আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে সুশাসন, ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ, অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণ, নিয়োগে অনিয়ম, ব্যক্তিগত প্রচারণা এবং অনুমোদনহীন বিদেশ সফরের অভিযোগ উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাতে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ার পরও তিনি আইএফআইসি ব্যাংকের এমডি পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশ্নবিদ্ধ ঋণ অনুমোদন ও দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মো. মেহমুদ হোসেনকে আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিয়ম কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্যও জড়িত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতিবিভাগের (বিআরপিডি) সার্কুলার অনুযায়ী কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালক ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক বা পরিচালনাগত কাজে অংশ নিতে বা হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, আইএফআইসি ব্যাংকের পর্ষদ এই নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে।
বিতর্কিত কয়েকটি ঋণের অনিয়ম তদন্তে পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম ও স্বতন্ত্র পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হককে নিয়ে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি আটটি বৈঠক করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী গ্রহণ করে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিপালন বিভাগের প্রধান নিয়োগের সাক্ষাৎকার বোর্ডে অংশ নেওয়ার জন্য পরিচালকদের আরও ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। দুই খাতে মোট অতিরিক্ত সম্মানীর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রত্যেকে ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিন ব্যাংকের গুলশান, প্রিন্সিপাল ও নারায়ণগঞ্জ শাখাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা পরিদর্শন করেন। তিনি মেঘনা কর্পোরেশন, প্ল্যামি ফ্যাশন, সিলভার গ্রুপ এবং মার্স পলি অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজের মতো বড় করপোরেট গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক ক্ষমতায় অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রমাণ।
২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং ও কমিউনিকেশন বিভাগকে ব্যবহার করে সব শাখা ও উপশাখায় নিজের ছবি ও বাণী প্রদর্শনের নির্দেশ দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী এই কর্মকাণ্ডে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী মাসে একটি সাধারণ বোর্ড সভা হওয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচটি সভা আয়োজন করেছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিভিন্ন সাব-কমিটির সভার নামে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির মাত্র ছয়টি সভার জন্য পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সম্মানী নিয়েছেন। অডিট কমিটি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি ও নির্বাহী কমিটির নামে অসংখ্য অতিরিক্ত বৈঠক দেখিয়ে ব্যাংকের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে।
বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন পর্ষদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের মূল ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের অর্থে বিদেশ সফর করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের নামে বোর্ড সভা, বিমান ভাড়া, ভাতা ও হোটেল ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে কয়েক কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আনতে পারেনি। অথচ ২০১১ সাল থেকে যুক্তরাজ্য সফর, বোর্ড সভা ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে ব্যাংকের ৯ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঋণ পুনরুদ্ধারে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে আসা শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে হেড অব রিকভারি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের কপি পাওয়া যায়নি। হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনকে নিয়োগের সময় নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চেয়ারম্যান তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এক্সিম ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত হওয়া কিংবা অনিয়মে অভিযুক্ত কয়েকজনকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭টি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ শেয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের, ২১ দশমিক ২৩ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এবং দশমিক ৬৪ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
টানা দুই বছর ধরে লোকসানে থাকা আইএফআইসি ব্যাংক ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে।
এদিকে, ব্যাংকটির বর্তমান এমডি সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় দায়ের করা দুদকের মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি।
অভিযোগের সময় সৈয়দ মনসুর মোস্তফা আইএফআইসি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ও চিফ ক্রেডিট অফিসার ছিলেন। ঋণ অনুমোদন ও ছাড়পত্র প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার ভূমিকা নিয়ে দুদকের অনুসন্ধানে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে, গাজীপুরের শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৮৭ কোটি টাকার জমিকে কারসাজির মাধ্যমে ১ হাজার ২০ কোটি টাকা মূল্য দেখানো হয়। পরে ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ ব্যবহার করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের মধ্যে ২০০ কোটি টাকার এফডিআর দেখানো হলেও বাকি প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডসহ সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে সন্দেহজনক লেনদেন ও স্তরায়ণের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের মামলায় সালমান এফ রহমান, শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম, সৈয়দ মনসুর মোস্তফাসহ মোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার, ভুয়া দলিল ব্যবহার ও ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭(ক) ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১৮-এর ৪ ধারার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ, শাখা ও উপশাখা থেকে চেয়ারম্যানের ছবি ও ব্যক্তিগত প্রচারসামগ্রী অপসারণ, তদন্ত কমিটি ও প্রশিক্ষণের নামে নেওয়া অতিরিক্ত সম্মানী ফেরত দেওয়া এবং বিতর্কিত নিয়োগ পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে।
অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য সুশাসন, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। আইএফআইসি ব্যাংকে উঠে আসা অভিযোগগুলোর দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হলে গ্রাহক ও আমানতকারীদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংবাদ শিরোনাম ::
চেয়ারম্যান-এমডির দুর্নীতিতে সঙ্কটে আইএফআইসি ব্যাংক
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৪:১৬:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
- ৫১৮ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















