রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির দুটি বিদেশি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান— অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ মালয়েশিয়া এবং অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ সিঙ্গাপুর—এ দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তহবিল ব্যবহারে গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ উঠে এসেছে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।
তবে প্রতিবেদনে একাধিক সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), পরিচালক ও ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য উঠে এলেও তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির জবাবদিহি ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাত বছরের নিরীক্ষায় যা উঠে এসেছে
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পর্যালোচনায় তহবিল তছরুপ, প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বিধি লঙ্ঘন, অনুমোদনবিহীন ব্যয়, বোর্ড ভাতা গ্রহণ, তথাকথিত “পকেট ব্যাংকিং”, ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের একাধিক অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষকদের ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ড ব্যাংকিং নীতিমালা ও আর্থিক সুশাসনের পরিপন্থী এবং কিছু ক্ষেত্রে তা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
মালয়েশিয়া ইউনিটে কী ধরনের অনিয়ম?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ এসডিএন. বিএইচডি. মালয়েশিয়ার সাবেক সিইও সুলতান আহমেদ নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ করে নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিবারকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান।
এরপর তিনি প্রতিষ্ঠানের অর্থ থেকে—
চিকিৎসা ভাতা গ্রহণ,
সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়,
ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও টোল বিল,
যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া ভ্রমণ ব্যয়,
দোকান ভাড়ার অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ,
করেছেন বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বোর্ড সভার উপস্থিতি ভাতা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয়েও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুধু বোর্ড সভার ভাতা বাবদ অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত উত্তোলনের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
সাতটি আপত্তিতেই কোটি টাকার অনিয়ম
মালয়েশিয়া ইউনিটের নিরীক্ষায় মাত্র সাতটি আপত্তির মধ্যেই প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ১৬৮ রিঙ্গিত সমপরিমাণ আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধেই প্রায় ৫২ হাজার ৯৪৩ রিঙ্গিত অনিয়মের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া—
খালেদ মোরশেদ রিজভীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যয় ও বোর্ড ভাতা মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার ৫৮৪ রিঙ্গিত অনিয়ম,
লুৎফর রহমানর বিরুদ্ধে ৬ হাজার রিঙ্গিত,
ওয়ালী উল্লাহর বিরুদ্ধে ২ হাজার রিঙ্গিত অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
সিঙ্গাপুর ইউনিটে আরও গুরুতর অভিযোগ
অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ সিঙ্গাপুরের নিরীক্ষায় আরও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে ডজনখানেক গুরুতর আপত্তির মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৪০৪ সিঙ্গাপুর ডলার সমপরিমাণ অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে আদায় করা গেছে প্রায় ৪৭ হাজার ডলার। বাকি অর্থ এখনও অনাদায়ী রয়েছে।
প্রবাসীদের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ
প্রতিবেদনে সাবেক সিইও আবু সুজা মো. শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিরীক্ষায় বলা হয়েছে—
প্রবাসীদের জমাকৃত অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার,
হুন্ডি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে লেনদেন,
কভার ফান্ড সময়মতো ফেরত না দিয়ে ব্যাংককে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলা,
দেশে ফেরার সময় নগদ অর্থের হিসাব বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হওয়া।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ৬৩ হাজার ৭২০ সিঙ্গাপুর ডলারেরও বেশি অনিয়মের দায় পাওয়া গেছে।
নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, ব্যাংকের অর্থ ব্যয়ে তাকে পুনরায় সিঙ্গাপুর পাঠানো হলেও তিনি অর্থের ঘাটতির ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
দুর্নীতি আড়ালের অভিযোগ
সাবেক সিইও মীর বায়েজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় ১৬ হাজার ৫৮৫ সিঙ্গাপুর ডলার অনিয়মের দায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি পূর্ববর্তী প্রশাসনের অনিয়ম গোপন, প্রকৃত আয় আড়াল, অনুমোদনবিহীন ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগ
সাবেক ব্যবস্থাপক মুনছুর আলীর বিরুদ্ধে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ২১ হাজার ৬৯৯ সিঙ্গাপুর ডলার অতিরিক্ত গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সাবেক সিইও হুমায়ুন কবির নীতিমালা অনুসরণ না করে পরিচালক হিসেবে বোর্ড সভায় অংশ নিয়ে ভাতা গ্রহণ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থ ফেরত দিয়েছেন কেউ কেউ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের আপত্তি ওঠার পর অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ ফেরত দিয়েছেন।
তবে পুরো অর্থ এখনও উদ্ধার হয়নি।
নিরীক্ষকদের সুপারিশ
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে সুপারিশ করা হয়েছে—
দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা,
অনাদায়ী অর্থ দ্রুত আদায়,
প্রয়োজন হলে ফৌজদারি তদন্ত,
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী অনুসন্ধান,
সম্পদ জব্দের উদ্যোগ,
দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থা ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন কঠিন হবে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
এ বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন,
“বিষয়টি আমরা খোঁজখবর রাখছি। কেউ অপরাধী সাব্যস্ত হলে অবশ্যই তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।”
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে জবাবদিহি কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















