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। ক্ষমতার লোভ যাঁকে কোনো দিন স্পর্শ করতে পারেনি, যিনি বুক চিতিয়ে লড়ে গেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সেই মানুষটির বুকজুড়ে কেবল জমে ছিল দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর এক বুক অভিমান।

অবশেষে দীর্ঘ লড়াই আর অন্তহীন প্রতীক্ষার পর কেটে যায় অমাবস্যার রাত। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ এক বছরের চুক্তিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে তাঁর কাঁধে অর্পিত হয় গুরুদায়িত্ব। দীর্ঘকাল ধরে স্থবির হয়ে থাকা স্বাস্থ্য খাতের জঞ্জাল দূর করতে তিনি নামেন এক অদম্য ব্রতে। অনিয়ম আর শৃঙ্খলার অভাবে ধুঁকতে থাকা স্বাস্থ্য খাতে তিনি ফিরিয়ে আনেন নতুন গতি, ত্বরান্বিত করেন জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক নানা পদক্ষেপ।

তাঁর সেই নিরলস শ্রম, সততা আর অনন্য প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সরকার তাঁকে আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদায়ন করে। ১৭ বছর ধরে ওএসডি করে রেখে যাঁকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল, আজ তিনিই সচিবালয়ের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে আসীন।

১৭ বছরের দীর্ঘ কান্না, অপমান আর ত্যাগের পর কামরুজ্জামান চৌধুরীর এই সুমহান বিজয় কেবল একটি পদের প্রাপ্তি নয়; এটি হলো অন্তহীন ধৈর্যের কাছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম পরাজয়। নোয়াখালীর মাঠ থেকে উঠে আসা এই ক্ষণজন্মা লড়াকু মানুষটি আজ সগৌরবে প্রমাণ করে গেছেন-শত অত্যাচার আর বঞ্চনা দিয়ে সত্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মুকুট পরে হাসিমুখে জয়ী হয় কেবল সততা আর আদর্শই।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জনগণের প্রতিটি পয়সা দেশের স্বার্থে ব্যয় করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

অবিচার ছাপিয়ে সত্যের জয়: বঞ্চনার ১৭ বছর পর জনপ্রশাসন সচিব হলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী

আপডেট সময় ০৭:৪৫:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দীর্ঘ আঁধার আর টানা সতেরো বছর ধরে বয়ে চলা দমবন্ধ করা এক বঞ্চনার নাম-মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের এই মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তা জীবনভর সততার মূল্য দিতে গিয়ে যেভাবে সহ্য করেছেন অবিচারের স্টিমরোলার, তা কেবল একজন মানুষের সংগ্রাম নয়; এটি রাষ্ট্রের এক দীপ্তিমান প্রদীপের তিলে তিলে নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়েও কুয়াশা ভেদ করে ফের জ্বলে ওঠার এক অবর্ণনীয় ইতিহাস।

নোয়াখালীর উর্বর মাটি, নোয়াখালী জিলা স্কুল ও নোয়াখালী সরকারি কলেজের পাঠ চুকিয়ে যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রেখেছিলেন, তারুণ্যে তাঁর দীপ্তি ছিল অন্যরকম। শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সবুজ ঘাসের মাঠে ফুটবলের জাদুকরি পায়ে নোয়াখালী জেলা দল এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে মাঠ কাঁপানো এক অদম্য তরুণ ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রমাণ করেছিলেন জনবান্ধব প্রশাসন কাকে বলে। কিন্তু এরপরই জীবনের গতিপথ পাল্টে যায় এক রাজনৈতিক ঝড়ে। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুর রহমান বাবরের পিএস হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এবং বিএনপির রাজনীতির আদর্শ ধারণ করার ‘অপরাধে’ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার তাঁর ওপর নেমে আসে খড়্গহস্ত হয়ে।

এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডি। টানা ১৭টি বছর তাঁকে আটকে রাখা হয় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) নামক এক রাজনৈতিক বন্দিশালায়। যে বয়সে একজন দক্ষ কর্মকর্তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখার কথা, সে বয়সে ফাইল তো দূরের কথা, তাঁকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল নিদারুণ অবহেলায়। কিন্তু এই দীর্ঘ ১৭ বছরের অপমান, হতাশা আর গুমোট অন্ধকারের মাঝেও কামরুজ্জামান চৌধুরীর মেরুদণ্ড একটুও নোয়ানো যায়নি। ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিএনপির দুর্দিনে, রাজপথের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে—বিশেষ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অন্যায় গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে ও মুক্তির দাবিতে রাজপথের সোচ্চার কণ্ঠগুলোর অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। ক্ষমতার লোভ যাঁকে কোনো দিন স্পর্শ করতে পারেনি, যিনি বুক চিতিয়ে লড়ে গেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সেই মানুষটির বুকজুড়ে কেবল জমে ছিল দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর এক বুক অভিমান।

অবশেষে দীর্ঘ লড়াই আর অন্তহীন প্রতীক্ষার পর কেটে যায় অমাবস্যার রাত। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ এক বছরের চুক্তিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে তাঁর কাঁধে অর্পিত হয় গুরুদায়িত্ব। দীর্ঘকাল ধরে স্থবির হয়ে থাকা স্বাস্থ্য খাতের জঞ্জাল দূর করতে তিনি নামেন এক অদম্য ব্রতে। অনিয়ম আর শৃঙ্খলার অভাবে ধুঁকতে থাকা স্বাস্থ্য খাতে তিনি ফিরিয়ে আনেন নতুন গতি, ত্বরান্বিত করেন জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক নানা পদক্ষেপ।

তাঁর সেই নিরলস শ্রম, সততা আর অনন্য প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ গত ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সরকার তাঁকে আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদায়ন করে। ১৭ বছর ধরে ওএসডি করে রেখে যাঁকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল, আজ তিনিই সচিবালয়ের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে আসীন।

১৭ বছরের দীর্ঘ কান্না, অপমান আর ত্যাগের পর কামরুজ্জামান চৌধুরীর এই সুমহান বিজয় কেবল একটি পদের প্রাপ্তি নয়; এটি হলো অন্তহীন ধৈর্যের কাছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম পরাজয়। নোয়াখালীর মাঠ থেকে উঠে আসা এই ক্ষণজন্মা লড়াকু মানুষটি আজ সগৌরবে প্রমাণ করে গেছেন-শত অত্যাচার আর বঞ্চনা দিয়ে সত্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মুকুট পরে হাসিমুখে জয়ী হয় কেবল সততা আর আদর্শই।